আন্তর্জাতিক

যেভাবে অভিশংসন থেকে অব্যাহতি পেলেন ট্রাম্প

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিনেটের ভোটাভুটিতে অভিশংসন অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৫ ফেব্রুয়ারি রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক এক ভোটাভুটিতে দেশটির ৪৫তম প্রেসিডেন্টকে না সরানোর পক্ষে রায় দেন সিনেটররা।
প্রেসিডেন্টকে সিনেটের বিচারে অভিযুক্ত করে অপসারিত করতে ৬৭ সিনেটরের সমর্থন প্রয়োজন হয়। বর্তমানে ১০০ সিনেটরের মধ্যে ৫৩ জনই রিপাবলিকান। ডেমোক্র্যাট সিনেটর ৪৫ আর ২ জন সিনেটর হলেন স্বতন্ত্র। সিনেটে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ট্রাম্প যে সহজেই অব্যাহতি পাবেন সেটা আগেই অনেকটা স্পষ্ট ছিল। তারপরও কোনো কারণে ট্রাম্প ভোটে হেরে গেলে তাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হতো।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুটি আর্টিকেল অব ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসন অভিযোগ ছিল। ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তার পদচ্যুতির বিষয়ে ৫২-৪৮ ভোটে জিতেছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে কংগ্রেসের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে প্রেসিডেন্টের পদ হারানোর সম্ভাবনা খারিজ হয়েছে ৫৩-৪৭ ভোটে।
ভোটাভুটিতে দলীয় বিভাজন স্পষ্ট। তবে উটাহর সিনেটর মিট রমনি ছিলেন একমাত্র রিপাবলিকান, যিনি দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। তবে ডেমোক্র্যাটদের নিরাশ করেছেন অন্য ২ জন মধ্যপন্থি রিপাবলিকান সিনেটর মেইনের সুসান কলিনস এবং আলাস্কার লিসা মারকাওস্কি। প্রতিশ্রুতি দিয়েও তারা নিজেদের পক্ষ ত্যাগ করেননি।
কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের আচরণের সমালোচনা করলেও তাদের বক্তব্য হচ্ছে, এই আচরণ ইমপিচ করার পর্যায়ে যায়নি।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার ছেলে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে ইউক্রেনকে চাপ প্রয়োগ, সামরিক সহায়তাকে ঘুষ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগে অভিশংসন প্রক্রিয়ার মুখে পড়েন ট্রাম্প। যদিও তিনি বারবার তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।
সিনেটে ভোটাভুটির পর ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা দল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুরোপুরি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন এবং এখন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের নিজ কাজে মন দেয়ার সময় হয়েছে। অকর্মণ্য ডেমোক্র্যাটরা জানে তারা ট্রাম্পকে হারাতে পারবে না, সেজন্য তারা তাকে ইমপিচ করেছিল।
এদিকে ভোটাভুটিতে হেরে যাওয়ার পর ডেমোক্র্যাট দলীয় সদস্যরা বলেছেন, এর ফলে ট্রাম্প আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবেন। হাউজ স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের জন্য সব সময় একটি ‘হুমকি’ হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং রিপাবলিকান সিনেটররা আইন না থাকার ব্যাপারটিকে সাধারণ ব্যাপার বানিয়ে ফেলেছেন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট দলীয় নেতা চাক শুমার বলেছেন, প্রেসিডেন্ট এ যাত্রা রেহাই পেলেও তার ত্রুটিসমূহ সবাই জানেন।
মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতা ও প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি অনেক আগে থেকেই ট্রাম্পের ওপর বিরক্ত ছিলেন। অভিশংসনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার একদিন আগে ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিনিধি পরিষদে দাঁড়িয়ে বার্ষিক ভাষণ দেন ট্রাম্প। সেই ভাষণের সময়েই ট্রাম্পের ওপর চূড়ান্ত বিরক্তি প্রকাশ করেন ন্যানসি পেলোসি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আগেও বেশ কয়েকবার নিজের অসন্তোষ জানিয়েছিলেন ন্যান্সি পেলোসি। এবার আরো একবার সবার সামনে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করলেন তিনি। ট্রাম্পের পেছনে দাঁড়িয়েই তাঁর দেয়া ভাষণের অনুলিপি ছিঁড়ে ফেলেন ন্যান্সি। ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিনিধি পরিষদে দাঁড়িয়ে বার্ষিক এ ভাষণ দেন ট্রাম্প।
বার্ষিক ভাষণে নিজের সরকারের নানা অর্জন তুলে ধরেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প বলেন, ‘৩ বছর আগে আমরা গ্রেট আমেরিকান কামব্যাক প্রকল্প ঘোষণা করেছিলাম। এখন এই প্রকল্পের অভাবনীয় ফলগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরার জন্য আমি এখানে এসেছি। কর্মসংস্থান বাড়ছে, মানুষের আয় বাড়ছে, দারিদ্র্য কমছে, অপরাধ কমছে, আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। আমাদের দেশকে আবার সবাই সম্মানের চোখে দেখছে। আমরা যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছি, কিছুদিন আগেও সেটি অকল্পনীয় ছিল।’
ভাষণ শুরু করার আগে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা ট্রাম্পকে আরও ৪ বছর ক্ষমতায় থাকার আহ্বান জানান। তারা সবাই মিলে ‘ফোর ইয়ারস মোর’ স্লোগান দিতে থাকেন। তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের ভাষণ শুরু করেন ট্রাম্প। ১ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ভাষণ দেন ট্রাম্প।
ভাষণের অনুলিপি ছিঁড়ে ফেলার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের পেলোসি বলেন, ‘অসন্তোষ প্রকাশে অন্য সব উপায়ের চেয়ে এটিই সবচেয়ে সভ্য উপায় ছিল।’ অবশ্য ট্রাম্পের ভাষণের প্রতিবাদ জানিয়ে ডেমোক্র্যাটদের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি পরিষদ থেকে বের হয়ে যান।
উল্লেখ্য, ট্রাম্পের সঙ্গে পেলোসির ঝামেলা অবশ্য নতুন নয়। পেলোসিই প্রথম ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিশংসনের প্রস্তাব আনেন। ট্রাম্পও বেশ কয়েকবার পেলোসিকে ‘উন্মাদ’ বলেছেন। ৪ মাস আগে হোয়াইট হাউসের এক বৈঠক থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন পেলোসি। ওই ঘটনার পর ৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম এই দুজন মুখোমুখি হন। আর সেই সাক্ষাতেই ট্রাম্প পেলোসির বাড়ানো হাত প্রত্যাখ্যান করেন এবং পেলোসি ট্রাম্পের ভাষণের কপি প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলে তার জবাব দেন।