প্রতিবেদন

সাংবাদিকদের ডেটাবেইজ তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে প্রেস কাউন্সিল

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল থেকে শিগগির দেশের সব সাংবাদিককে আইডি কার্ড দেয়া হবে। ফলে যে কেউ চাইলেই নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন না। দেশের সব সাংবাদিকের তালিকা প্রণয়ন করে আলাদা ওয়েবসাইট চালু করা হবে। সেখানে প্রকৃত সাংবাদিকের নাম ও ঠিকানা থাকবে। এতে যারা প্রকৃত সাংবাদিক, তারাই এ পেশায় টিকে থাকবেন এবং নামসর্বস্বদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ৬ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের এক কর্মশালায় এসব কথা বলেন। কিশোরগঞ্জের ৪৩ জন সাংবাদিকের অংশগ্রহণে এ প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। ‘সাংবাদিকতার নীতিমালা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় লক্ষণীয় বিষয়সমূহ ও তথ্য অধিকার আইন অবহিতকরণ’ শীর্ষক এ কর্মশালার আয়োজক বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল।
বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সব সাংবাদিককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। মফস্বল সাংবাদিকসহ সব সাংবাদিকের জন্য আর্থিক তহবিল গঠন করা হবে, যাতে কোনো সাংবাদিক আহত হলে চিকিৎসার জন্য সহায়তা করা যায় অথবা মারা গেলে তার পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়া যায়।
প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আরো বলেন, সাংবাদিকতার সঠিক নীতিমালা না থাকায় অনেক হকারও এখন সম্পাদক হয়ে বসে আছে। যার হাতে মোবাইল ফোন আছে, তিনিই সাংবাদিক। যে যার মতো যত্রতত্র নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। গাড়িতে, মোটরসাইকেলে ‘প্রেস’ লিখে অবাধে চলাফেরা করছে। অপসাংবাদিকতা বা যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে যেন পরিচয় দিতে না পারেন, সে জন্য সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করে নীতিমালার মাধ্যমে তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়েবসাইটটি প্রকাশ করা হবে।
প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বলেন, কোনো সাংবাদিক যখন ৪০ বছর সাংবাদিকতা করে খালি হাতে বাড়িতে ফেরেন, সেটা খুবই দুঃখজনক ও কষ্টের। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পেনশন এবং আইনজীবীদের নিজস্ব আর্থিক তহবিল থাকলে সাংবাদিকদের জন্য কেন থাকবে না? সে জন্য ৬ মাসের মধ্যে সাংবাদিকদের জন্য আর্থিক তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল এ যুগে যার একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন আছে, তিনিই নিজেকে সাংবাদিক মনে করেন। ফেসবুকে দু’একটি কমেন্ট করেও অনেকে নিজেকে সাংবাদিক মনে করেন। সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে তা প্রচার করার ব্যবস্থা করা সাংবাদিকতার কাজ হলেও অনেকে বিকৃত ও মনগড়া তথ্যও প্রচার করেন, যা কোনো এথিকসের মধ্যে পড়ে না। সাংবাদিকতার কোনো নীতিমালা না থাকায় যে কেউই নিজেকে সাংবাদিক দাবি করে বসছেন। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল কর্তৃক সাংবাদিকদের আইডি কার্ড দেয়ার ব্যবস্থা থাকলে এবং সাংবাদিকদের ডেটাবেইজ থাকলে যে কেউই নিজেকে সাংবাদিক বলে পরিচয় দিতে পারতো না।
ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার হেড অফিসে যেসব সংবাদকর্মী কাজ করেন এবং দুই ধরনের মিডিয়ার সারাদেশে যেসব প্রতিনিধি আছেন, তাদেরকে প্রতিষ্ঠানকর্তৃক যে আইডেন্টিফিকেশন কার্ড দেয়া হয়, তা-ই ওই কর্মীর সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেয়ার একমাত্র উপকরণ। এ ছাড়া ওই সাংবাদিককে দেশের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ আইডি কার্ড দেন না। ফলে যেকেউই কম্পিউটারের দোকান থেকে আইডি কার্ড তৈরি করে সাংবাদিক হয়ে যাচ্ছেন।
অনেকেই বলেন, সাংবাদিকতায় আইডি কার্ড বর্তমান সময়ে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ঢাকা বা বড় বড় শহর থেকে প্রকাশিত অনেক অখ্যাত প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক বা মালিকপক্ষ সাংবাদিকতার আইডি কার্ডকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছেন। এমনও শোনা যায়, প্রতিটি আইডি কার্ডের জন্য ১ বছর মেয়াদে ১০ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। এখানেই শেষ নয়, ওই আইডি কার্ডধারী আবার মাসে মাসে পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে উল্টো মাসোহারাও নাকি প্রদান করে।
এখানেই সহজে অনুমেয় যে, যিনি এই প্রক্রিয়ায় কার্ডটি সংগ্রহ করেন, তিনি আবার সে ধরনের প্রক্রিয়া অবলম্বন করেই আইডি কার্ড বাবদ খরচ এবং মাসভিত্তিক খরচের টাকাটা সংগ্রহ করেন। ফলে সাংবাদিকতায় ঢুকে যায় অপসাংবাদিকতা। হলুদ সাংবাদিকে দেশ হয়ে পড়ে সয়লাব।
আবার দেখা যায়, যার একটি ক্যামেরা বা ভিডিও মেশিন আছে, তার রিপোর্টিংয়ের কোনো যোগ্যতা না থাকলেও ইলেকট্রনিক মিডিয়া তার হাতে আইডি কার্ড তুলে দিয়ে তাকে হলুদ সাংবাদিকতার লাইসেন্স দিয়ে দেয়। মফস্বল সাংবাদিকতায় বিষয়টি দিন দিনই প্রকট হয়ে উঠছে। মফস্বলের এসব হলুদ সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্যে বদনামের ভাগিদার হচ্ছেন প্রকৃত সাংবাদিকরা। অনেক প্রকৃত সাংবাদিক, এজন্য নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতেও কুণ্ঠা বোধ করছেন।
যেনতেনভাবে যোগাড় করা একটি আইডি কার্ডের পাশাপাশি অনেকে যোগাড় করে ফেলেন মোটরসাইকেলও। সেই মোটরসাইকেলে আবার বড় করে লেখা থাকে ‘সাংবাদিক’। তাকে এটা লেখার অধিকার কে দিয়েছে, তা নির্ধারণের কোনো কর্তৃপক্ষই দেশে নেই। শুধু মোটরসাইকেলই নয়, প্রাইভেট কারেও লাগানো হয় ‘প্রেস’ বা ‘সাংবাদিক’ লেখা স্টিকার। সেই স্টিকারযুক্ত প্রাইভেট কার দিয়ে নানা অপকর্ম চালানোর খবরও কম নয়।
আরেকটি বিষয় প্রকটভাবে দেখা যায় মফস্বলের থানাগুলোতে। একজন সাংবাদিকের কাজ থাকবে তার কার্যালয়ে অথবা ফিল্ডে। মফস্বলের বেশিরভাগ কার্ডধারী সাংবাদিক তার কার্যালয় বলতে বোঝে থানা কম্পাউন্ডকে। কেউ একটি জিডি বা মামলা করতে থানায় এলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সাংবাদিকরা। মামলায় কার নাম যাবে, কার নাম যাবে না, জিডিতে কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যাবে, কার বিরুদ্ধে যাবে নাÑ সেসব নির্ধারণ করে দেন সাংবাদিকরা। ফলে এসব তথাকথিত সাংবাদিকদের যন্ত্রণায় সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন ভুক্তভোগীও। কেউ কেউ সাংবাদিককে ‘সাংঘাতিক’ হিসেবেও অভিহিত করেন।
তাই প্রকৃত সাংবাদিকরা বলছেন, সাংবাদিকতার নীতিমালা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিলের উদ্যোগকে স্বাগত
জানিয়ে তারা বলছেন, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল প্রকৃত সাংবাদিকদের তালিকা সংবলিত ডেটাবেইজ করলে সাংবাদিকরা সব ধরনের সহযোগিতা করবে।