অর্থনীতি

খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণ সংকটে ডুবছে ব্যাংকিং খাত। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। সুদ মওকুফ, অবলোপন ও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো হয়েছে। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে গত ৯ বছরে অন্তত ২ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। অবলোপনের মাধ্যমে বাদ দেয়া হয়েছে আরও ৫৬ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই এখন খেলাপি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ১১ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। এই ঋণ নিয়ে গত ২০ বছরে কী ধরনের দুর্নীতি হয়েছে তার একত্রিত গবেষণা হয়নি। তবে গত ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ১০ বছরের দুর্নীতি প্রকাশ করে একটি সংস্থা।
সংস্থাটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে গত ১০ বছরে কয়েকটি বড় কেলেঙ্কারির মাধ্যমে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লুটে নেয়া হয়েছে। সোনালী, জনতা, বেসিক, এবি, ফারমার্স, প্রাইম, প্রিমিয়ার, এনসিসি, মার্কেন্টাইল, ঢাকা, যমুনা, এনআরবি কমার্শিয়াল, শাহজালাল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ অর্থ লুট হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, খেলাপি ঋণ, লোকসান ও মূলধন বেড়েছে। অনিয়মের ফলে মূলধন হারানো সরকারি ব্যাংকগুলোকে ১৫ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের রায়ে বলা হয়, গত ২৫ বছরে দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে। দেশের শিল্প খাত, বাণিজ্যিক খাত সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক বা বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো চাঞ্চল্যকর আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেনি। আর্থিক খাতে এ ধরনের অনিয়ম বহাল থাকলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্যে পৌঁছতে সরকার ঘোষিত কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হবে। এ কারণে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা তদন্তে একটি কমিটি করা দরকার, যে কমিটি হবে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে।
এসবের প্রেক্ষিতে খেলাপি ঋণ আদায়ে দেশে কঠোর আইন করছে সরকার। এ আইনে যেসব ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হবে, তা আদায়ের ভার দেয়া হবে সরকারের প্রস্তাবিত নতুন সংস্থা ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন’কে। সরকারের বিশেষায়িত এই আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্ভব সব ধরনের ক্ষমতা পাবে। প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজন মনে করলে ঋণখেলাপির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিতে কিংবা লিজ দিতে পারবে। ঋণখেলাপির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখল, পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন, ঋণ পুনর্গঠনও করতে পারবে।
খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর এই প্রথম কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানকে এত ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে ‘বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন আইন, ২০২০’ নামে একটি আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে।
এ ব্যাপারে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি আইন গঠন সংক্রান্ত কমিটি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলছে, যেকোনো দেশের অর্থনীতির জন্য খেলাপি ঋণ ভালো নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আইন খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। ব্যাংক যেসব খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারবে না, সেগুলো অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি আদায় করবে। এতে খেলাপি ঋণ অনেক কমে যাবে। এ জন্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশনকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে। আইনটি করতে মালয়েশিয়া, কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের আইন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ২০০২ সাল থেকে এই ৪ দেশ খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন দিয়ে সফল হয়েছে।
জানা গেছে, খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করবে। প্রতিটি ব্যাংক পৃথকভাবে করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করবে। চুক্তি অনুযায়ী, ব্যাংক যে খেলাপি ঋণগুলো আদায়ে ব্যর্থ, সেগুলো করপোরেশনের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করবে। তারপর করপোরেশন ওই ঋণ আদায়ে জোরদার তৎপরতা চালাবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী আদায়কৃত খেলাপি ঋণের অংশ পাবে করপোরেশন।
খসড়া আইনের ধারা ২৪-এ করপোরেশনের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ে ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণসহ কর্তৃত্ব নিয়ে নিতে পারবে করপোরেশন। ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির ব্যবসার সম্পূর্ণ বা আংশিক বিক্রি করতে বা লিজ দিতে পারবে। বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটি চাইলে ঋণগ্রহীতার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ কিংবা পুনর্গঠন করতে পারবে। কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হলে করপোরেশনের এক বা একাধিক এজেন্ট প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে কাজ করবেন। আর যদি কোনো ব্যক্তি ঋণখেলাপি হন, তাহলে এজেন্ট প্রশাসকের ক্ষমতা পাবেন। ঋণগ্রহীতার বকেয়া নিষ্পত্তি করার ক্ষমতাও দেয়া হচ্ছে করপোরেশনকে। এ ছাড়া জামানতের দখল, সুরক্ষা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লিজ বা বিক্রির ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা পাবে সরকারি এ প্রতিষ্ঠান।
ঋণগ্রহীতার ঋণের সম্পূর্ণ বা যেকোনো অংশ শেয়ারে রূপান্তর করতে পারবে করপোরেশন। মামলা দায়েরও করতে পারবে। শুধু দেশের নয়, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ঋণখেলাপি হলে সে ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মামলা করতে পারবে এ প্রতিষ্ঠানটি।