কলাম

শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে কঠোর শাস্তির পাশাপাশি মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি

সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতার পাশাপাশি শিশুর প্রতিও অমানবিক নিষ্ঠুরতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু অপহরণ, ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা। রাস্তাঘাটে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমনকি পরিবারেও নিরাপদ নয় শিশুরা। ৪-৫ বছরের কিংবা এর চেয়ে কম বয়সের শিশুও ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই। তবে ধর্ষণের মতো পাশবিকতা যে শুধু অশিক্ষিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ তা কিন্তু নয়, তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের লোকেরাও ধর্ষণ করে চলেছে শিশুদের। নিকটাত্মীয় দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে শিশু। প্রিয়জনের হাতে হারাচ্ছে প্রাণ। রেহাই পাচ্ছে না প্রতিবন্ধী শিশুরাও। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, দরিদ্র পরিবারের এবং শ্রমজীবী মা-বাবার শিশুরাই ধর্ষণের শিকার বেশি হচ্ছে। এ ধরনের পরিবারের শিশুরা বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে ধর্ষণের শিকার হয়। ওরা এ ধরনের শিশুদের ওপর বলপ্রয়োগ করে, ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করে, এমনকি ওদের দিয়ে পর্নোগ্রাফিও তৈরি করে।
কথা হলো, ধর্ষক হয়ে কেউ জন্মায় না, তবে পরবর্তী সময়ে এত ধর্ষক কী করে তৈরি হয়? শিশুকাল থেকে মা-বাবার স্নেহ, যতœ, ভাইবোনের আদর, ভালোবাসা পেলে তার মাঝে মমত্ববোধের যে এক সূক্ষ্ম অনুভূতির বীজ বপণ হয়, মনে হয় তার কোথাও ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। নগরজীবনের ব্যস্ততার কারণে মা-বাবা তার শিশু-কিশোর সন্তানকে যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন না। ফলে শিশুকাল থেকে সন্তান উপযুক্ত পারিবারিক শিক্ষা থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার চেয়ে কাগুজে শিক্ষা নিয়ে রাতারাতি বিত্তবৈভব গড়ে তোলার এক অশুভ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠছে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। আগের দিনের মতো যৌথ পরিবারের সান্নিধ্যবঞ্চিত শিশু-কিশোর ঘরের মাঝে একাকিত্বে ভোগে। মানবিক গুণাবলি বিকাশের শিক্ষা পায় না। তাদের মনোজগতের বিশাল শূন্যতায় বাসা বাঁধে কুচিন্তা। বাধ্য হয়ে তারা খুঁজে নেয় বাইরের এক অচেনা-অজানা জগৎ। সেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিপথগামী বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে নষ্টামি, ভ-ামি শিখে ধীরে ধীরে ধর্ষণের মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
বাংলাদেশে ধর্ষণের শাস্তির যে আইনি বিধান রয়েছে তাতে ধর্ষণের সত্যতা প্রমাণ করতে হয় ধর্ষিতাকেই। মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিও ধর্ষণকে উৎসাহিত করে। তাই ধর্ষণের মতো দুষ্টক্ষতকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করতে হলে ধর্ষকের স্বরূপ উন্মোচিত করতে হবে। ধর্ষণের বিচার দ্রুততম সময়ে শেষ করার উদ্যোগ নিতে হবে। ধর্ষিতা ও তার পরিবারকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আইনি সহায়তা দিতে হবে। তাদের যেন কোনোভাবে হেনস্তা হতে না হয়, সে ব্যাপারে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিশুধর্ষণের ভয়াবহতাকে জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন ও ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। ধর্ষণের ব্যাপারে রাষ্ট্রের শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি এবং ধর্ষণ প্রতিরোধে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনই ধর্ষণ প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে বলে আমরা মনে করি।