অর্থনীতি

ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদের হার পুনর্বিবেচনা করছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতাধীন ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের ৩ বছর মেয়াদি আমানতে সুদের হার ৬ শতাংশ করা হয়েছে। এতে ১ বছর, ২ বছর অথবা ৩ বছর মেয়াদী হিসাব খোলা যায়। এক্ষেত্রে মুনাফার হার ১ বছরের জন্য ৫ শতাংশ, ২ বছরের জন্য সাড়ে ৫ শতাংশ এবং ৩ বছরের জন্য ৬ শতাংশ। আমানতকারী ইচ্ছা করলে প্রতি ৬ মাস অন্তর মুনাফা উত্তোলন করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে প্রথম বছরে ৪ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরে সাড়ে ৪ শতাংশ এবং তৃতীয় বছরে ৫ শতাংশ হারে মুনাফা প্রদেয়।
বাংলাদেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এ হিসাব খুলতে পারবেন। নাবালকের পক্ষেও এ হিসাব খোলা যায়। বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, একক হিসেবে ৩০ লক্ষ টাকা এবং যুগ্ম হিসেবে ৬০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করা যাবে। অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, নমিনি নিয়োগ, পরিবর্তন ও বাতিল করা যাবে। তাছাড়া স্বয়ংক্রিয় পুনঃবিনিয়োগ সুবিধাও পাওয়া যাবে।
অবশ্য ১৩ ফেব্রুয়ারির আগে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন ৩ বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের ক্ষেত্রে অন্যান্য সব শর্ত অপরিবর্তিত থাকলেও মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। এতে দেখা যায়, ৩ বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদের হার পূর্বের তুলনায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে ডাকঘরে টাকা রেখে সঞ্চয়কারীরা এতদিন যে মুনাফা পেতেন, এখন তা পাওয়ার পথ রুদ্ধ হলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, দেশের সব মানুষের সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংকে নেয়ার উদ্দেশ্যে বেশি সুদের স্কিমগুলোর মুনাফার হার কমানো হচ্ছে। এতে হতাশ হয়ে মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমে যাবে। আর মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমে গেলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতেও। এমনিতেই এখন দেশে জিডিপির ৩৪ শতাংশ বিনিয়োগ চাহিদার বিপরীতে সঞ্চয়ের হার ২৭-২৮ শতাংশে ঘুরপাক খাচ্ছে। সঞ্চয় কমলে বিনিয়োগ সংকটে পড়বে দেশও।
তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সুদ বা মুনাফার হারের সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে সাধারণত মুনাফার হার মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে বেশি হয়। কারণ এসব দেশের সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবীরা তাদের কষ্টে জমানো টাকা ও পেনশনের টাকা সঞ্চয়পত্র ও ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন। সেখান থেকে তারা এতদিন ধরে মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কিছুটা বেশি হারে মুনাফা পেয়ে আসছিলেন। এখন ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়ে মূল্যস্ফীতির সমান বা তার চেয়ে নিচে নামানো হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার না কমালেও তাদের কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করাসহ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ সঞ্চয়কারীদের পক্ষে বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার ওপর আয়করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ নিশ্চিত করতে গিয়ে আমানতের সুদহার আগামী ১ এপ্রিল থেকে ৬ শতাংশে নামানোর প্রক্রিয়া চলছে। অথচ দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৫ শতাংশের মতো। অর্থাৎ এখন যে পণ্যের দাম ১০০ টাকা, ১ বছর পর ওই পণ্য কিনতে ১০৫ টাকা ৫০ পয়সা লাগবে। আর ব্যাংকে বা ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে এখন ১০০ টাকা আমানত রাখলে ১ বছর পর ১০৫ টাকা থেকে ১০৬ টাকা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ কষ্টের সঞ্চয় ব্যাংক বা ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে কিছু বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকছে না।
ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদহার অর্ধেকে নামিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এক প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে, ৩ বছর মেয়াদি প্রকল্পের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ থেকে কমে হবে ৬ শতাংশ। ২ বছর মেয়াদি সঞ্চয়ে সুদহার ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ কমে সাড়ে ৫ শতাংশ ও ১ বছর মেয়াদে সুদহার ১০ দশমিক ২০ থেকে কমে ৫ শতাংশ হবে।
ডাকঘরে টাকা রেখে যারা ৬ মাস পর পর মুনাফা উত্তোলন করেন, তাদের সুদহারও কমিয়ে অর্ধেক করা হয়েছে। এতদিন প্রথম বছরে সুদহার ছিল ৯ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরে সাড়ে ৯ শতাংশ ও তৃতীয় বছরে ১০ শতাংশ। এখন প্রথম বছর ৪ শতাংশ, দ্বিতীয় বছর সাড়ে ৪ শতাংশ ও তৃতীয় বছর ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে একক নামে ৩০ লাখ ও যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার কোটি টাকা। আর ৩ বছর মেয়াদি আমানত হিসেবে ডাকঘরে মানুষের সঞ্চয়ের পরিমাণ সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা।
মুদ্রাবাজার বিশ্লেষকরা জানান, বাংলাদেশে সঞ্চয়ের অর্থ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিনিয়োগের সুযোগ খুবই কম। সঞ্চয়পত্র, ডাকঘর সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক, শেয়ারবাজারের বাইরে বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বিনিয়োগ করে সঞ্চয়কারীরা বিভিন্ন সময় প্রতারিত হয়েছে। ফলে একই সঙ্গে ব্যাংক ও ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় বিনিয়োগের দুটি ক্ষেত্র বাকি থাকছে। এর একটি সঞ্চয়পত্র, অন্যটি শেয়ারবাজার। এখন ১ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গ্রামের সাধারণ সঞ্চয়কারী, মৃত সরকারি কর্মকর্তার বিধবা স্ত্রীসহ অনেকেরই টিআইএন না থাকায় সঞ্চয়পত্র কিনতে পারছেন না। ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি অনেক কমে গেছে। আর দেশের শেয়ারবাজারও স্থিতিশীল নয়, সেখানে বিনিয়োগ করে বারবার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সহায়-সম্বল হারাতে হয়েছে।
অবশ্য ব্যাপক সমালোচনার মুখে আগামীতে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, সঞ্চয়পত্র ও ডাকঘর সঞ্চয় স্কিম করা হয়েছিল সাধারণ মানুষের জন্য। কিন্তু এগুলোতে বড় ধরনের অপব্যবহার হয়েছে। এই অপব্যবহার রোধের জন্যই ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদহার কমানো হয়েছে। এখন এ নিয়ে নানা ধরনের কথা ওঠার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদহার পুনর্নির্ধারণের ব্যবস্থা নেয়া হবে।