প্রতিবেদন

পহেলা ফালগুনে ভালোবাসা দিবস এবার নতুন মাত্রায় উদযাপিত

সাবিনা ইয়াছমিন
ভালোবাসা দিবস এবং বাঙালির বসন্তবরণ- দুটোই এবার একই দিনে উদযাপিত হলো। দেশে প্রথমবারের মতো ঘটছে এমন ঘটনা। শুধু এবার নয়, বাংলা বর্ষপঞ্জির হিসাব বদলে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এ নিয়মেই দিবস দুটি উদযাপিত হবে।
১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসেই এবার এলো পহেলা ফালগুন। ফলে বসন্তের সঙ্গে আরও বেশি জুড়ে যায় ভালোবাসা।
এতকাল পহেলা ফালগুনের দিনটি ছিল বাসন্তী রঙের। হলুদে ছেয়ে থাকত সব। আর ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবসের রঙ বরাবরই লাল। কিন্তু এবার ভালোবাসা দিবস এবং বাঙালির বসন্তবরণ একই দিনে হওয়ায় বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা তরুণীদের হাতে দেখা গেছে লাল গোলাপ। হলুদ পাঞ্জাবি পরা তরুণরাও হাতে রেখেছে লাল গোলাপ।
বসন্তবরণ বাঙালির জীবনে বাসন্তী রঙ ছড়িয়ে হাজির হয় পহেলা ফালগুনে। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ৬টি ঋতুর অধিকারী বাংলাদেশ। বসন্তকে এগুলোর মধ্যে সেরা জ্ঞান করা হয়। বলা হয়, ঋতুরাজ।
শীতে প্রকৃতি বেশ রু থাকে। পাতা হারাতে থাকে বৃ। ধূলো উড়তে থাকে বাতাসে। এ অবস্থায় নতুন প্রাণের সঞ্চার করতেই যেন বসন্ত আসে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি বসন্তের আগমনী বার্তার।
ফালগুনের প্রথম দিন ঋতুরাজকে বরণ করে নেয় বাঙালি। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১ ফালগুন উদযাপিত হয় বসন্ত উৎসব। এদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসন্ত উৎসবের আয়োজন ছিল প্রাণবন্ত। রাজধানী ঢাকাজুড়েই চলেছে উৎসব অনুষ্ঠান। এ সময় প্রকৃতিতে যেমন পরিবর্তন আসে, তেমনি বদলে যেতে থাকে মানুষের মন। ভেতরে এক ধরনের শিহরণ জাগে। পুলক অনুভূত হয়।
পহেলা ফালগুনে বাঙালি নারী বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে ঘর থেকে বের হয়। কাঁচা রঙিন ফুল দিয়ে খোঁপা সাজায়। গলায় বা হাতে জড়িয়ে নেয় গাঁদার মালা। অনেকে আবার কাঁচা ফুলে তৈরি ক্রাউন মাথায় দিয়ে রাজকুমারীর মতো হেঁটে বেড়ায়। পুরুষরাও এদিন একই রঙের পাঞ্জাবি পরে। অবশ্য শুধু নারী-পুরুষ নয়, সব বয়সী মানুষ বসন্তের দিনে কাঁচা হলুদ রঙটিকে বেছে নেয়। শহর ঢাকায় এদিন আর কোন রঙ, বলা চলে, দেখাই যায় না। শহর ঢাকা বাসন্তী রঙে ঢাকা পড়ে। পহেলা ফালগুনের এটি চিরচেনা ছবি, যার ব্যতিক্রম হয়নি এবারও। অন্যদিকে ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবস এসেছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে। পাশ্চাত্যের হলেও ভালোবাসা তো ভালোবাসাই, একে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বলে ভাগ করা চলে না। তাই বাঙালিও ভীষণ লুফে নিয়েছে একে। এখন ঘটা করেই উদযাপিত হয় ভ্যালেন্টাইনস ডে।
এ দিবসের শুরুটা হয়েছিল প্রাচীন রোমে।
কিভাবে শুরু হলো ভ্যালেন্টাইনস ডে Ñ তার আছে একাধিক গল্প। অপোকৃত বেশি শোনা গল্পটি এরকম Ñ সম্রাট কদিয়াসের শাসনামলে রোম কয়েকটি রক্তয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু তার সেনাবাহিনীতে সৈন্য কম ভর্তি হওয়ায় কদিয়াস উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। তিনি ধারণা করতেন, পরিবার ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কারণেই যুদ্ধে যেতে রাজি হতো না পুরুষরা। ফলে কদিয়াস রোমে বিয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সে সময় রোমে ধর্মযাজকের দায়িত্ব পালন করছিলেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। তিনি এবং সেন্ট ম্যারিয়াস খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী তরুণ-তরুণীদের গোপনে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতেন। বিবাহিত যুগলদের সহযোগিতা করতেন। এ অপরাধে রোমের ম্যাজিস্ট্রেট তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিপে করেন। বন্দি থাকা অবস্থায় অনেক তরুণ তাকে দেখতে যেত। জানালা দিয়ে তার উদ্দেশে চিরকুট ও ফুল ছুড়ে দিত। হাত নেড়ে জানান দিত, তারা যুদ্ধ নয়, ভালোবাসায় বিশ্বাস রাখে। এদের মধ্যে একজন আবার ছিল কারারীর মেয়ে। তার বাবা তাকে ভ্যালেন্টাইনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিতেন। একপর্যায়ে তারা একে অপরের বন্ধু হয়ে যান। ভ্যালেন্টাইন মেয়েটির উদ্দেশে একটি চিরকুট লিখে রেখে যান। এতে লেখা ছিল ‘লাভ ফ্রম ইয়োর ভ্যালেন্টাইন’। বিচারকের নির্দেশ অনুসারে ভ্যালেনটাইনকে হত্যা করা হয়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের এই আত্মত্যাগের দিনটি ছিল ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি।
কালের ধারাবাহিকতায় ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এদিন সবাই লাল রঙে সেজে বাসা থেকে বের হন। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা লাল শাড়ি ও একই রঙের পাঞ্জাবি পরিধান করেন। বাংলাদেশের প্রেমিক-প্রেমিকারাও দিনটির জন্য গোপনে অপো করে থাকেন। ভালোবাসা দিবসে পরস্পরের হাত ধরে অজানায় হারিয়ে যেতে চান। একে অন্যকে গ্রিটিংস কার্ড ফুল চকোলেটসহ নানা উপহার দেন। এবারও তা-ই হয়েছে। অজানায় হারিয়ে গেছেন ভালোবাসা বিনিময় করে মাতাল করা বসন্তকে সঙ্গে নিয়ে।