প্রতিবেদন

বিদেশিদের মাধ্যমে পাচার হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ: পাচার রোধে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ

সাবিনা ইয়াছমিন : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশে বৈধ-অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশি কর্মীরা দেশের বাইরে বছরে প্রায় ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাচার করছে। এ সংখ্যা ন্যূনতম আড়াই লাখ এবং তারা বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন। দেশে অবৈধভাবে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলেই এ অবস্থা তৈরি হয়েছে।
৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশে বিদেশিদের কর্মসংস্থান: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
এদিকে টিআইবির এই প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, দেশে অবস্থানকারী বিদেশিদের সব তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে তারা। বিদেশিদের তথ্য নিয়ে ডেটা ব্যাংক হালনাগাদ করার কাজ চলছে। ডেটা ব্যাংকে বিদেশিদের দেশ, তারা বাংলাদেশে যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে তার নাম, কাজের ধরন, আয়সহ বিভিন্ন তথ্য থাকছে। ডেটা ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য যাচাই-বাছাই করে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনা হবে। বিদেশিদের আয়ের ওপর আরোপিত করও স্বচ্ছতার সঙ্গে আদায় করা হবে।
সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আবু হেনা মো. রাহমাতুল মুনিম এ কাজে গুরুত্ব বাড়াতে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। চেয়ারম্যান অনুমোদনহীনভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের তথ্য জোগাড় করতে, দেশে বসবাসকারী বিদেশিদের কাছ থেকে হিসাব অনুযায়ী রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে এবং অবৈধ বিদেশিদের নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নিতে বলেছেন।
৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এনবিআর প্রধান কার্যালয়ে এনবিআর আয়কর শাখার কর্মকর্তাদের বৈঠকেও এনবিআর চেয়ারম্যান রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করে কর আদায় বাড়াতে নির্দেশ দেন। তিনি দেশি-বিদেশি সব কর্মীর রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখতে বলেন।
এনবিআর সূত্র জানায়, অনেক বিদেশির বাংলাদেশে থাকার বৈধতা নেই, কিন্তু তারা নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। অবৈধভাবে অবস্থান করে তারা বিপুল অঙ্কের অর্থ উপার্জন করছে এবং কর ফাঁকি দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গার্মেন্টস খাতে কর্মরত বিদেশিদের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অর্থ বিদেশে চলে যায়। অথচ গার্মেন্টস খাতে বহু বাংলাদেশি এক্সপার্ট আছে, যাদের মূল্যায়ন করা হয় না। সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানে দেশি-বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর রেশিও সরকার নির্ধারণ করে দিতে পারে। কিন্তু তা না করলে কোনো কোনো গার্মেন্টসে ১০ জন বিদেশি বায়ারের বিপরীতে দেশি বায়ার থাকেন ১ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু গার্মেন্টস সেক্টরই নয়, অন্য অনেক সেক্টরেও মালিকপক্ষ বিদেশিদের নিয়োগ দিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। বিশেষ করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে অবৈধভাবে ভ্রমণ ভিসায় আগত বিদেশিদের নিয়োগ দেয়া হয়। এসব স্কুল কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো বিদেশিদের নিয়োগ দিলে বেশি স্টুডেন্ট পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি ঠিক নয়। সরকারের উচিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের জন্য নীতিমালা ঠিক করে দেয়া। কয়জন বিদেশি টিচারের বিপরীতে কয়জন দেশি টিচার থাকতে হবেÑ এমন নীতিমালা করে দিলে এক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশিরা অবৈধভাবে দেশে কাজ করছে, এর চেয়ে মারাত্মক হলো কাজ করে তারা যে বেতন পায় তার কোনো কর না দিয়েই নিজ দেশেই পাঠিয়ে দেয়। এটা অর্থ পাচার ছাড়া আর কিছু নয়। এ বিষয়ে এনবিআর জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, এনবিআর কিছু নির্দেশ দেয়া ছাড়া মাঠ পর্যায়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। ফলে বিদেশিরা উপার্জন করার জন্য বাংলাদেশকে একটি উর্বর ক্ষেত্র মনে করে। কারণ, তাদের কোনো কর দিতে হয় না।
টিআইবি’র মতে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীদের সাক্ষাৎকার, আইনি নথি-নীতিমালা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য, গবেষণা প্রতিবেদন ও গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে এ গবেষণা করা হয়েছে। ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গুণগত এ গবেষণায় কোনো জরিপ চালানো হয়নি, শুধু তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
টিআইবি জানায়, বিদেশি কর্মীদের ন্যূনতম গড় মাসিক বেতন দেড় হাজার মার্কিন ডলার। সে হিসাবে তাদের বার্ষিক আয় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ৩০ শতাংশ স্থানীয় ব্যয় বাবদ বাদ দিলে প্রায় ৩ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বৈধভাবে বিদেশে যায় মাত্র ৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাকি অর্থ অবৈধ পন্থায় বিদেশে পাচার হয়ে যায়, টাকার অঙ্কে যা প্রায় ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা; যার মাধ্যমে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি হয় ১২ হাজার কোটি টাকা।
এ তথ্যচিত্র ও হিসাব তুলে ধরে টিআইবির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশে কাজ করতে আসা বিদেশিদের ৫০ শতাংশই ভ্রমণ ভিসায় আসে। তারা কাজ জোগাড় করে দেশে ফেরে, পরে আবার ভ্রমণ ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসে। সরকারি প্রকল্পের অধীনে নিযুক্ত কর্মচারীদের মধ্যে যারা বিদেশি তারা ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে এসে কর্মরত আছেন।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিসার সুপারিশপত্র, বিদেশে বাংলাদেশ মিশন থেকে ভিসা সংগ্রহ, বিদেশি নাগরিক নিবন্ধন, কাজের অনুমতি, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য প্রতিজন বিদেশিকে ২৩ থেকে ৩৪ হাজার টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে দিতে হয়। দেশি বিশেষজ্ঞ না খোঁজা, কর ফাঁকি, একই প্রতিষ্ঠানে ৫ বছরের বেশি কর্মরত রাখা, ভিসা নীতি লঙ্ঘন এবং বিদেশি কর্মীর বেতন কম দেখানোর মাধ্যমেও অনিয়ম করা হয়।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিদেশি কর্মী নিয়োগে কোনো সমন্বিত ও কার্যকর কৌশলগত নীতিমালা নেই। বিদেশি কর্মী নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষও নেই।
টিআইবির দেয়া তথ্যানুসারে, প্রায় ৪৪টি দেশ থেকে আসা বিদেশিরা বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। এর মধ্যে ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, নরওয়ে ও নাইজেরিয়ার নাগরিকরা আছেন।
পর্যটন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৮ লাখ পর্যটক ভিসা নিয়েছিলেন। পর্যটক ভিসায় কাজ করা নিষিদ্ধ। এরপরও এ বিদেশিদের অন্তত ৫০ শতাংশ বা ৪ লাখের ভিসা কাজের উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয়। এসব ভিসার সর্বোচ্চ মেয়াদ ৩ মাস হওয়ায় তারা ৩ মাস পর পর দেশে গিয়ে আবার ভিসা নিয়ে ফিরে আসেন।
টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একজনকে বছরে গড়ে ৩ বার ভিসা নিতে হয়। সে হিসাবে পর্যটক ভিসায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার বিদেশি কাজ করেন। এর সঙ্গে বৈধ বিদেশি কর্মী ৯০ হাজার যোগ করে মোট বিদেশি কর্মী কমপক্ষে আড়াই লাখ ধরা হয়েছে।
টিআইবির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কর অঞ্চল-১১-তে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন সাড়ে ৯ হাজার বিদেশি, যাদের বার্ষিক আয় ৬০৩ কোটি টাকা; যাতে মোট কর পাওয়া গেছে ১৮১ কোটি টাকা।
টিআইবি বলছে, যারা রিটার্ন দিচ্ছেন, তারা সঠিকভাবে দিচ্ছেন কি না সেটাও দেখা হচ্ছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে। ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়েও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন বিদেশিরা। পরে তাদের ভিসার মেয়াদও বাড়ানো হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেন যুক্ত আছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের ব্যাপারে সরকারের কঠোরতা আরোপের সময় এসেছে। নিয়মনীতি না মেনে বহু বিদেশি দেশে বছরের পর বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। তারা কোনো আয়কর দিচ্ছে না। সরকার এনবিআরের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে আয়কর পেতে যত পন্থা অবলম্বন করছে, তার সিকিভাগও করছে না বিদেশিদের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশকে উপার্জনের চারণক্ষেত্র (যেহেতু ট্যাক্স দিতে হয় না) ভেবে বহু বিদেশি এখানে আসছে। বিশেষ করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শেষে এদেশেই থেকে যাচ্ছে। তারা গার্মেন্টসে কাজ করছে, ফুটবল খেলছে, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছে। এতে দেশীয়দের উপার্জনের ক্ষেত্র যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি বিদেশিরা ট্যাক্স না দেয়ায় সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশ থেকে টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে, যা অর্থনীতিতে বিপদ তৈরি করছে।
সে জন্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ বিদেশিদের চিহ্নিত করার জন্য সরকার বিশেষ শুমারির ব্যবস্থা করতে পারে। সেটা সম্ভব না হলে, এনবিআরের মাধ্যমে বিদেশি চিহ্নিতের বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কঠোরতা আরোপ করলে বিশেষ করে কেন্দ্রীয়ভাবে সার্ভারের মাধ্যমে তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ করলে অবৈধ বিদেশিদের বাংলাদেশে চাকরি করার প্রবণতা এবং অর্থ পাচার অনেকাংশে কমে যাবে আর এ খাতে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। এতে বাংলাদেশিদের চাকরির ক্ষেত্রও
বিস্তৃত হবে।