প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে বিভক্তি-অস্থিরতা, কাজকর্মে স্থবিরতা: অসহায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক
গত ৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান অতিরিক্ত সচিব রাশিদুল ইসলামের চাকরি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করার আদেশ জারি হওয়ার পর থেকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাজকর্মে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিশেষ করে ৯ ফেব্রুয়ারি সংস্থার চেয়ারম্যান মো. রশিদুল ইসলামের রিলিজ অর্ডার ইস্যু হওয়ার পর থেকে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে বড় ধরনের বিভক্তি ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অতীতে একই পদে ১৫-২০ বছর যাবৎ হেড অফিসে কর্মরত ছিলেন এমন কিছু ব্যক্তি, যাদেরকে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল, তাদের অনেকেই এখন বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকায় এসে হেড অফিস ও মিরপুর অফিসে মহড়া দিচ্ছে, বিজয় উল্লাস করছে, ভুরিভোজ আর মিটিং করছে পূর্বের পদ ফিরে পেতে। এদের অনেকেই সরকারি চাকরির নিয়মকানুন অমান্য করে বেশ কয়েক দিন যাবৎ ঢাকায় অবস্থান করছে। এদের অনেকেই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও সাময়িক বরখাস্তকৃত এবং ইতঃপূর্বে হেড অফিস থেকে বদলিকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারী। ঢাকায় বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী, যারা রাশিদুল ইসলামের দুর্নীতিবিরোধী সিদ্ধান্ত ও কর্মকা- সমর্থন করেছিল, তাদেরকে তারা ঢাকার বাইরে বদলি করার হুমকি দিচ্ছে এবং নানাভাবে হেনস্তা করছে।
এদিকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে রাশিদুল ইসলামের বিদায় এবং গত ৯ ফেব্রুয়ারি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে সংস্থার সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) ও সরকারের যুগ্ম সচিব মো. মাহমুদুল হোসাইন খান দায়িত্ব নেয়ার পরপরই সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানের উদ্ধারকৃত সম্পত্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাইন বোর্ডের স্থলে রাতারাতি প্রভাবশালী হাউজিং কোম্পানির সাইন বোর্ড লাগানো হয়েছে।
মিরপুরের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মো. জাহিদ হোসেন স্বদেশ খবরকে জানান, মিরপুর কালশীর মোড়ে রাশিদুল ইসলামের সাহসী উদ্যোগ ও দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে উদ্ধারকৃত মূল্যবান সম্পত্তিতে এখন রহস্যজনক কারণে সাগুপ্তা হাউজিংয়ের বিশাল সাইন বোর্ড দেখা যাচ্ছে, যেখানে কয়েক দিন আগেও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাইন বোর্ড ছিল।
তিনি জানান, সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যানের সাথে আলাপকালে তিনি জানতে পেরেছিলেন, মিরপুর স্বপ্ন নগর ১ এবং স্বপ্ন নগর ২ হাউজিং প্রকল্পের সফল পরিসমাপ্তির পর মিরপুরের ৯নং সেকশনের স্বপ্ন নগর দ্বিতীয় প্রকল্প সংলগ্ন স্বপ্ন নগর ৩ হাউজিং প্রকল্প নেয়ার পরিকল্পনা করছিলেন সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলাম। রাশিদুল ইসলামের বদলি আদেশ জারি হওয়ার পরপরই তা অপদখল হয়ে গেছে।
কর্নেল জাহিদ (অব.) বলেন, তার শ্বশুরবাড়ি এলাকা বরিশাল শহর থেকে অনেক দূরে রূপাতলী এলাকা এবং দিনাজপুর ও যশোরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও রাশিদুল ইসলাম জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বেহাত হয়ে যাওয়া সম্পত্তি উদ্ধার করেছেন। একইভাবে ঢাকার মিরপুরের ৮নং সেকশনের দুয়ারিপাড়া মৌজায় অবৈধ দখলে থাকা ৩১ একর সরকারি সম্পত্তিসহ সারাদেশে অবৈধ দখলে থাকা সংস্থার ৮০০ একরেরও বেশি জমি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান মো. রাশিদুল ইসলাম।
তাছাড়া রাশিদুল ইসলাম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে যে সুশাসন নিশ্চিত হয়েছিল, তিনি বদলি হওয়ার পরপরই তা ভেস্তে যেতে বসেছে। সেবাগ্রহীতাদের সেবা কার্যক্রম একেবারেই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অফিসে ইতঃপূর্বের শৃঙ্খলা ও কাজের পরিবেশ বলে কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই। সুশৃঙ্খল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। গ্রাহকসেবা প্রদানের লক্ষ্যে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রবেশপথে যে ‘ফ্রন্ট ডেস্ক সেবা’ কার্যক্রম চালু করা হয়েছিল, তা রাশিদুল ইসলাম বদলি হয়ে চলে যাওয়ার পরপরই বন্ধ হয়ে গেছে। তৎকালীন চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলাম নিজে অফিসে আসতেন সকাল আটটা-সাড়ে আটটার দিকে এবং অন্যদের ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিতির বিষয়টি তদারকি করতেন। এমনকি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পূর্বের দিন হাজিরা খাতায় অগ্রীম স্বাক্ষর করে পরের দিন অফিসে অনুপস্থিত থাকছেন কি না তারও খোঁজ রাখতেন রাশিদুল ইসলাম। সরকারি অফিসে এসব নিয়মনীতি ও বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকা অনেকেরই পছন্দ ছিল না। অবশ্য রাশিদুল ইসলাম চলে যাওয়ার পর এসব কঠোর নিয়মনীতি এখন আর অনুসরণ করতে হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
জানা যায়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রাশিদুল ইসলাম সংস্থার যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, তারা এখন সদম্ভে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে ফিরে এসে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। তাদের তা-বে অসহায় হয়ে পড়েছেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মাহমুদুল হোসাইন খানসহ অনেক নিরীহ কর্মকর্তা-কর্মচারী। এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে বর্তমানে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে সংস্থাটিতে ভয়াবহ সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে।
অনেকেই বলছেন, অতিরিক্ত সচিব রাশিদুল ইসলাম চলে যাওয়ার পর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে যে স্থবিরতা ও অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে রাশিদুল ইসলামের মতো দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তার নিয়োগ প্রদান করা জরুরি; যাতে শক্ত হাতে প্রতিষ্ঠানের কাজকর্মে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়।
জানা যায়, রাশিদুল ইসলাম বিগত ১৭ মাস ধরে অকান্ত পরিশ্রম করে সংস্থাটিতে যে নিয়মনীতি কার্যকর করেন, তিনি অন্যত্র বদলি হয়ে চলে যাওয়ার অব্যবহিত পর থেকেই তা মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায়। গত ১৭ মাসে যে গ্রাহক আস্থা তৈরি হয়েছিল, তা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অতীতের কোনো চেয়ারম্যানের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। মূলত গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করতে গিয়েই তিনি কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে গিয়েই এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর চক্ষুশূলে পরিণত হন রাশিদুল ইসলাম। ওই সব কর্মকর্তা-কর্মচারী রাশিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠে-পড়ে লাগে। তাকে কিভাবে অন্যত্র সরিয়ে দেয়া যায়, সে কাজে তারা ব্যাপৃত হয় এবং সিন্ডিকেট করে রাশিদুল ইসলামকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই কাজে নেতৃত্ব দেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে ৭ বছর যাবৎ চাকরি করার পর বর্তমানে ২ বছর চুক্তিতে কর্মরত সদস্য (ইঞ্জিনিয়ারিং) ফজলুল কবির। রাশিদুল ইসলাম যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, তাদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন প্রকৌশলী ফজলুল কবির। এদের অন্যতম বরখাস্তকৃত উপ-সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামান পলাশ ও চাকরিচ্যুত নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মুনিফ আহমেদসহ আরো কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল। এর বাইরে যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে রাশিদুল ইসলাম ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তারাও সম্পৃক্ত আছে এ সিন্ডিকেটে। তারা রাশিদুল ইসলামকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দিতে বড় অংকের একটি তহবিল গঠন করে। শোনা যায়, এ তহবিল ব্যবহার করেই তারা রাশিদুল ইসলামকে অন্যত্র বদলি করাতে সক্ষম হয়। সফলতার পর তারা বিজয় উল্লাসও করে বিভিন্ন স্থানে।
জানা যায়, ৪ ফেব্রুয়ারি রাশিদুল ইসলামের বদলি আদেশ ইস্যুর পর ৫ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেট সদস্যরা ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া, যশোর হয়ে খুলনা গিয়ে বিজয় উল্লাস করে এবং পরস্পরের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করে, যার ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ ফেব্রুয়ারি মিরপুর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহীন মিয়ার অনুপস্থিতিতে রাত ৮টার দিকে তার রুম খুলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চাকরি থেকে চাকরিচ্যুত নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মুনিফ আহমেদের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট সদস্যরা বিজয় উল্লাস করে।
উল্লেখ্য, মিরপুর জয়নগর প্রকল্পে এমবি ও বিল ছাড়া ১৯ কোটি টাকা ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রদান করে আত্মসাৎ করার কারণে ২০১৮ সালে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে চাকরিচ্যুত হন নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মুনিফ আহমেদ।
পরবর্তীতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি মিরপুর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহীন মিয়ার উপস্থিতিতেই তার রুমে দুপুরের দিকে তারই অধীনস্ত এসডিই নেজামুল হক মজুমদারকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের উপসহকারী প্রকৌশলী শাহরিয়ার জনি, ইমামুল ইসলাম ও জাহিদ হোসেন মিলে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। এ বিষয়ে ঘটনার শিকার নেজামুল হক মজুমদার অবশ্য কথা বলতে রাজি হননি। পরে ঘটনার নেপথ্য কারণ সম্পর্কে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মিরপুর অফিস সূত্রে জানা যায়, মিরপুর স্বপ্ন নগর প্রথম প্রকল্পের ৫, ৬, ৭ ও ৯নং ভবনে অতিরিক্ত কয়েক কোটি টাকা পেমেন্ট দেয়ার কথা ২০১৯ সালের শুরুর দিকে নেজামুল হক মজুমদার চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলামকে অবহিত করেছিলেন বলে তারা তখন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে তারা নেজামুল হক মজুমদারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। উল্লেখ্য, তখন ভ্যারিয়েশন অনুমোদনের কথা বলে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে অতিরিক্ত প্রদানকৃত অর্থ সমন্বয়ের চেষ্টা করেছিল উপরোক্ত তিন উপ-সহকারী প্রকৌশলী। এতে ঠিকাদার যেহেতু অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করেছে সেহেতু ভ্যারিয়েশন অনুমোদন না হওয়ায় দেড় বছর কাজ বন্ধ করে রেখেছে।
জানা যায়, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে মাত্র ১৭ মাস দায়িত্ব পালনকালে মো. রাশিদুল ইসলাম সংস্থাটিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে তিনি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করেন। এই অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে রাশিদুল ইসলাম দীর্ঘ ১৫-২০ বছর ধরে একই পোস্টে চাকরি করে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কাউকে ঢাকার বাইরে বদলি করেন, কাউকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেন, কাউকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সুপারিশ করেন। এখন সেই চক্রটি রাশিদুল ইসলামের বদলি হওয়ার সাথে সাথেই ঢাকার হেড অফিসে এসে বদলি বাতিল করার জন্য সংস্থার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে চাপ প্রয়োগ করছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী চেয়ারম্যান না হওয়ায় তিনি কেবল রুটিন কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ রাশিদুল ইসলাম যাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, তারা এখনই বদলি প্রত্যাহার করার জন্য তাঁকে চাপ প্রয়োগ করছে। আগের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রত্যাহারের ক্ষমতা না থাকায়, তিনি আছেন হুমকির মুখে। তাঁকে এ জন্য এরই মধ্যে অপদস্ত হতে হয়েছে বলেও শোনা যায়। এমনকি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাঁর অসহায়ত্বের কথা বললেও এই চক্রটি তা শুনতে রাজি নয় বলেও জানা গেছে। তাদের দম্ভোক্তি হলো, ‘রাশিদুল ইসলামকে আমরা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছি, এখন আমরা আর শাস্তিমূলক বদলি হওয়া কর্মস্থলে থাকবো না, এখনই আমরা আমাদের পছন্দমতো জায়গায় চাকরি করবো।’
জানা যায়, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও সাময়িক বরখাস্ত বদলিকৃত কর্মকর্তা/কর্মচারীগণ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (ইঞ্জিনিয়ারিং) ফজলুল কবিরের নেতৃত্বে অফিসের পরিবেশ নষ্ট করছে। এই চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, তারা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াচ্ছে, সরকারের ঊর্ধ্বতন একটি মহলের সঙ্গে নাকি তাদের ভালো যোগাযোগ আছে। এই যোগাযোগের কারণেই তারা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণাকারী রাশিদুল ইসলামকে বদলির ব্যবস্থা করেছে এবং সংস্থার সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল কবির নেপথ্যে থেকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ তথা চেয়ারম্যানকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।
এদিকে রাশিদুল ইসলাম চলে যাওয়ার পর থেকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সেবাগ্রহীতাদের সেবা কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ৬০-৭০ জনের যে দালালচক্র অফিসে জেঁকে বসেছিল, সাবেক চেয়ারম্যান যাদের বের করে দিয়েছিলেন, তারা আবার অফিসে ঢুকে পূর্বের ন্যায় ফাইলে কাজ করার জন্য বিভিন্ন কর্মকর্তাকে চাপ সৃষ্টি করছে।
সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সিন্ডিকেটভুক্ত ওই সব প্রকৌশলীর অবৈধ কর্মকা-ে যদি রাশিদুল ইসলাম বাধা প্রদান না করতেন এবং তিনিও যদি ওই সব প্রকৌশলীর মতো দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে যেতেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে অতীতের অন্য বিদায়ী চেয়ারম্যানদের মতো কখনও কোনো অভিযোগ উঠতো না। কিন্তু রাশিদুল ইসলাম সে পথে পা বাড়াননি, জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেননি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন এবং তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের দিকনির্দেশনা পালন করতে গিয়ে তিনি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কিছু প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর পথের কাঁটা হয়ে ওঠেন। ফলে রাশিদুল ইসলামকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য ফজলুল কবিরের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে এগোতে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইতালি সফরের অব্যবহিত আগে তারা এ কাজে সফল হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল কবিরের নেতৃত্বে পরিচালিত সিন্ডিকেটটি গত এক সপ্তাহ ধরে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তাতে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্রমেই তলানিতে ঠেকেছে। রাশিদুল ইসলাম জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের যে সুনাম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তা এখনই বিলীন হওয়ার পথে। এই সিন্ডিকেটের হাতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের পুরো নিয়ন্ত্রণ গেলে তারা সরকারের সেবাধর্মী এই প্রতিষ্ঠানটিকে গ্রাহক হয়রানির আখড়ায় পরিণত করবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বদেশ খবরকে বলেন, রাশিদুল ইসলাম যে কত বড় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন, তা সরকারপ্রধানের অগোচরেই থেকে গেছে অথবা সরকারপ্রধানকে ভুল বুঝিয়েই রাশিদুল ইসলামকে সরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিসিএস (প্রশাসন) সার্ভিসে যোগদান করে রাশিদুল ইসলাম রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে করতে সরকারের অতিরিক্ত সচিব হয়েছেন। দীর্ঘ চাকরিজীবনে তার বিরুদ্ধে কোনো দিনই দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ওঠেনি। অসদুপায় অবলম্বনের কারণে তিনি কোনো সরকারের সময়েই চাকরিতে ওএসডি হননি। তার দুর্নীতিবিরোধী মনোভাবের কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি অন্তত ৩ বছর নিয়মিত দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সক্ষম হতেন। অথচ মাত্র ১৭ মাসের মাথায় তাঁকে সরিয়ে দেয়া হলো। তাই প্রতিষ্ঠানটিকে আগের মতো প্রকৃত সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাইলে রাশিদুল ইসলামের মতো যোগ্য ব্যক্তির কোনো বিকল্প নেই।
অবশ্য জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মো. রাশিদুল ইসলামের সাথে কথা বলতে চাইলে এ বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। আর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সংস্থার সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান স্বদেশ খবরকে বলেন, তিনি কেবলমাত্র কয়েক দিনের জন্য রুটিন দায়িত্ব পালন করেছেন। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানের নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাজে যোগদান করেছেন। নতুন চেয়ারম্যানই প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।