রাজনীতি

সিটি নির্বাচনে কর্মী-সমর্থকদের নিষ্ক্রিয়তায় আওয়ামী লীগও চিন্তিত

নিজস্ব প্রতিবেদক : সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে ২২ শতাংশ। ওই উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কমবেশি ১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা সিটি নির্বাচনে গড়ে ভোট পড়েছে ২৭.১৫ শতাংশ। ডিসিসি নির্বাচনে উত্তর ও দক্ষিণের মেয়রদ্বয় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। যেকোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অন্তত ৪০ শতাংশ (ভোট ব্যাংক) ভোট থাকে। তাহলে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ ভোটদানে বিরত থেকেছে। নির্বাচনে কর্মী-সমর্থকদের এমন নিষ্ক্রিয়তায় অন্যান্যের মতো খোদ ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও চিন্তিত হয়ে পড়েছে।
ডিসিসি নির্বাচনে কম ভোট পড়ার বিষয়টি সারাদেশেই আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রথমে বিষয়টি আমলে না নিলেও এখন তা নিয়ে আওয়ামী লীগও চিন্তিত। কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, গত কয়েকটি নির্বাচনে কম ভোট পড়া নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা গণমাধ্যমে যা-ই বলুন না কেন, বিষয়টি তাদেরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। তাই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।
৬ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, টার্ন আউট কম হতে পারে। কারণ ইভিএম আমাদের এখানে প্রথম অভিজ্ঞতা, পুরো ঢাকায় ইভিএমের ব্যবহার আগে হয়নি। নতুন সিস্টেমের একটি বিষয় আছে। ছুটির বিষয় ছিল। এসএসসি পরীক্ষার কারণে অনেকে ছেলেমেয়ের জন্য গ্রামে চলে গেছেন। এ রকম কিছু কিছু অবস্থার উদ্ভব হয়েছে। আর আমাদের মধ্যেও দুর্বলতা অবশ্যই আছে। সেটা আমরা খতিয়ে দেখব। ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করব।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য স্বদেশ খবরকে বলেন, দলের নেতাকর্মীদের আচরণে ত্যাগী একটি অংশও রাজনীতিবিমুখ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আমরা যা-ই বলি, আমাদের দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ভোট দিতে না যাওয়ার কারণ নানা ধরনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। আমাদের দলের যারা প্রচারে ছিলেন, খোঁজ মিলেছে তাদের অনেকেই যাননি ভোট দিতে। সুতরাং দলের মানুষের ভেতরই তো রাজনীতিবিমুখতা দেখা দিয়েছে। এগুলো কেন হচ্ছে সেটাও খুঁজে বের করতে হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য স্বদেশ খবরকে বলেন, দলের অভ্যন্তরে আলোচনায় কম ভোট পড়ার ব্যাপারটি উঠে এসেছে। কিন্তু ঢাকা সিটির দলীয় মেয়র প্রার্থীর বিজয় প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে Ñ এই চিন্তায় ভোট কম পড়ার ব্যাপারে নানা খোঁড়া যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। কারণ মেয়রদের বিজয়কে ‘ডিফেন্ড’ করে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কম ভোট পড়ার কারণ খতিয়ে দেখতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ৭ ফেব্রুয়ারি পাবনায় আওয়ামী লীগের এক তৃণমূল প্রতিনিধি সভায় বলেন, দেশে এত উন্নয়ন কাজ করার পরও দুই সিটি নির্বাচনে বেশিরভাগ ভোটার কেন ভোট দেয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেললেন, অঙ্ক কষে উত্তর বের করতে হবে। শুধু মুজিব কোট লাগিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করা যাবে না। এ রকম চললে আগামীতে ভোট পাওয়া যাবে না। তাই বলতে চাই, সিটি নির্বাচনে যা হয়েছে তাতে আনন্দিত হওয়া যাবে না, ভোটারবান্ধব হতে হবে। তা হলেই আগামীতে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারো জয়লাভ করবে।
অবশ্য আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, এখন দেশের সব জেলা-উপজেলায় সংগঠন চলছে ‘নিজস্ব বলয়’ দিয়ে। দল টানা ক্ষমতায় থাকায় গত ১১ বছরে নিজ বলয় শক্তিশালী করতে স্থানীয় এমপি-মন্ত্রী ও জেলা-উপজেলার শীর্ষ নেতারা বিএনপি-জামায়াত থেকে লোকদের নিয়ে অথবা নিজ আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বলয়। ১১ বছরে শত শত অনুপ্রবেশকারীকে দেয়া হয়েছে দলের পদ-পদবি। কেউ কেউ উড়ে এসে জুড়ে বসেছে শীর্ষ পদেও। সর্বত্র এই নতুন লীগের দাপটে কোণঠাসা দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা। ১৯৯১ থেকে শুরু করে ২০০৮ সালের আগে যারা দলে সক্রিয় ছিলেন, এই শ্রেণির দাপটে তারা এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। বিষয়টি দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আসায় তিনি এই বলয় ভাঙার নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত উপদলীয় কোন্দলেই আওয়ামী লীগের লোকজন ভোট দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ডিসিসি নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগ যেসব প্রার্থী দিয়েছে, তাদের বিপরীতে বহু বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়ে গেছেন। অনেকে স্বতন্ত্র হয়েও দাঁড়িয়ে গেছেন। মূল প্রার্থী, বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের রেষারেষিতে শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, অনেকে অনেক প্রার্থীর কাছে ভালো থাকার জন্য শেষ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে যাননি। ফলে আওয়ামী লীগের ভোট থাকা সত্ত্বেও তা ভোট বাক্সে পড়েনি।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। দলটিতে সবাই নেতা হয়ে গেছেন, কর্মী হিসেবে কেউই থাকতে চাচ্ছেন না। ফলে নির্বাচন এলে সবাই প্রার্থী হতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। দল মনোনয়ন না দিলে বিদ্রোহী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভোট ব্যাংক থাকা সত্ত্বেও তা কোনো কাজে লাগছে না। বিএনপি বা জাতীয় পার্টির ব্যর্থতায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা নির্বাচিত হচ্ছেন ঠিকই, তবে তা এত কম ভোটে যে, চোখে লাগছে। তাই এ সংকট উত্তরণের পথ খুঁজছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।