প্রতিবেদন

করোনা ভাইরাস আতঙ্কে বিশ্ব: হুমকির মুখে অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনা ভাইরাস আতঙ্কে কাঁপছে চীন। তার ওপর চীনের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস। বাড়ছে আক্রান্তের ও মৃতের সংখ্যা। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দ্রুত। সব মিলিয়ে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পাশাপাশি এর নেতিবাচক ঢেউ বয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশেও। দেশের অভ্যন্তরে ইতোমধ্যে বিভিন্ন চীনা পণ্যের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এতে পণ্যের দামও বাড়ছে। অনেকে আবার ভবিষ্যৎ সঙ্কটের কথা মাথায় রেখে এখনই চীনা পণ্যের মজুদ করছে। ফলে অনেক চীনা পণ্যের কৃত্রিম সংকটও দেখা দিচ্ছে। এতে বাজারে ইতোমধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীনা পণ্য আমদানি বন্ধের ধাক্কা লাগবে বাংলাদেশের ফুটপাতের দোকানগুলোতে। আশঙ্কা রয়েছে আমদানি-রপ্তানি ও পর্যটন খাতে। তবে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তৈরী পোশাক রপ্তানি খাতে। কারণ তৈরী পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ চীন। প্রতিদ্বন্দ্বীর এমন বিপর্যয়ের মধ্যেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন তৈরী পোশাক শিল্পের বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা। তাদের আশা, করোনার প্রভাবে চীনের রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। আর এ সুযোগে অর্ডার বাড়তে পারে বাংলাদেশের। এ জন্য এখনই দ্রুত পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়ে রপ্তানিকারকরা বলছেন, সময়মতো পদপে নিতে ব্যর্থ হলে অর্ডার চলে যাবে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াসহ আশপাশের দেশে। তাই তৈরী পোশাকবাজারে চীনের শূণ্যস্থান ধরতে ডলারের বিপরীতে টাকার ক্রমাবনতির পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ ও বন্দর সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন পোশাক শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্যমতে, বর্তমানে তৈরী পোশাকের বিশ্ববাজার ৪২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। এ মার্কেটের বেশিরভাগ দখল করে আছে চীন। ২০১৭ সালে মোট বাজারের প্রায় ৩৫ শতাংশ দখল করেছিল চীন। ২০১৮ সালে এসে তা সাড়ে ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। তবে ভিয়েতনামের সাম্প্রতিক দ্রুত উত্থানে তীব্র চাপের মুখে আছেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা।
ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিকস রিভিউ-২০১৯এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং চীন, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ভারত, তুরস্ক, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এই শীর্ষ ১০টি অঞ্চল ও দেশ ৪২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের তৈরী পোশাক রপ্তানি করেছে, যা বিশ্বের মোট রপ্তানির ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে চীন। বৈশ্বিক বাজারে দৈশটির হিস্যা ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ। পোশাক রপ্তানিতে চীনের পেছনেই আছে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ৩ হাজার ২৯২ কোটি এবং ভিয়েতনাম ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। উভয় দেশের বাজার হিস্যা এখন প্রায় কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৯ সালে ১০ শীর্ষ রপ্তানিকারকের মধ্যে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা ছিল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্য দিকে ভিয়েতনামের বাজার হিস্যা ৬ দশমিক ২ শতাংশ।
এরই মধ্যে চীনে মহামারী আকার ধারণ করেছে করোনা ভাইরাস। এ ভাইরাসে প্রতিদিনই মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এ পর্যন্ত দেশটির মূল ভূখ-েই সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৪৮৫ জন এবং আক্রান্ত ৬৫ হাজার।
বিশ্লেষকদের ধারণা, করোনা ভাইরাসের কারণে তীব্র চাপে পড়বে চীনের অর্থনীতি। এরই মধ্যে চীন সফর বাতিল করেছেন শত শত আমদানিকারক। চীনের বেসামরিক উড়োজাহাজ কর্তৃপ বাতিল টিকিটের টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেয়ার পর দেশটির ৩টি প্রধান এয়ারলাইন: চায়না সাদার্ন এয়ারলাইন্স, চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স এবং চায়না এয়ারের শেয়ার দর পড়ে গেছে। চলতি সপ্তাহে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের শেয়ারদর ১৩ শতাংশ কমে গেছে। চীনের বৃহত্তম অনলাইন ট্র্যাভেল এজেন্সি ট্রিপডটকম এরই মধ্যে হোটেল বুক, গাড়ি ভাড়া এবং পর্যটন এলাকার টিকিট বুকিং বাতিলে ফি মওকুফ ঘোষণা করেছে।
করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১৩টি শহরের সাথে বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে চীন সরকার। ফলে অসংখ্য মানুষ উড়োজাহাজের টিকিট ও হোটেল বুকিং বাতিল করছে। হোটেল কোম্পানিগুলোও উহানসহ চীনের বিভিন্ন শহরে ভ্রমণেচ্ছুদের হোটেল বুকিং বাতিল করলে টাকা ফেরত দিচ্ছে। ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলস গ্রুপ এবং হায়াত নতুন চান্দ্রবছর বরণ মৌসুমে চীনের কেউ হোটেল বুকিং বাতিল বা তারিখ পরিবর্তন করতে চাইলে তা বিনা খরচে করে দিচ্ছে।
চীনে ইন্টারকন্টিনেন্টালের ৪৪৩টি হোটেল রয়েছে। অধিকাংশ এয়ারলাইন্স ভাড়ার টাকা ফেরত দেয়া এবং প্রয়োজনে কোনো ফি ছাড়াই আবার বুক করার সুযোগ দিচ্ছে। বড় হোটেলগুলোতে প্রচুর সিট খালি থাকছে।
করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা অনুমান করার েেত্র ২০০২-০৩ সালের দিকে চীনে দেখা দেয়া করোনা ভাইরাসের সমগোত্রীয় সার্সের (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম) প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। ওই ভাইরাসটিরও উৎপত্তি হয়েছিল চীনে। সেসময় বেশ তিগ্রস্ত হয়েছিল বিশ্ব অর্থনীতি। বিশ্ব অর্থনীতিতে এর তির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।
লন্ডনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকস জানায়, ২০০৩ সালে সার্সের কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি নেমে গিয়েছিল পুরো ১ শতাংশ। এবার নতুন ভাইরাস করোনার কারণে চীন তো বটেই, বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যে দেশগুলো নেতিবাচক প্রভাবের তালিকায় উপরের দিকে আছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম বলে জানিয়েছে ক্যাপিটাল ইকোনমিকস।
করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পরবর্তী ১৮ মাসের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাড়ে ৬ কোটি মানুষ উজাড় হয়ে যাবে বলে কয়েক মাস আগে সতর্ক করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। গত বছরের অক্টোবর মাসে এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গবেষণাকেন্দ্র জন হপকিনস সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি নতুন একটি ভাইরাস সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছিল, এতে আক্রান্ত হয়ে ৬ কোটি মানুষ মারা যেতে পারে। এই সতর্কতার মাত্র ৩ মাস পরই গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের উহানে প্রথম করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। বিশ্বের ৩০টির মতো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে কেউ আক্রান্ত না হলেও সিঙ্গাপুরে ৪ জন বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তারা সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে আছেন।
অবশ্য চীনের ওপর দিয়ে বয়ে চলা এ বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে তৈরী পোশাক রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধারা অনুযায়ী, চীন থেকে রপ্তানি কমলে অপরাপর দেশ থেকে বাড়বে Ñ এটাই স্বাভাবিক। এ েেত্র বিশ্ববাজারে বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের সম্ভাবনাই বেশি। বায়াররা ইতোমধ্যেই যোগাযোগ করতে শুরু করেছেন। দেখা গেছে একই কোম্পানি চীন থেকেও পোশাক কেনে, বাংলাদেশ থেকেও কেনে। পরিস্থিতি বিবেচনায় চীনে অর্ডার বাদ দিয়ে তারা এখন বাংলাদেশের দিকে ভিড়ছে।
বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের ওভেনের ৬৫ ভাগ ফেব্রিক চীন থেকে আমদানি করা হয়। অর্থাৎ ওভেন পোশাক রপ্তানির ৬৫ ভাগ চীনের ওপর নির্ভরশীল। গত অর্থবছর বাংলাদেশ ওভেন রপ্তানি করেছে ১ হাজার ২৪৪ কোটি ডলারের। অর্থাৎ প্রতি মাসে রপ্তানি হয় ১০৩ কোটি ডলার। এর ৬৫ ভাগ হলো ৬৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ ১ মাসে চীন থেকে ফেব্রিক আমদানি না করতে পেরে রপ্তানি করতে না পারলে এই পরিমাণ তি হবে টাকার অঙ্কে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বিজিএমইএ-কে জানানো হয়েছে, চীনে চলমান নববর্ষের ছুটি ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাতে নববর্ষের পর যেসব ফেব্রিক বাংলাদেশে পাঠানো কথা ছিল, সেগুলো সময়মতো পাওয়া যাবে না। এতে বাংলাদেশের বিপুল তি হবে।
পোশাক খাতের মতো বিপাকে রয়েছেন চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরাও। সাভারের চামড়াশিল্প নগরে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) চালু না হওয়ায় ইউরোপের ক্রেতারা সরাসরি বাংলাদেশ থেকে চামড়া কেনে না। বর্তমানে দেশের ৭০ শতাংশ চামড়ার ক্রেতাই হচ্ছে চীনারা। গত বছর ১৬ কোটি ডলারের চামড়া রপ্তানি হয়েছিল। ১ মাস চীনে রপ্তানি করতে না পারলে তাদের রপ্তানি কমবে ১১৫ কোটি টাকার।
এদিকে আমদানি করা পিঁয়াজের ১০-১৫ ভাগ চীন থেকে আসে। করোনা ভাইরাসের কারণে চীনা পিঁয়াজ আসা বন্ধের অজুহাতে ইতোমধ্যে বাজারে পিঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করেছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত অর্থবছর ৬৪ হাজার ৭৯৬ টন রসুন এসেছে চীন থেকে। ভাইরাসের অজুহাত তুলে রসুনের দামও বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে চীন থেকে আমদানি হওয়া আদার দামও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কারণ বাংলাদেশের অনেক শিল্পের কাঁচামাল ও ব্যবসাবাণিজ্যের উপকরণ চীন থেকে আসে। এখন এসব পণ্য আমদানি বন্ধ থাকার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিশ্ববাজারে ১ হাজার ৯৩০ কোটি ২১ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ২ হাজার ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পণ্য। অর্থাৎ গত অর্থবছরের প্রথমার্ধের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে রপ্তানি কমেছে ১১৯ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার ডলার বা ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম ২ মাসে রপ্তানির নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির যে ধারা শুরু হয়, প্রথমার্ধ শেষেও তা অব্যাহত আছে। এ জন্য তৈরী পোশাক শিল্প খাতের ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে পোশাক রপ্তানি হয় ১ হাজার ৬০২ কোটি ৪০ লাখ ১০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৭০৮ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার ডলারের পোশাক। এ হিসাবে ৬ মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১০৬ কোটি ডলারের বেশি তথা ৬ দশমিক ২১ শতাংশ।
বাংলাদেশ চীন থেকে প্রচুর পণ্য আমদানি করে। করোনা ভাইরাসের কারণে আমদানিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এরই মধ্যে আমদানির েেত্র চীনের বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করেছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। তাদের আশঙ্কা, করোনার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে কাঁচামাল নিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে। তাই স্বল্প সময়ে বিকল্প উৎস-দেশের (সোর্স কান্ট্রি) সাথে আলোচনা জোরদার করা হয়েছে।
দেশের ুদ্র থেকে বৃহৎ শিল্প পণ্য আমদানির সবচেয়ে বড় বাজার হলো চীন। দেশটি থেকে অনেক খাদ্যপণ্যও আসে দেশের বাজারে। পরিস্থিতির আরো সংকটাপন্ন হলে বাংলাদেশের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা বড় অংশ চীনের সঙ্গে সম্পর্কিত। করোনার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হবে আমদানির পরিসরে। পোশাক, চামড়া ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতেও প্রভাব পড়বে। দেশের অসংখ্য ুদ্র ব্যবসায়ী ব্যক্তিগত পর্যায়ে চীনা পণ্যের ব্যবসা করে। ই-কমার্স, ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা এবং ফুটপাতের দোকানগুলোর ব্যবসা অন্যতম। কিন্তু হঠাৎ করে চীন থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ হওয়ায় এ ধরনের ব্যবসায়ীদের একটি ধাক্কার মুখে পড়তে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ুদ্র পর্যায়ের এসব ব্যবসার েেত্র করোনার প্রভাব দৃশ্যমান হবে বেশি। যদিও এটি দেশের অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি প্রভাব ফেলে না বলে মনে করেন অনেকে। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, দেশের অর্থনীতিতে এ ধরনের ুদ্র উদ্যোগের ভালো অবদান রয়েছে।
উৎপাদন খাতেও করোনার বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামালের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে চীন থেকে। বর্তমানে এসব কাঁচামাল আমদানি বন্ধ। পূর্বের মজুদ দিয়ে এখন চলছে। করোনা ভাইরাসের কারণে আপাতত চীন থেকে পণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে। ফলে নতুন করে এসব কাঁচামাল আর আসছে না। মজুদ ফুরিয়ে যেতে যেতে করোনা ভাইরাসের সমাধান না হলে এর প্রভাব প্রকট হতে পারে।
খেলনা, প্লাস্টিক পণ্য, খাদ্য থেকে শুরু করে ভারী শিল্পের অনেক যন্ত্রপাতি আমদানি হয় চীন থেকে। রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মেশিনারিজ, কাঁচামাল, প্রাথমিক পণ্যও আমদানি হয় দেশটি থেকে। দেশের বড় অবকাঠামো উন্নয়নকাজের অনেক যন্ত্রপাতি আমদানি হয়। এসব প্রকল্পের কাজও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত চীনা নাগরিকদের যারা তাদের দেশে রয়েছেন, তাদের কাজে যোগ দিতেও দেরি হবে। এতে প্রকল্পের কাজে সমস্যা না হলেও কিছুটা প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে একক দেশ হিসেবে চীন সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশে। এই বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ছিল ১৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। যা ওই অর্থবছরের মোট আমদানির ২৬ দশমিক ১ শতাংশ।
অন্যদিকে চীনে পাট ও পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।
করোনা ভাইরাস আতঙ্কের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের পর্যটন খাতেও। চীনের অনেক পর্যটক বাংলাদেশে আসেন। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বিভিন্ন কারণে চীনে যাতায়াত করেন। অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক কারণ ছাড়াও অনেকে চীনে ভ্রমণ করেন। বিশেষ করে শীতকাল বা তার কাছাকাছি সময়ে। কিন্তু করোনার কারণে বিমান যোগাযোগ অনেকটা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ইতোমধ্যে চীন ভ্রমণ বাতিল করেছেন অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও পর্যটক। ফাইটের বুকিং বাতিল করা ছাড়াও টিকিট কনফার্ম থাকার পরও যাত্রী বিমানবন্দরে উপস্থিত না হওয়ায় যাত্রা বাতিল হচ্ছে।

শেষ কথা
দ্রুত ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের কারণে চীন-বাংলাদেশের বাণিজ্য ঝুঁকি থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজছে সরকার। এমনকি ব্যক্তিগত উদ্যোগে যারা চীনা পণ্য আমদানি করে থাকেন, তারাও এখন করোনা
ভাইরাসের কারণে চীনের বিকল্প দেশের সন্ধান করছেন। তবে সমস্যা হলো, চীনা পণ্যের চাইতে অন্যান্য দেশের পণ্যের দাম অনেক বেশি।
এ নিয়ে সম্ভাব্য পন্থা নির্ধারণে আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেখানে করোনা ভাইরাসের বিরূপ প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সার্বিক অবস্থা কেমন হতে পারে – এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারের কী করণীয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা দফায় দফায় বৈঠক করছেন।
করোনা ভাইরাসের কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কাস্টমস তথ্য পাঠিয়েছে। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে বাণিজ্যে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আগে যেখানে মাল খালাসে ৪ থেকে ৬ দিন লাগত, এখন ১ দিনের মধ্যেই জাহাজ খালাস করা যাচ্ছে। কারণ চীন থেকে পণ্য শিপমেন্ট না হওয়ায় জাহাজে পণ্য পরিবহন কম হচ্ছে। ফলে ১ দিনেই ১টি জাহাজের পণ্য খালাস করা যাচ্ছে।
জানা গেছে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বিষয়ে শিগগিরই একটি প্রতিবেদন দেবে এফবিসিসিআই। এ প্রতিবেদনের ওপর সরকার পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে। তৈরী পোশাক খাতের কাঁচামাল এবং অন্যান্য পণ্য আমদানি-রপ্তানির েেত্র বিজিএমইএ ও বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে কাজ করছে।