প্রতিবেদন

জমে উঠেছে একুশে বইমেলা: খুশি ক্রেতা-বিক্রেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
বসন্ত এসে গেছে। শীত করছে যাই যাই। একুশে বইমেলার দিকে তাকালে অবশ্য যে কারো মনে হবে, বসন্তের রঙে রঙিন এখন মেলার সব প্রান্ত। পাঠক সমাগমের সঙ্গে বেড়েছে বই বিক্রিও। ৮ ফেব্রুয়ারি প্রপোজ ডে হওয়ায় অনেকের হাতে ও মাথায় শোভা পায় বাহারি ফুল। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে পাঠকের হাতে ফুলের পাশাপাশি ছিল প্রিয়জনকে উপহার দেয়ার জন্য বই। প্রিয়জনের প্রতি গভীর অনুরাগে এখন শুধু ফুলই উপহার দেয়া হয় না, বই-ও হয়। এ দৃশ্য মনোহর।
১৪ ফেব্রুয়ারি পহেলা ফাল্গুন হওয়ায় বাসন্তি রঙে সাজে বইমেলা। সাথে অনেক তরুণ-তরুণীর হাতেই দেখা যায় গল্প, উপন্যাস ও কবিতার বই।
মেলার শিশুপ্রহরও জমজমাট। বই কেনা, সিসিমপুরে টুকটুকি ও হালুমের সঙ্গে দুরন্তপনায় ছোট্ট সোনামনিরা বাড়তি আনন্দ যোগ করছে বইমেলায়।
রাতের বেলা বইমেলা দেখলে মনে হয় যেন বিশাল মাঠে আলো ঝলমলে এক স্বপ্নপুরী। আলোর রোশনাইয়ে মেলা হয়ে ওঠে রঙিন, বর্ণময়।
বই বিক্রির বাইরে এসে বইমেলা এ বছর সত্যিকার অর্থেই মেলা হয়ে উঠেছে, যেখানে বই কেনাবেচার বাইরেও দর্শনার্থীদের জন্য ভিন্ন কিছু আয়োজন রেখেছে মেলা কর্তৃপ। সবচেয়ে ভালো দিকটি হচ্ছে এবারে মেলা চত্বরজুড়েই সুন্দর বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়েছে খাবারের স্টল, যেখানে সাশ্রয়ী দামে মিলছে খাবার। ফলে স্টলে বই কেনার পাশাপাশি বসে জিরিয়ে নিতে পারছেন দর্শনার্থীরা।
কর্মব্যস্ততার কারণে দেখাসাক্ষাৎ না হওয়ায় বন্ধুবান্ধবদের দেখাসাক্ষাতের স্থান হচ্ছে বিকেল-সন্ধ্যার বইমেলা। এতে অনেকদিন পর দেখাসাক্ষাৎ-আড্ডা, বই কেনা – দুটোরই সমন্বয় করছেন ক্রেতা-দর্শনার্থীরা।
বইমেলার দৃষ্টিনন্দন প্যাভিলিয়নগুলোও দর্শনীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এবারের মেলায় ৩৪টি প্যাভিলিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে কথাপ্রকাশ, ইউপিএল, বাংলা প্রকাশ, পাঞ্জেরী, ঐতিহ্য, জার্নিম্যান বুকস, শোভাপ্রকাশের প্যাভিলিয়নগুলো দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে। প্রতিদিনই অনেককে এসব প্যাভিলিয়নের পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে দেখা যায়। এছাড়া মেলার স্টলের মধ্যে বাতিঘর, কুঁড়েঘরসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান সুন্দর ডিজাইনের স্টল নির্মাণ করেছে, যা মানুষের মাঝে কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
মুজিব জন্মশতবর্ষকে সামনে রেখে এবারের বইমেলা নতুন করে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে ৪ ভাগ করে বঙ্গবন্ধুর জীবনকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। ‘শেকড়’, ‘সংগ্রাম’, ‘মুক্তি’, ‘অর্জন’ Ñ এই ৪টি ভাগে বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবনের অর্জনকে তুলে ধরার প্রয়াস রয়েছে। ছবি, বঙ্গবন্ধুর কথামালা ও তার অর্জনের বিভিন্ন বিষয়কে দৃষ্টিনন্দনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলা একাডেমি বইমেলায় ২৬টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। এর পাশাপাশি বইমেলায় অংশ নেয়া অধিকাংশ প্রকাশনীই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিশেষ গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। প্রতিদিন বইমেলার মূল মঞ্চে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত গ্রন্থগুলো নিয়ে আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে।
বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার মালিকরা বলছেন, এবারের মেলায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বিন্যাস। এর ওপরই আমরা এত বছর ধরে জোর দিয়ে আসছিলাম। পরিসর যেহেতু বেড়েছে, সেদিক থেকে পাঠকরা মেলায় এলে যাতে মানসম্মত খাবার, পানি, চা পানের সুযোগ পান, সে ব্যবস্থার কথাও আমরা বলেছিলাম। তার ব্যবস্থাও হয়েছে। সব মিলিয়ে এবারের গ্রন্থমেলার আয়োজন বেশ ভালো হয়েছে।
তবে এবারের মেলার পরিসর বড় ও গোছানো হলেও স্টল বিন্যাস নিয়ে ােভ প্রকাশ করেন কয়েকজন প্রকাশক। তাদের মতে, অনেক অপ্রকাশককে স্টল বরাদ্দ দেয়ার জন্য মেলার পরিসর বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে মেলার সৌন্দর্যহানি ঘটছে।
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের দেয়া তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিনই মেলায় ২০০’র মতো বই আসছে। বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা বই আসছে প্রচুর। বাংলা একাডেমি এনেছে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ও ফকরুল আলম অনূদিত বঙ্গবন্ধুর শিশুতোষ জীবনী গ্রন্থ ‘ব্যালাড অব আওয়ার হিরো বঙ্গবন্ধু’; শোভা প্রকাশ এনেছে জুলফিকার নিউটনের প্রবন্ধ ‘বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনীতি’; আগামী প্রকাশনী বের করেছে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক বেলাল চৌধুরীর ‘বত্রিশ নম্বর’ ইত্যাদি।
এছাড়া উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে অনিন্দ্য থেকে এসেছে মোশতাক আহমেদের সায়েন্স ফিকশন ‘রিরি’; পুথিনিলয় এনেছে ‘বুক পকেটে রবীন্দ্রনাথ’ (২৫ খ-); মারুফুল ইসলামের ‘মানুষ মানুষ আয়না’ এনেছে চন্দ্রাবতী একাডেমি; বাংলা প্রকাশ বের করেছে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতা’, শিশু গ্রন্থকুটির থেকে এসেছে জাহীদ রেজা নূরের ‘স্পেনের রূপকথা’; কথাপ্রকাশ এনেছে সুমন্ত আসলামের ‘প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন চা খেতে আসেন আমাদের বাসায়’ অনন্যা এনেছে ‘শামসুর রাহমানের গল্প’; জ্ঞানকোষ প্রকাশনী থেকে এসেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘আমার সাইন্টিস মামা’।
অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচন সবার নজর কাড়ে। এতে ‘ক’ শাখায় ১৩০ এবং ‘খ’ শাখায় ৭০ শিশু-কিশোর অংশ নেয়। বিচারক ছিলেন রেজীনা ওয়ালী লীনা, ফয়জুল আলম পাপ্পু ও ফয়জুল্লাহ সাঈদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম।
বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচনও ছিল নজরকাড়া। ‘ক’ শাখায় ৭৯ এবং ‘খ’ শাখায় ৮৮ শিশু-কিশোর অংশ নেয়। বিচারক ছিলেন এএসএম মহিউজ্জামান চৌধুরী (ময়না), ইয়াকুব আলী খান ও চন্দনা মজুমদার।
গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে প্রতিদিনই আলোচনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৮ ফেব্রুয়ারি ছিল এম আবদুল আলীম রচিত ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা-আন্দোলন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। আলোচনায় অংশ নেন প্রতিভা মুৎসুদ্দি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। এরপর কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি অঞ্জন সাহা, আতাহার খান, টোকন ঠাকুর ও রাসেল আশেকী। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী ইকবাল খোরশেদ, মাসুদুজ্জামান ও মীর মাসরুর জামান রনি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় গোলাম কুদ্দুসের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বহ্নিশিখা’। সংগীত পরিবেশন করেন আবুবকর সিদ্দিক, অণিমা মুক্তি গোমেজ, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস ও মুরাদ হোসেন।
‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন শামীম রেজা, দীপু মাহমুদ, শিহাব শাহরিয়ার ও সাদিয়া মাহজাবীন।
শিকড় প্রকাশনীর প্রকাশক মিলন দেবনাথ স্বদেশ খবরকে বলেন, এবারের বইমেলা শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কারণে এবার বইমেলা ১ দিন পিছিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর আবহ সৃষ্টি হতেই ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিন কেটে গেছে। এ সময় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখেনি বইমেলা। তবে মাসের দ্বিতীয় প্রান্তিকে জমতে শুরু করেছে মেলাপ্রাঙ্গণ। ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে এর আঁচ পাওয়া গেছে। এ সপ্তাহে পহেলা ফালগুন ও ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে মেলায় বই বিক্রি বেড়েছে অন্য বছরের তুলনায় বেশি।
মেলায় রোজ আসছে নতুন নতুন বই। দিনের বেলা কিশোর-কিশোরীদের পদচারণা বেশি দেখা যাচ্ছে। আসছেন লেখক-সাহিত্যিকরা। তারা ধুমসে আড্ডা দিচ্ছেন, দিচ্ছেন অটোগ্রাফও। তবে এক দশক আগে প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদ অটোগ্রাফের যে ক্রেজ সৃষ্টি করেছিলেন, এখন তা অনেকটাই অনুপস্থিত।
মেলার প্রধান গেটের বাইরে অন্যবারের মতো এবারও আছে হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা। বয়োজ্যেষ্ঠ, অসুস্থ ব্যক্তিদের হুইল চেয়ারে ঘুরিয়ে আনতে এই আয়োজন করেছে মেলা কর্তৃপক্ষ। এবারের মেলায় অনেক ফাঁকা স্থান থাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন পাঠক ও লেখকরা। সব মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতেও বিক্রির পরিমাণ আরো বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছেন প্রকাশক ও আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি।
ইত্যাদি প্রকাশনীর প্রকাশক জুয়েল রানা জানান, এবারের মেলায় মানুষের মধ্যে বই কেনার আগ্রহ বেড়েছে। কয়েক বছর আগেও মেলায় হুমায়ূন আহমেদ ও জাফর ইকবালের বই বেশি বিক্রি হতো। এবার তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। ইতিহাসভিত্তিক বই বেশি বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা বইয়ের কাটতি ভালো।
মেলায় বই কিনতে আসা সিনিয়র সাংবাদিক হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী জানান, বইমেলার পরিবেশ এবার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে সুন্দর। মেলায় কোনো প্রকাশনীর একচেটিয়া প্রাধান্য নেই। মানুষ শুধু গল্প-উপন্যাস না কিনে ভিন্নধর্মী বইও কিনছে। প্রচুর শিশু-কিশোর আসছে বইমেলায়। বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে গড়ে তুলতে অভিভাবকরা তাদের নিয়ে আসছেন মেলায়। তারা প্রচুর বইও কিনছে। মেলা থেকে বের হওয়ার সময় শিশু ও তাদের অভিভাবকদের হাতে একগুচ্ছ বই দেখার দৃশ্য সত্যিই আনন্দদায়ক।