প্রতিবেদন

গরিব ও ধনীর গড় আয়ুতে প্রভেদ বাড়ছে: ইউএনডিপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশজুড়ে সুষম উন্নয়ন করা এবং আয়বৈষম্য কমানোর নানা সরকারি প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগের পরও দেশের গরিব মানুষ দিন দিন আরও গরিব হচ্ছে, দ্রুত সম্পদ বাড়ছে ধনীদের। দেশের সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ মানুষের সম্পদের পরিমাণ ৬ বছরের ব্যবধানে দুই-তৃতীয়াংশ কমেছে। এই সময়ে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ মানুষের সম্পদ বেড়েছে ২ শতাংশেরও বেশি।
ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ার এ চিত্রকে ‘প্রমাণিত’ হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভের (এইচআইইএস) চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে দরিদ্র ও সবচেয়ে ধনীদের সম্পদের ব্যবধান চূড়ান্ত পর্যায়ে গেছে।
বিশ্বজুড়ে ধনী-গরিবের বৈষম্য অনাদিকালের। বিত্তবানদের জীবনযাত্রা, খাদ্য-চিকিৎসাসহ সবকিছুই গরিবদের থেকে উন্নততর। কথায় আছে, আয় বুঝে ব্যয়। অর্থাৎ যেমন উপার্জন তেমন খরচ। আর এই কথার ভেতরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে গোটা বিশ্বে ধনী আর গরিবের বৈষম্য। বাংলাদেশেও এই বৈষম্য দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। এখানে একশ্রেণির মানুষ আরামে-আয়েশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, আর বিপরীত শ্রেণিটি দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করছে। এক শ্রেণির মানুষ টাকার পাহাড় গড়ে নিশ্চিত নিরাপদ জীবনযাপন করছে, অন্য শ্রেণিটি অর্থাভাবে কষ্টে দিনাতিপাত করছে। এসবের মূলে রয়েছে মূলত অর্থনৈতিক শ্রেণিবৈষম্য।
জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনডিপি) প্রকাশিত ২০১৯ সালের মানবউন্নয়ন রিপোর্টের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, উচ্চ আয়ের মানুষের তুলনায় জীবনযাত্রায় নিম্ন আয়ের মানুষ শুধু পিছিয়েই থাকে না, বরং উচ্চ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে গড় আয়ুর পার্থক্যও প্রায় ১৯ বছর।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে ইউএনডিপি প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, নিম্ন আয়ের পরিবারে জন্ম নেয়া একটি শিশুর গড় আয়ু হয় ৫৯ বছর। বিপরীতে উচ্চ আয়ের পরিবারে জন্ম নেয়া শিশুটির গড় আয়ু হয় ৭৮ বছর। বর্তমান সময় মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য সফলতা প্রত্যক্ষ হয়েছে।
ইউএনডিপি প্রতিবেদনে জানানো হয়, পিছিয়ে পড়া মানুষদের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে বিশ্বের প্রায় ৬০ কোটি মানুষ। আর বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক পরিমাপে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩০ কোটিতে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গোটা বিশ্বে অসংখ্য মানুষ ব্যাধি ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়ে ন্যূনতম জীবনধারণের ঊর্ধ্বে উঠে গেছে। প্রভূত এ উন্নতির সূচক নির্দেশ করে যে, এর মূলে আছে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস। তবে সবক্ষেত্রে যে অসমতা রয়েছে সেই অসমতাগুলো জীবন-মৃত্যু, সুযোগ-সুবিধা ও উন্নয়নের পথেও বাধা হয়ে আছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, নিম্ন মানবউন্নয়ন ও উচ্চ মানবউন্নয়ন সূচক দেশগুলোর মধ্যে গড় আয়ুর পার্থক্য প্রায় ১৯ বছর। ৭০ বছর বয়স মাত্রার নিম্ন ও উচ্চ মানবউন্নয়ন সূচক দেশগুলোর মধ্যে প্রত্যাশিত গড় আয়ুর ব্যবধান প্রায় ৫ বছর। এছাড়াও নিম্ন মানবউন্নয়ন দেশগুলোর মাত্র ৮২ শতাংশ মানুষ প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেছে, যেখানে উচ্চতম মানবউন্নয়ন দেশগুলোতে এই হার ৯১ শতাংশ। আর শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বস্তরেই এখনো অসমতা বিরাজমান।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর্মসংস্থান কমে যাওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে অনিয়মের কারণে গরিব মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ছে ধনীদের সম্পদ। তবে সরকারের পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, কোনো দেশ যখন দ্রুত উন্নয়ন করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বৈষম্য বাড়ে। সরকার বৈষম্য কমাতে দরিদ্রদের জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। তাই বৈষম্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে গরিব এমন ৫ শতাংশ মানুষের ২০১০ সালে সম্পদ ছিল দেশের মোট সম্পদের দশমিক ৭৮ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা কমে নেমে এসেছে দশমিক ২৩ শতাংশে। এ সময়ে গ্রামের গরিব মানুষের সম্পদ আরও বেশি কমেছে। ২০১০ সালে গ্রামের ৫ শতাংশ গরিব মানুষের সম্পদ ছিল দেশের মোট সম্পদের দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে তাদের সম্পদের পরিমাণ কমে হয়েছে দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০১০ সালে শহরাঞ্চলের সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশের সম্পদের হার ছিল দশমিক ৭৬ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা কমে নেমেছে দশমিক ২৭ শতাংশে।
অন্যদিকে ২০১০ সালে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশের সম্পদের পরিমাণ ছিল দেশের মোট সম্পদের ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০১৬ সালে তাদের সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৮২ শতাংশে। এই ৬ বছরের ব্যবধানে শহুরে ধনীদের সম্পদ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ২০১০ সালে শহরের ৫ শতাংশ ধনীর সম্পদ ছিল দেশের মোট সম্পদের ২৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ৬ বছরের ব্যবধানে তাদের সম্পদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ০৯ শতাংশে। এই সময়ে গ্রামের সর্বোচ্চ ধনীদের সম্পদও আগের তুলনায় বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন দ্রুত উন্নতি করছে। কোনো দেশ যখন উন্নয়নের এই পর্যায়ে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আয়বৈষম্য অর্থাৎ ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ে। এই বৈষম্য গড় আয়ুতেও প্রভেদ তৈরি করে।
আয়বৈষম্য এবং গড় আয়ুর বৈষম্য কমাতে সরকারের তরফ থেকে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৭৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখে দরিদ্রদের দেয়া হচ্ছে। সরকার স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সেবা খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। প্রগতিশীল করনীতির আওতায় ধনীদের কাছ থেকে অধিক হারে আয়কর আদায় করা হচ্ছে। সরকারের এসব নীতির কারণে একসময় বৈষম্য সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে, তা সে আয়বৈষম্যই হোক বা আয়ুবৈষম্য।

রাজনীতি