প্রতিবেদন

বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে কাতারের শ্রমবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারের শ্রমবাজার। গত বছর বাংলাদেশ থেকে সীমিত আকারে শ্রমিক নিলেও এবার সেই কোটা বাড়ানো হয়েছে। ৫ ফেব্রুয়ারি দোহায় বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠকে কর্মী নিয়োগে কোটা বাড়ানো এবং কর্মীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ সম্পর্কিত বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপ ফুটবল। সে কারণে সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই বিশ্বকাপের আগে কাতারের বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য নির্মাণ খাতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। সেসব উন্নয়নমূলক কার্যক্রম প্রায় সমাপ্ত হওয়ায় এসব কর্মীর নতুন কর্মসংস্থানের বিষয়ে বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আলোচনা হয়।
তবে সূত্র বলছে, বিশ্বকাপ ফুটবল ছাড়াও কাতারের ‘ভিশন ২০৩০’ উপলক্ষে সিকিউরিটি সার্ভিস, সেবা খাত ও অন্যান্য খাতে দেশটিতে বিপুলসংখ্যক কর্মীর চাহিদা রয়েছে। কারণ কাতারে বাংলাদেশি কর্মীদের সুনাম ও চাহিদা ব্যাপক। বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ বাংলাদেশি কাতারে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত রয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে আরও দক্ষ কর্মী নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি। বিশেষ করে কৃষি, হসপিটালিটি ও সিকিউরিটি সার্ভিসে কর্মী নেবে তারা।
জানা যায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ শ্রমিক নেবে কাতার। তবে তাদের চাহিদা অনেক। এছাড়া তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ৭ হাজার চালক নেবে, যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে নেবে দেড় হাজার চালক। ফিফা বিশ্বকাপে দেশটিতে প্রচুর বিদেশি অতিথি আসবে বলে ইংরেজি জানা গাড়ি চালকদের চাহিদা বেশি বলে জানিয়েছে কাতার। তাছাড়া কাতার শ্রমিকদের অধিকার ও সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে শুধু নিরাপত্তা নয় বিদেশি শ্রমিকদের সব ধরনের অধিকার রক্ষা করবে কাতার।
অবশ্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা যে নির্মাণকাজে অধিক অভিজ্ঞ, বিষয়টি কাতার কর্তৃপক্ষের কাছে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। ফলে তারা ৬ মাস বন্ধ রাখলেও তাদের প্রয়োজনেই আবারো বাংলাদেশের জন্য কাতারের শ্রমবাজার খুলে দেয়।
বাংলাদেশ থেকে কাতারে এতদিন সীমিত আকারে কিছু লোক গেলেও এখন তার সংখ্যা বাড়বে। আশা করা হচ্ছে, এখন থেকে বাংলাদেশ বছরে ২ থেকে ৩ লাখ শ্রমিক কাতারে পাঠাতে পারবে। যদিও এতদিন নানা কারণে বাংলাদেশের জন্য ভিসা একেবারে সীমিত করে রাখে কাতার সরকার। এটি আবারো পুরোদমে আগের অবস্থায় ফিরতে যাচ্ছে। দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং নেপালের এক নাগরিক খুনসহ নানা কারণে বাংলাদেশি কর্মী নেয়া কমিয়ে দিয়েছিল কাতার।
ফুটবল বিশ্বকাপের আগে এখন উপসাগরীয় দেশটির সুরক্ষা ও আতিথেয়তা খাতে অনেক কর্মীর প্রয়োজন হবে। আর তাই যৌথ কারিগরি কমিটির (জেটিসি) এই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল কাতারের এসব অঞ্চলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির করতে এবং বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
বাংলাদেশিদের জন্য কাতারের শ্রমবাজার আবারও উন্মুক্ত হওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন দেশটিতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। একই সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করায় দুই দেশের সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তারা। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাতারের আইন মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন দেশটির বাংলাদেশী কমিউনিটির নেতারা।
৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর আবারও শ্রমিক নেয়ার ঘোষণা দেয় কাতার। নতুন করে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ায় খুশি প্রবাসীরা।
এ বিষয়ে কাতার প্রবাসী রুবেল হোসেন স্বদেশ খবরকে জানান, কাতারে বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় চালু করায় বাংলাদেশ ও কাতার সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি আরো জানান, তার ছোট ভাই সোহাগ হোসেনকে কাতার নেয়ার জন্য ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট সব কিছুই যোগাড় করে রেখেছিলেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থাকায় ছোট ভাইকে আনতে পারছিলেন না। এখন ভাইকে কাতার নিতে পারবেন, এ জন্য খুবই খুশি তিনি।
আরেক প্রবাসী মেহেদী হাসান স্বদেশ খবরকে বলেন, আমরা বিদেশে রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। অতএব আমরা যারা বাংলাদেশি আছি, তাদের উচিত দেশের এবং নিজের জন্য কাজ করে যাওয়া। সেই সঙ্গে কাতার সরকারের নিয়মকানুন মেনে চলাও উচিত। অন্যদেশের অভিবাসীদের সঙ্গে ঝামেলায় না জড়িয়ে বাংলাদেশিদের কাতার সরকারের আইন মেনে চলতে হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সাল থেকে কাতারে কর্মী পাঠানো শুরু করে বাংলাদেশ। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি)-এর তথ্য মতে, ২০১৫ সালে উপসাগরীয় দেশ কাতারে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার বাংলাদেশি কর্মী গেছেন। ২০১৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার জনে। ২০১৭ সালে ৮২ হাজার জন, ২০১৮ সালে ৭৬ হাজার ৫৬০ জন কর্মী অভিবাসী হয়েছেন কাতারে এবং গেল বছর (২০১৯) সালে এই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় মাত্র ৫০ হাজার ২৯২ জনে। অবশ্য সরকারের বর্তমান প্রচেষ্টার ফলে এবার অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক পরিমাণে লোক কাতার যেতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।