অর্থনীতি

বিশেষ তহবিল: পুঁজিবাজারে আশার আলো

নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শেয়ারবাজার গড়তে সরকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর অন্যতম ছিল আইসিবি তহবিল গঠন। এছাড়া শেয়ারবাজারের লেনদেন, কারচুপি ও অনিয়ম শনাক্তকরণে যথাযথ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, ুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করা হয়েছে। পুঁজিবাজার সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ল্েয স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অথরিটি ইনভেস্টমেন্ট রুলস-২০১৫এর মাধ্যমে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অব প্রাইভেট ইক্যুইটিতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকা-ে স্থিতিশীলতা আনয়নের পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করা হয়েছে।
এসব ব্যবস্থা গ্রহণের পরও পুঁজিবাজারের গতি সবসময় স্থিতিশীল ছিল না। কোনো সময় পুঁজিবাজার গতি পেয়েছে, কোনো সময় সূচকের ধারাবাহিক পতন ঘটেছে। পুঁজিবাজারের গতি যাতে স্থিতিশীল হয় সেজন্য এই বাজারে তারল্য সরবরাহ বাড়াতে ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিটি ব্যাংক ২০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে। সব ব্যাংক বিনিয়োগ করলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা বাড়বে। বিশেষ ছাড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে এই টাকা নিতে পারবে ব্যাংকগুলো। এই অর্থ বিনিয়োগের েেত্র প্রচলিত নিয়মনীতি পরিপালন থেকেও ব্যাংকগুলোকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এই টাকা পুঁজিবাজারের মোট বিনিয়োগ হিসেবে দেখাতে হবে না এবং ঋণ-আমানত অনুপাতে (এডিআর) যোগ করতে হবে না। এই তহবিলের টাকা শুধু পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য মাত্র ৭ শতাংশ সুদে নিজস্ব সাবসিডিয়ারি, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে ঋণ দিতে হবে।
১০ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত দুটি সার্কুলার জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই সার্কুলার জারির পরপরই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা উল্লাস প্রকাশ করেছেন। তারা পুঁজিবাজার নিয়ে আশার আলো দেখছেন।
বিশেষ তহবিল গঠন ও বিনিয়োগ নীতিমালা সংক্রান্ত সার্কুলারে বলা হয়েছে, দেশের পুঁজিবাজার ও মুদ্রাবাজারের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনকারী হিসেবে তফসিলি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। সে হিসেবে পুঁজিবাজারের অস্বাভাবিক উত্থান-পতন ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে। দেশের পুঁজিবাজারে বিরাজমান অবস্থার প্রোপটে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব পর্যালোচনায় পরিস্থিতি উন্নয়নে অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বাজার মধ্যস্থতাকারীদের তারল্য সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। সার্বিক বিষয় বিবেচনায় পুঁজিবাজারে ক্রমাগত তারল্য প্রবাহ বজায় রাখার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অধীনে তফসিলি ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংকগুলো ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, ১৯৯৩-এর অধীনে গঠিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজিবাজার সংক্রান্ত সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান (মার্চেন্ট ব্যাংক ও ডিলার লাইসেন্সধারী ব্রোকারেজ হাউস) এবং অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসকে (ডিলার) শুধু পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় তহবিল সরবরাহের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
সার্কুলারে প্রতিটি ব্যাংককে আরও ২০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করে বিনিয়োগের জন্য বলা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের ৫৯টি ব্যাংক অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বিনিয়োগের সুযোগ পাবে।
ব্যাংকগুলোকে তিন ভাগে ওই ২০০ কোটি টাকা সংগ্রহের সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিজস্ব তহবিল, বিল-বন্ড ব্যবহার করে রেপোর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ নেয়া এবং প্রথমে নিজে বিনিয়োগ করে পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে সমপরিমাণ অর্থ নেয়া (পুনঃঅর্থায়ন)। ৫ শতাংশ সুদে ৯০ দিন মেয়াদে এই রেপো নেয়া যাবে। তবে ব্যাংক আবেদন করে এই মেয়াদ ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাড়াতে পারবে।
বিশেষ তহবিলের অর্থের অন্তত ৪০ শতাংশ ব্যাংক নিজে বিনিয়োগ করবে। সাবসিডিয়ারি মাধ্যমে ২০ শতাংশ, অন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি (মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউস) ৩০ শতাংশ এবং অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে তহবিলের ১০ শতাংশ ঋণ দিতে হবে। পৃথক বিও অ্যাকাউন্ট খুলে ব্যাংকের নিজস্ব বিনিয়োগ করতে হবে। সুদহার হবে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ।
অন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বা অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংকের মোট মূলধনের ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেয়া যাবে। তবে এই তহবিলের অর্থ দিয়ে নিজের ব্যাংকের শেয়ার কেনা যাবে না। অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২ শতাংশের বেশি শেয়ার কেনা যাবে না। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মোট শেয়ারের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কেনা যাবে।
রুগ্ণ ও ভুইফোঁড় প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনা ঠেকাতে সার্কুলারে কিছু বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। যেসব কোম্পানির ৭০ শতাংশ ফোটিং শেয়ার আছে এবং অন্তত ৩ বছর ১০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে তাদের শেয়ার কেনা যাবে। পর পর ৩ বছর ৫ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে এমন মেয়াদি ও অমেয়াদি ফান্ডে বিনিয়োগ করা যাবে।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বলছেন, তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ফান্ড নিয়ে বিনিয়োগ করলে পুঁজিবাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অন্য অনেক কারণের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর তারল্যসংকটের কারণে পুঁজিবাজারে অস্থিতিশীল পরিবেশ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছিল। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সংকট নিরসনের ব্যবস্থা নেয়ায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারে বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে; যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মাঝেও।