রাজনীতি

এবার ‘মানবিক বিবেচনায়’ খালেদা জিয়ার মুক্তি!

নিজস্ব প্রতিবেদক
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে খালেদা জিয়া বিগত ২ বছর যাবৎ কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। কারামুক্তির সম্ভাব্য সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর এবার মানবিক বিবেচনায় খালেদা জিয়ার মুক্তি বিষয়টি সামনে এসেছে। মানবিক দিক বিবেচনার বিষয়টি সামনে এনেছেন খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা। তবে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য সরকারের কাছে বিএনপি বা পরিবারের সদস্যরা এখনো অফিসিয়ালি কোনো আবেদন করেননি বলে জানা গেছে।
১১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে পরিবারের সদস্যরা প্রথমবারের মতো মানবিক দিকের বিষয়টির অবতারণা করেন। এর আগে জামিনে মুক্তি, নিঃশর্ত মুক্তি, আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্তি, বিশেষ বিবেচনায় মুক্তি এবং সাজা মওকুফের আবেদনের কথা শোনা গেলেও এবারই প্রথম মানবিক দিক বিবেচনায় মুক্তির কথাটি বলছেন খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা। তাদের কথা হলো, খালেদা জিয়ার শরীর খুবই খারাপ, তাই সরকার যেন মানবিক বিবেচনায় তাকে মুক্তি দেয়।
১১ ফেব্রুয়ারি বোন সেলিমা রহমান, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী কানিজ ফাতিমা, তার ছেলে অভিক এস্কান্দার, তারেক রহমানের স্ত্রীর বড় বোন শাহিনা জামান খান বিন্দু ও কোকোর শাশুড়ি ফাতিমা রেজা বিএসএমএমইউআরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যান। এক ঘণ্টা পর তারা বেরিয়ে আসেন। গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে বিএসএমএমইউর কেবিন ব্লকে চিকিৎসীন আছেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়ার অবস্থা তুলে ধরে সেলিমা রহমান সাংবাদিকদের বলেন, তিনি (খালেদা) ৫ মিনিটও দাঁড়াতে পারছেন না। তার বাথরুম থেকে বেডের দূরত্ব খুব সামান্য। সেখানে যেতেও তার ২০ মিনিট সময় লাগে। তার বাঁ হাত সম্পূর্ণ বেঁকে গেছে, এখন ডান হাতও বেঁকে যাচ্ছে। তিনি খেতে পারছেন না, খেলেই বমি হয়ে যাচ্ছে। জ্বর আছে গায়ে, শরীরে প্রচ- ব্যথা। এ অবস্থায় তার উন্নত চিকিৎসা খুবই প্রয়োজন। উনার শরীর এত খারাপ, এ মুহূর্তে যদি উনার উন্নত চিকিৎসা না হয়, তা হলে কী হবে Ñ এটা আমরা বলতে পারছি না। আমাদের আবেদন, তাকে মানবিক দিক বিবেচনায় মুক্তি দেয়া হোক।
পরিবারের প থেকে কোনো আবেদন সরকারের কাছে করা হয়েছে কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমরা এখনো আবেদন কারও কাছে করিনি। কিন্তু আমরা জাতির কাছে, দেশবাসীর কাছে আবেদন জানাচ্ছি, আপনারা সবাই উনার জন্য দোয়া করবেন এবং উনার মুক্তি যেন হয় সে চেষ্টা আপনারা করেন।
জানা গেছে, খালেদা জিয়ার ছোটো ভাই শামীম ইস্কান্দার পরিবারের প থেকে সর্বাধুনিক সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে তাকে বিদেশে পাঠানোর জন্য মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ চেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল কর্তৃপকে চিঠি দিয়েছেন। খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর জন্য তার পরিবারের প থেকে এটাই প্রথম লিখিত আবেদন। এই আবেদন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে।
এদিকে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির প্রশ্নে গত ১৪ জানুয়ারি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিতের আবেদন করা হলে সরকার তা বিবেচনা করতে পারে। জেলখানায় যারা থাকেন এবং বহুদিন কারাদ- ভোগ করেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ (১) ধারা অনুযায়ী তাদের দ- নানা বিবেচনায় অনেক সময় স্থগিত হয় উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল সেদিন বলেছিলেন, সাধারণত সাজা সাসপেন্ড করা হয় অনেক দিন সাজা খাটার পর। সরকার বিশেষ বিবেচনায় এটা স্থগিত করতে পারে।
কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি বিএসএমএমইউ হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সেলিমা রহমান সাজা স্থগিতের কথা বলেননি। তিনি মানবিক দিক বিবেচনায় মুক্তির কথা বলেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালত সে সাজা দেয়, সেটা মওকুফের এখতিয়ার আদালতেরই। সরকার কোনো সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে মানবিক দিক বিবেচনায় মুক্তি দিতে পারে না।
বিএনপির একটি সূত্র বলছে, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারও চিন্তিত। সরকারের একটি অংশ মনে করছে, খালেদা জিয়া যদি জেলে মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে তা সরকারের জন্য খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে। সরকার চাইছে খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করুক। কিন্তু খালেদা জিয়া যেহেতু সে আবেদন করছেন না, সেহেতু অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে সরকার সাজা স্থগিতের বিষয়টি সামনে এনেছে। আর খালেদা জিয়ার পরিবার সাজা মওকুফের বিষয়টি সামনে আনার পর সেখানেও ব্যর্থ হয়ে এখন মানবিক দিক বিবেচনায় মুক্তির কথা বলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আসলে এ মুহূর্তে সরকারের অনুকম্পা ছাড়া কোনো মাধ্যমেই খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়। আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর মুক্তির যে সম্ভাবনা ছিল, তা লেজে-গোবরে করে ফেলেছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। রাজনৈতিকভাবে তার মুক্তির যে সম্ভাবনা ছিল, আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে সে সম্ভাবনাও নষ্ট করে ফেলেছেন বিএনপির সুবিধাবাদী নেতারা, প্যারোলে মুক্তির যে সম্ভাবনা ছিল তা বাস্তবায়ন হতে দিচ্ছেন না খালেদা জিয়া নিজেই। এরপর বাকি থাকে সাজা মওকুফ, বিশেষ বিবেচনা এবং মানবিক বিবেচনায় মুক্তি। কিন্তু সরকার তাতে আগ্রহী নয় বলেই মনে হচ্ছে।
এখন সরকার যদি উপযাচক হয়ে অনুকম্পা করে বিদেশে চলে যাওয়ার শর্ত আরোপ করে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয় তাহলেই তাঁর মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ ছাড়া অন্য সব পথই আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে।