আন্তর্জাতিক

যে কারণে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ছেন আইএস বধূ শামীমা

মাহফুজুল হাসান
যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ফিরে পেতে আইনি লড়াইয়ে বড় ধাক্কা খেলেন দেশটি ছেড়ে পালিয়ে সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দেয়ার পর রাষ্ট্রহীন দশায় পড়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক শামীমা। নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার যুক্তরাজ্যের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রথম ধাপের আপিলে হেরে গেছেন এই তরুণী। অপরদিকে বাংলাদেশও তাকে নাগরিকত্ব দিতে আগ্রহ দেখায়নি। ফলে আইএস বধূ শামীমাকে এখন রাষ্ট্রহীন নাগরিকের তালিকায় নাম লেখাতে হচ্ছে।
লন্ডনের বেথনাল গ্রিন একাডেমিতে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ায় পাড়ি জমান শামীমা। তখন তার বয়স ছিল ১৫। সেখানে এক আইএস যোদ্ধাকে বিয়ে করেন তিনি। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে সিরিয়ার একটি শরণার্থীশিবিরে গর্ভবতী অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়। বর্তমানে তার বয়স ২১।
যুক্তরাজ্যের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ শামীমার নাগরিকত্ব বাতিল করেন। ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদন করে শামীমার আইনজীবী তাকে দেশে ফিরতে দেয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন।
সেই আপিলের শুনানি শেষে ৭ ফেব্রুয়ারি রায় দেয় যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মামলার বিচারকাজ হয় এমন একটি আংশিক-গোপন আদালতের এক ট্রাইব্যুনাল। তাতে বলা হয়, যেহেতু শামীমা রাষ্ট্রহীন অবস্থায় নেই তাই তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া যাবে। বিশেষ ‘ইমিগ্র্যান্ট অ্যাপিলস কমিশন’ মন্তব্য করেছে, শামীমা বাংলাদেশে নাগরিকত্ব চাইতে পারেন।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো নাগরিক যদি পুরোপুরি রাষ্ট্রহীন হয়ে থাকে, তাহলে তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া অবৈধ। তবে কমিশন বলেছে, ২০ বছর বয়সী শামীমা বংশানুক্রমিকভাবে বাংলাদেশের নাগরিক এবং তিনি রাষ্ট্রহীন নন।
শামীমা তার মায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের আবেদনও করার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, শামীমা বাংলাদেশের নাগরিক নন, তাই তাকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
বর্তমানে উত্তর সিরিয়ার ‘ক্যাম্প রোজ’ নামের একটি শরণার্থীশিবিরে রয়েছেন শামীমা। সেখান থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরতে চাইছেন।
ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা বিচারক ডোরন ব্লাম বলেন, ‘নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ার অনেক বছর আগেই শামীমা স্বেচ্ছায় যুক্তরাজ্য ছেড়ে গেছেন। সুতরাং তিনি এখন আর যুক্তরাজ্যের নাগরিক নন’।
২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন ছেড়ে স্কুলের দুই বন্ধুর সঙ্গে সিরিয়া পাড়ি জমান শামীমা। কয়েক দিনের মধ্যেই তুরস্কের সীমান্ত পার করে রাকা’র আইএস সদর দপ্তরে পৌঁছান তিনি। সেখানে তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে আইএসএ যোগ দেয়া এক ডাচ নাগরিককে বিয়ে করেন। এই দম্পতির ৩টি সন্তান ছিল, যাদের সবাই মারা গেছে।
২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের জুনের মধ্যবর্তী সময়কালে বিশ্বের ৮০টি দেশ থেকে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকায় চলে গিয়েছিল। এই তথ্য লন্ডন কিংস কলেজের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব র‌্যাডিক্যালাইজেশনের।
ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৯০০-র বেশি ব্রিটিশ নাগরিক ইরাক-সিরিয়ায় আইএস-এ যোগ দিয়েছিলেন, তবে তাদের মধ্যে কমবেশি ৪০০ জন যুক্তরাজ্যে ফেরত এসেছেন।
ব্রিটেনে ফিরে আসা বেশিরভাগ যোদ্ধার বয়স ছিল ২০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে। ফলে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ ছিল। কিন্তু শামীমার বিষয়টি অনেককে আত্ম-অনুসন্ধানের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর সঙ্গে আইনের বিষয়টিও জড়িত। কারণ হলো তার দাবি তিনি কোনো অপরাধ করেননি।
‘শামীমা কি ঘটনার শিকার?’Ñ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে এক নিবন্ধে এই প্রশ্ন তুলেছেন হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ক্যামিলা ক্যাভেন্ডিশ।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল রিচার্ড ড্যানাট এ বিষয়ে বলেন, অন্যদের চরমপন্থি হওয়া ঠেকাতে যুক্তরাজ্যের উচিত তাকে ‘অল্পস্বল্প অনুকম্পা’ দেখানো। সে যদি যুক্তরাজ্যে ফিরে আসতে না পারে, তাহলে সে কোথায় যাবে? জীবনের বাকি দিনগুলো তো সে আর একটি শরণার্থী শিবিরে কাটাতে পারে না!
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা শামীমার বিষয়টিকে সহানুভূতির সঙ্গে দেখার জন্য বলেছেন। তাদের মতে, শামীমা ছোটবেলায় হয়ত ঠিকমতো বেড়ে ওঠেননি। ৩টি স্কুলবালিকা যখন বাড়ি থেকে পালিয়েছিল, তখন তাদেরকে ‘ঝুঁকি নয় বরং অনেকটা পথহারা’ বলেই মনে করতে হবে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, প্রথম দিকে যারা আইএস থেকে ফিরে এসেছেন, তাদের একটা বড় অংশকেই এখন আর জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় যারা ফিরে আসতে চাচ্ছে তারা ‘ব্যতিক্রম’। যারা যুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যন্ত ছিলেন, তারা অনেক শক্ত। তারা ভালোভাবে পিছনের চিহ্ন মুছে ফেলেছেন। শামীমা তাদেরই একজন।
যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থার মতে, আইএস-এর হয়ে যুদ্ধ করেছেন কিংবা সমর্থন করেছেন, এমন ব্রিটিশ নাগরিকদের নিয়ে তারা দারুণ উদ্বিগ্ন। কারণ, যে একবার ওই পথে গেছে, সে এমন সব কৌশল রপ্ত করে আর যোগাযোগ গড়ে তোলে, যা তাকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক ব্যক্তিতে রূপান্তরিত করে। তাই শামীমা এখন যুক্তরাজ্যের দৃষ্টিতে বিপজ্জনক ব্যক্তি। শামীমার বাবা জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হলেও তিনি ব্রিটিশ নাগরিক। শামীমার জন্ম ব্রিটেনে, সে কখনোই বাংলাদেশে আসেনি। সে বাংলা ভাষাও জানে না। সে হিসেবে শামীমা বাংলাদেশেরও নাগরিক নয়। ফলে আইএস বধূ শামীমা এখন রাষ্ট্রহীন নাগরিক!