খেলা

ফুটবলকে জাগিয়ে তুলতে করণীয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে সেরা সাফল্য পাওয়া গেছে। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতেছে বাংলাদেশ। ক্রিকেটে সাফল্য ধরা দিলেও ফুটবলে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
ধারাবাহিক ব্যর্থতার মাঝে ২০১৯ সালে দেশের ফুটবলে জেগে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। পুরো বছরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্রশংসনীয় পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা। কিন্তু ডিসেম্বরে এসএ গেমস থেকে আবারও সঙ্গী হয়েছে ব্যর্থতা।
পিছিয়ে যাওয়ার প্রমাণ আরেকবার মিলেছে জানুয়ারিতে হওয়া বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ ফুটবলে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলে আয়োজিত বিশেষ এই আসরে নির্লজ্জ ব্যর্থতার স্বার রেখেছেন লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে কোনোরকমে সেমিফাইনালের টিকিট পেলেও ফাইনালে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। অপোকৃত দুর্বল দেশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ আয়োজন হলেও সফলতার দেখা পায়নি কোচ জেমি ডে’র দল। সঙ্গত কারণে ফুটবলের দীনদশা নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেন অনেকে।
ক্রীড়ামোদিরা বলছেন, এই ব্যর্থতা বাফুফের। ফুটবলকে এগিয়ে নেয়ার মতো সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারেনি বাফুফের কর্তাব্যক্তিরা। ফুটবলকে বাঁচাতে হলে নিবেদিপ্রাণ সংগঠক প্রয়োজন। অথচ সারাদেশে সংগঠন তৈরিতে নিদারুণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন।
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে দর্শকখরাও ছিল দৃষ্টিকটু। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলে আসর হলেও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) তৎপরতা তেমন ছিল না। বাফুফের কর্তারা মানসম্পন্ন আয়োজনের চেয়ে তোষামোদীতেই ছিলেন ব্যস্ত। মাঠে দর্শক আনতে তেমন প্রচার-প্রচারণা ল্য করা যায়নি। বাফুফের কর্তারা ফাইনাল ম্যাচে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আনতে পেরেই যেন খুশি। অথচ আসল কাজে তারা শতভাগ ব্যর্থ হয়েছেন বলে মনে করেন ক্রীড়ামোদীরা।
টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ব্যর্থ হওয়া ও দর্শখরার জন্য বাফুফের অদূরদর্শিতাকেই দুষছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা।
প্রকৃতিগতভাবে স্টার না জন্মালে সাফল্য পাওয়া কঠিন। বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশের ফুটবলে প্রকৃতিপ্রদত্ত ফুটবল তারকা এখন তেমন চোখে পড়ে না। যে কারণে গোলের খেলা ফুটবলে ভালো মানের স্ট্রাইকারের অভাব প্রকট। কিন্তু স্ট্রাইকার খুঁজে পেতে বাফুফের তেমন তৎপরতাও নেই। বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে গোল না করতে পারার ব্যর্থতার কারণেই সেমি থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।
ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল জায়গায় কাজ না করলে এমন হা-পিত্যেস বার বার করতে হবে। কেননা দেশে খেলোয়াড় তৈরি করার জন্য ফুটবল ফেডারেশনের নিজস্ব কোনো একাডেমি নেই, যেখানে বছরব্যাপী অনুশীলন করে তৈরি হবে গোল করার মতো খেলোয়াড়। আবার কাবের জার্সিতেও ঘরোয়া লীগে স্ট্রাইকারদের খেলার সুযোগ কম। প্রতি মৌসুমেই লীগে বিদেশি ফরোয়ার্ডদের দাপট দেখা যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ ফুটবলের চেয়ে শেখ কামাল আন্তর্জাতিক কাব কাপ ছিল সফল। শেখ কামাল কাপের প্রতিটি দলই ছিল মানসম্পন্ন। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে নামকাওয়াস্তে দল আনা হয়। কয়েকটি দলের নামই ঠিকমতো জানতেন না ফুটবলপ্রেমীরা। এ কারণে অনেকেই বলেছেন, এসব দল না এনে দণি এশিয়ার পরিচিত দেশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ আয়োজন করলেও দর্শক উপস্থিতি বেশি হতো।
ফুটবলপ্রেমীরা অভিযোগ করছেন, বঙ্গবন্ধুর নাম যত্রতত্র ব্যবহার করছে বাফুফে। মানহীন দল এনে মর্যাদার বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ আয়োজন তারই প্রমাণ। ১৯৯৬ সালে ফিফা র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের ফুটবলের অবস্থান ছিল ১১০ নম্বরে। ২০১৮ সালে তা নেমে যায় ১৯৭তমে। ২০০৮ সালে ফিফা র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৪, সেখান থেকে ২০১৯ এ ১৮৭।
খেলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৮-১৯ পর্যন্ত ৮৮টি ম্যাচ খেলেছে জাতীয় ফুটবল দল। এর মধ্যে মাত্র ২৪ জয়, ৪৪টি হার এবং ২০ ম্যাচ ড্র করেছে জাতীয় ফুটবল দল। সঙ্গত কারণেই বলা যায়, সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে জাতীয় ফুটবল দল ব্যবস্থাপনা কমিটি। জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা কমিটি হলেও ১২ বছরে ১২-এর অধিক দেশি-বিদেশি কোচ দেখেছে ফুটবল। জাতীয় দলের কোচরা বেতন-বকেয়া না পেয়ে ফিফা-এএফসির কাছে নালিশ করেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ফুটবলের কোনো কার্যক্রম হয়নি। ১২ বছরে মাত্র ৩ বার জাতীয় স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া অবহেলিত জেলা ফুটবল লীগ। বাফুফে জেলা ফুটবল লিগ আয়োজন করেছে ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৮ সালে। শুধু তাই নয়, প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেরে বাংলা কাপ, সোহরাওয়ার্দী কাপ আয়োজন করতে পারেনি বাফুফে।
জাতীয় দলের ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ ঢাকাকেন্দ্রিক কাব লীগ। ১২ বছরে মাত্র ৪ বার করে সিনিয়র ডিভিশন, দ্বিতীয় বিভাগ এবং তৃতীয় বিভাগ ফুটবল লীগ আয়োজন করতে পেরেছে। ১২ বছরে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লীগ ৭ বার। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ মোট ১০ বার আয়োজন করেছে। লীগ-টুর্নামেন্টগুলো অনিয়মিত হওয়ায় প্রায় ১০ হাজারেরও অধিক ফুটবলার খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
রেফারিদের মান উন্নয়ন ও ভালো মানের রেফারি গড়ে তোলার েেত্র তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি বাফুফে। ঘরোয়া লীগ-টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলোতে প্রায়ই রেফারিদের পপাতমূলক আচরণ করতে দেখা যায়।
এতসব অনিয়মের পরও আবার দেশের ফুটবল জেগে উঠবে বলে আশাবাদী ফুটবলপ্রেমীরা। আসন্ন বাফুফে নির্বাচনে যারা বিজয়ী হবেন তারা ফুটবলের উন্নয়নে কাজ করবেন Ñ এমনটাই আশা করছেন ফুটবলপ্রেমী মানুষ। তারা আর ব্যর্থতা দেখতে চান না। এদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় খেলা ফুটবলকে এগিয়ে নিতে পারবেন Ñ এমন নেতৃত্বই আশা করছেন দেশের ক্রীড়ামোদিরা।