প্রতিবেদন

হাইকোর্টের রায়: সারাদেশেই জুয়া খেলা নিষিদ্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুয়ার নেশা যখন জুয়াড়িদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দৈনন্দিন জীবনে নিরানন্দের কারণ হয়ে ওঠে তখন তা গুরুতর সমস্যায় পরিণত হয়। জুয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সমস্যা একজন জুয়াড়ির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি সামাজিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে থাকে।
যদিও বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে জুয়া খেলা বহু পুরনো একপ্রকার অবসর-বিনোদনের মাধ্যম। তবে জুয়া খেলতে খেলতে অনেক মানুষই জুয়ার নেশায় নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং এই আচরণের জন্য তাদের গোটা জীবনটা সমস্যায় ভরে যায়। জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে তারা শুধু জুয়া খেলার সুযোগ খোঁজে এবং জুয়ার মধ্যেই নিজেদের জীবনকে ডুবিয়ে রাখে। অনেকে টাকাপয়সা খুইয়ে এবং নানা বিপত্তি সত্ত্বেও জুয়া খেলা ছাড়তে পারে না। বহুবার জুয়ার নেশা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেও অনেকে শেষ পর্যন্ত জুয়া খেলা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে না। এটা অনেকটা ড্রাগের আসক্তির মতো। কারণ যারা মাদকাসক্ত হয় তারা সবসময়ে মাদক ব্যবহারের ছুতো খোঁজে। জুয়ার নেশাকে এক সময় মানুষের হঠকারি মনোভাব বা আচরণ বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখন একে মাদকাসক্তির মতোই একপ্রকার আসক্তি হিসেবে দেখা হয়। মানসিক অব্যবস্থার বিভিন্ন ভাগ বা পর্যায়, যেমন- ডিএসএম-৫ (ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অফ মেন্টাল ডিসঅর্ডার) এবং আইসিডি-১০ (ইন্টারন্যাশনাল কাসিফিকেশন অফ ডিজিজ) অনুযায়ী জুয়া খেলার তাড়নাকে একপ্রকার আসক্তি বলেই বিবেচনা করা হয়।
জুয়ার নেশায় মানুষ যাতে মোহাবিষ্ট না হয়ে পড়ে, সে জন্য বাংলাদেশের আদালত থেকে ব্যবস্থা নেয়ার মতো নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সারাদেশে টাকা বা অন্য কিছুর বিনিময়ে তাস, ডাইস, হাউজি খেলাসহ সব ধরনের জুয়া খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। রায়ে সব কাবকে ‘পাবলিক প্লেস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কাবসহ জনসমাগম হয় এমন স্থানে জুয়ার উপকরণ পাওয়া গেলে তা জব্দ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীকে। পাশাপাশি এ ধরনের খেলার অনুমতিদাতা, আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি মো. মাহমুদ হাসান তালুকদারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ১০ ফেব্রুয়ারি এই রায় দেন। ঢাকা কাবসহ দেশের বিভিন্ন শহরের ১৩টি অভিজাত কাবে জুয়া খেলা বন্ধ করার নির্দেশনা চেয়ে করা এক রিট আবেদনের ওপর শুনানি শেষে এই রায় দেয়া হয়েছে।
আদালত বলেছে, যেসব খেলার ফল দতার বদলে ‘চান্স’ বা ভাগ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়, সেগুলোই জুয়া খেলা। হাউজি, ডাইস, থ্রি কার্ড, ফাশ, ওয়ান টেনসহ এ জাতীয় অন্যান্য খেলা দতার পরিবর্তে ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। আইনে এসব খেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব খেলার আয়োজন করা অপরাধ। যারা এ ধরনের কর্মকা-ে জড়িত তারা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী।
আদালত সরকারের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছে, বর্তমান সরকার ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করছে। আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়, এ অভিযানের মুখ্য উদ্দেশ্যে হচ্ছে ক্যাসিনো ও জুয়া খেলাকে নিরুৎসাহ করা।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, ১৮৬৭ সালের জুয়া আইনে ঢাকা মহানগরীর বাইরে জুয়া খেলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এ আইনে সাজার পরিমাণ খুবই নগণ্য। মাত্র ২০০ টাকা জরিমানা এবং ৩ মাস কারাদ-। এই আইন সংশোধন করে সাজার পরিমাণ বাড়ানো উচিত।
আদালত আরো বলেছে, ঢাকা মহানগরীর ভেতরে জুয়া খেললে জুয়া আইনে ব্যবস্থা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা মনে করি, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জুয়া আইন বৈষম্যমূলক। কারণ সংবিধানেই বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। অপরাধ অপরাধই। এখানে ধনী ও গরিবের বৈষম্যের সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীকে বিষয়টি মনে রাখতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সামিউল হক ও অ্যাডভোকেট রোকন উদ্দিন মো. ফারুকের করা এক রিট আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর এক আদেশে টাকা বা অন্য কিছুর বিনিময়ে ১৩টি কাবে তাস, ডাইস ও হাউজি খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। একই সঙ্গে টাকা বা অন্য কিছুর বিনিময়ে জুয়া-জাতীয় অবৈধ ইনডোর গেমস যেমন তাস, ডাইস ও হাউজি খেলা এবং আয়োজকদের বিরুদ্ধে রুল জারি করেছিল। পরে কাবগুলোর আবেদনের পরিপ্রেেিত আপিল বিভাগ ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে। হাইকোর্টের জারি করা রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছিল। এ অবস্থায় রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি সম্পন্ন হয় গত ২৩ জানুয়ারি। এরপর ২৮ জানুয়ারি রায়ের দিন নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ওই দিন রায় হয়নি। অবশেষে ১০ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করে আদালত।
ব্যারিস্টার রেদওয়ান আহমেদ রানজীব বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিন পুলিশ অধ্যাদেশ-১৯৭৬, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ-১৯৭৮ এবং পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট-১৮৬৭ অনুযায়ী জুয়া খেলা দ-নীয় অপরাধ। একই সঙ্গে সংবিধানের ১৮ (২) অনুচ্ছেদে সরকারকে গণিকাবৃত্তি (পতিতাবৃত্তি) ও জুয়া খেলা বন্ধ করার প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও যথাযথ কর্তৃপ কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় রিট আবেদন করা হয়।