প্রতিবেদন

উগ্রবাদের ঝুঁকি সূচকে ৬ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
উগ্রবাদের ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশের ৬ ধাপ অগ্রগতি হয়েছে। ২০১৮ সালের অবস্থান থেকে ৫ ধাপ এগিয়ে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ৩১তম। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অনেক দেশই বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে। সর্বস্তরের জনগণের সহায়তা, গণমাধ্যমের ভূমিকা, প্রশাসনের দক্ষতাসহ সব কিছু মিলিয়ে দেশে উগ্রবাদের ঝুঁকি ধীরে ধীরে কমে আসছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিসার্ফ) আয়োজিত ‘উগ্রবাদ রোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম এই তথ্য জানান।
২২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এই সেমিনারে বক্তারা জানান, গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সে ঝুঁকির দিক থেকে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। সূচকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২১তম। ওই সময় পাকিস্তান ও ভারত ছিল তালিকার ১০ নম্বরের মধ্যে। ২০১৮ সালে ৪ ধাপ অগ্রগতি হয়ে বাংলাদেশ ২৫তম স্থানে অবস্থান করে। আর ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ আরো ৬ ধাপ এগিয়ে ৩১তম হয়।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ সূচক নিয়ে প্রতি বছর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আইইপি মানুষের ভালো থাকা ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ও অর্জনযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি এবার ২৩টি গুণগত ও পরিমাণগত নির্দেশকের ভিত্তিতে ১৬৩টি দেশের পরিস্থিতি নিয়ে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ সূচক ২০১৯ প্রকাশ করে। এতে বাংলাদেশের স্কোর ৫ দশমিক ২০৮। সে হিসাবে এ দেশে সন্ত্রাসবাদের প্রভাব মাঝারি মাত্রার।
সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণরাই উগ্রবাদে বেশি জড়িয়েছে। এ কারণে পুলিশ সারাদেশে পাড়া-মহল্লার সব জায়গায় পোস্টার ও বিলবোর্ড লাগিয়েছে। পরিবার, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছে পুলিশ। কারণ উগ্রবাদে জড়ানোর বিষয়টি প্রথম তাদের কাছেই ধরা পড়ে।
ধর্মীয় বক্তাদের নিয়ে কাজ করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্মীয় বক্তারা ওয়াজ মাহফিলে নারী ও অন্যান্য ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেন। সেটি যেন তারা করতে না পারেন, সে জন্য আমরা কাজ করছি।
মনিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে সহিংস উগ্রবাদ দমনে সুনির্দিষ্ট জাতীয় কোনো স্ট্রাটেজি নেই। এটা করতে সময় লাগে। তবে আমরা কাউন্টার ভায়োলেন্স এক্সট্রিমিজম (সিভিই) করতে যাচ্ছি। দু’ভাবে আমরা কাজটা করছি। প্রথমত জেনারেল অ্যাপ্রোচ এবং দ্বিতীয়ত ভালনারেবল অ্যাপ্রোচ। সেজন্য আমরা বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে কথা বলছি। এসব ভালনারেবল গ্রুপকে মোটিভেট করতে তরুণ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করছি। একই সঙ্গে আলেম-ওলামাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত আলোচনা করছি।
জিটিভি ও সারাবাংলা ডটনেটের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, কোথাও জঙ্গি আটক বা গ্রেপ্তার হলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে জেহাদি বইসহ যোদ্ধা আটক হয়েছে। কিন্তু এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করলে জঙ্গিবাদকে এক ধরনের উদ্বুদ্ধ করা হয়। সবাই রেসপনসিবল জার্নালিজম করতে বলেন, কিন্তু গুড ডেমোক্রেসির কথা বলেন না। গুড ডেমোক্রেসি না হলে গুড জার্নালিজম হবে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উগ্রবাদের ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশের এই অগ্রগতি নিয়ে আত্মপ্রসাদে না ভোগার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, সহিংসতা-উগ্রবাদ বিশ^ব্যাপী সমস্যা। বাংলাদেশ এ সমস্যা থেকে মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। শুধু উগ্রবাদই নয়, সমাজে আমরা আরও নানা কারণে অসহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটতে দেখি। সেখানে উগ্রবাদ-সহিংসতা ও উন্মাদনার প্রকাশ পায়। সামান্য কারণে পাশবিক নির্যাতনের মতো ঘটনাও ঘটছে। আবার উল্লাস থেকে উন্মাদনার ঘটনাও সংঘটিত হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সমাজকে সহিংসতা ও উগ্রবাদ থেকে মুক্ত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সবার সহযোগিতার প্রয়োজন। একই সঙ্গে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সহিংসতা-উগ্রবাদ প্রতিরোধে শ্রেণিকক্ষ, সভা-সমাবেশ, তৃণমূল পর্যায়ে আলোচনা করতে হবে, যাতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক মনন তৈরি এবং সহিংসতা, উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যতটা দৃঢ় হবে ততই তরুণরা উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। সব ধরনের উগ্রবাদ মোকাবিলার পাশাপাশি একই সঙ্গে যেসব রাজনৈতিক, সামাজিক কারণে তরুণরা সহিংস উগ্রবাদের দিকে ধাবিত হয়, সেগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধান করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহিংসতা ও উগ্রবাদবিরোধী নৈতিক শিক্ষা প্রসার ঘটাতে হবে।