অর্থনীতি

সরকারি সংস্থার উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় তহবিলে নাকি ব্যাংকে জমা হবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের ৬১টি স্বায়ত্তশাসিত, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও স্বশাসিত সংস্থার ব্যাংকে থাকা বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমার বিধান রেখে আনীত একটি বিল ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। অপরদিকে সরকারি মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানি, স্বায়ত্তশাসিত ও অর্ধস্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ব্যাংকে আমানত রাখলে সর্বোচ্চ সাড়ে ৫ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকে আমানত রাখলে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ হারে সুদ পাবে। ওই নির্দেশনা সঠিকভাবে পালনের জন্য ৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকগুলোর উদ্দেশে সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত, সরকারি কর্তৃপক্ষ, স্বশাসিত সংস্থা, সরকার মালিকানাধীন কোম্পানি, স্বায়ত্তশাসিত ও অর্ধস্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সংস্থাগুলোর কর্তাব্যক্তিরা এ নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে আছেন। কারণ জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বিলে বলা হচ্ছে, স্বায়ত্তশাসিত, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও স্বশাসিত সংস্থার ব্যাংকে থাকা বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হচ্ছে সরকার মালিকানাধীন কোম্পানি, স্বায়ত্তশাসিত ও অর্ধস্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখতে হবে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ব্যাংকে থাকা বিভিন্ন সংস্থার উদ্বৃত্ত অর্থ যদি রাষ্ট্রীয় কোষাগারেই জমা দিতে হয় তাহলে আবার বিভিন্ন সরকারি সংস্থার আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখার নির্দেশনা কেন দেয়া হলো অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে?
বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, উদ্বৃত্ত অর্থই তারা বিভিন্ন ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখতেন। এখন সেই উদ্বৃত্ত অর্থ যদি রাষ্ট্রীয় কোষাগারেই জমা দিতে হয়, তাহলে ব্যাংকে জমা রাখার মতো আমানত থাকবে কোথা থেকে এবং এ ধরনের নির্দেশনাই বা কেন জারি করলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক?
কেউ কেউ বলছেন, ৬১টি স্বায়ত্তশাসিত, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও স্বশাসিত সংস্থার বাইরে সরকারি আরো যেসব সংস্থা ও কোম্পানি আছে তাদের উদ্বৃত্ত অর্থের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা কার্যকর হবে। আর সুনির্দিষ্ট ৬১টি সংস্থার ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে।
এক্ষেত্রে অবশ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ নিয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে তা অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিষ্কার করা উচিত।
৫ ফেব্রুয়ারি স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে ‘স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাসমূহের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান আইন-২০২০’ শীর্ষক বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান প্রয়োজন, যা বর্তমান সংগৃহীত রাজস্ব দ্বারা মেটানো দুরূহ হওয়ায় সংস্থাসমূহের তহবিলে রক্ষিত উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা প্রদানের মাধ্যমে বর্তমান সরকার কর্তৃক গৃহীত উন্নত দেশ গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই বিলটি আনা হয়েছে।
বিলে বলা হয়েছে, সংস্থার বার্ষিক পরিচালনা ব্যয়, নিজস্ব অর্থায়নে অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বার্ষিক ব্যয় নির্বাহের অর্থ, আপৎকালীন ব্যয়ের জন্য বার্ষিক পরিচালনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থের অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত অর্থ প্রতি অর্থবছর শেষ হওয়ার ৩ মাসের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে, যা দেশের উন্নয়নকাজে ব্যয় করা যাবে।
এর আগে ২০১৯ সালের ২ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক নির্দেশনার মাধ্যমে ৯-৬ সুদ কার্যকরের জন্য ব্যাংক মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি সংস্থার আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সংক্রান্ত নির্দেশনা সঠিকভাবে পরিপালন না হওয়ায় গত ১৯ জানুয়ারি আবার নির্দেশনা জারি করা হয়। এতে বেসরকারি ব্যাংকে আমানত রাখলে দশমিক ৫ শতাংশ বেশি সুদ বেঁধে দেয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬ ফেব্রুয়ারির সার্কুলারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই আদেশ সংযুক্ত করে তা পরিপালন নিশ্চিত করার পরামর্শ দেয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ১৯ জানুয়ারি দেয়া প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সুদের হার ১ অঙ্কে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। সে পরিপ্রেক্ষিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) এবং পরিচালন বাজেটের আওতায় প্রাপ্ত অর্থ, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির নিজস্ব তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবসায় নিয়োজিত বেসরকারি ব্যাংক অথবা নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান অথবা উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্য তহবিলের অর্থ, পেনশন তহবিলের অর্থ এবং এন্ডাউমেন্ট ফান্ডের অর্থ এর আওতাবহির্ভূত থাকবে।
দেখা যাচ্ছে, জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বিলে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে মোটামুটি একই ধরনের কথা বলা হয়েছে। ফলে দেখা দিয়েছে বিষয়টি ‘অনুধাবনের সংকট’। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একই ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন জারি করা উচিত। ৬১টি সংস্থাকে কি উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার পরও বাকি যে অর্থ থাকবে তার ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখতে হবে, নাকি তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারেই জমা দিলে চলবে, আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে না রাখলেও চলবে? নাকি ৬১ সংস্থার বাইরে আরো যেসব সরকারি সংস্থা আছে, তাদের ক্ষেত্রেই শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন বলবৎ হবে?