প্রতিবেদন

ধর্ষকদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা ১৮ ফেব্রুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের ৬ষ্ঠ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা এবং অধিবেশনের সমাপনী ভাষণ দেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন।
সংসদ নেতা শেখ হাসিনা সন্ত্রাস, মাদক ও জঙ্গিবাদের মতো ধর্ষকদের বিরুদ্ধেও ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ ঘোষণা করে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ নামের কিছু পশু শিশু থেকে শুরু করে মেয়েদের বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষণ করছে। এদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নিয়েছি তেমনি এখন আমরা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও ধর্ষকের বিরুদ্ধে একইভাবে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’র ঘোষণা দিচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশবাসীকে আমি আহ্বান করবো, এই ধরনের ঘটনা (ধর্ষণ) যারা ঘটাচ্ছে তাদের ধরতে সকলেই যেন আমাদের সহযোগিতা করেন। কারণ, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আমরা আইনগতভাবেই নেব এবং এ বিষয়ে আমরা যথেষ্ট সচেতন রয়েছি।
উল্লেখ্য, সারাদেশে আশঙ্কাজনক হারে ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা বেড়েই চলছে, কোনোক্রমেই এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সলিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৭৩২ জন। অর্থাৎ ১ বছরের ব্যবধানে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যায় দ্বিগুণ। চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে সারাদেশে শতাধিক নারী ধর্ষণের শিকার হন। সে হিসাবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছর শেষে ধর্ষণের ঘটনা ২০১৯ সালকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে, আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ জন নারী। তবে চলতি বছরে এখনো ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেনি এবং আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেনি।
২০১৯ সালে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন নারী। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১৭০ জন। পত্রপত্রিকার হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম মাসে অন্তত ১৭ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
২০১৯ যৌন হয়রানির শিকার ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪ জন নারীসহ ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪৪ জন পুরুষও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
২০১৯ সালে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৬৭ জন নারী। তাদের মধ্যে নির্যাতনে নিহত হন ৯৬ জন এবং আত্মহত্যা করেন ৩ জন। আর পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ৪২৩ জন নারী।
২০১৯ সালে ২০০ জন নারী তাদের স্বামীর হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১৭৩ জন। এর বাইরে অ্যাসিড নিক্ষেপ, ফতোয়া এবং সালিশি ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন অনেক নারী। ২০১৯ সালে ৩ জন নারী ফতোয়ার কারণে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। তাদের মধ্যে একজন পরে আত্মহত্যা করেন।
প্রতিদিনই খবরের কাগজ উল্টালে ধর্ষণের একাধিক খবর দেখা যাচ্ছে। ২০১৯ সালে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৬৯৯টি শিশু। ৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণ করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এ তথ্য তুলে ধরেছে। অন্যদিকে একই সময়ে সারাদেশে ৪৯৬টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ)। ১৫টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সম্প্রতি ‘শিশু অধিকার লঙ্ঘন’ শীর্ষক এ উপাত্ত প্রকাশ করে সংস্থাটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে চরম নৈতিক অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতি, মাদকের বিস্তার, বিচারহীনতা, বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে শক্ত আইন আছে। কিন্তু শাস্তি দিয়ে অপরাধ খুব বেশি কমানো যায় না। এটা ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সমাজের ভিতরে অসংখ্য উপাদান আছে যা ধর্ষণ বা নারীর প্রতি সহিংসতাকে উসকে দেয়। সমাজে এখানো নারীকে ভোগের সামগ্রী মনে করা হয়। তাকে সেভাবে উপস্থাপনও করা হয় বিভিন্ন মাধ্যমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফৌজদারী বিচারব্যবস্থা এবং সাক্ষ্য আইনে নানা সমস্যার কারণে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। ধর্ষণের শিকার একজন নারীর চরিত্রহননের সমস্যাটিও প্রকট। থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়েও ধর্ষণের শিকার হতে হয় নারীকে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডাক্তারি পরীক্ষা না করলে ধর্ষণের আলামত নষ্ট হয়ে যায়। আদালতে তাকে অনেক বিব্রতকর প্রশ্ন করা হয়। ফলে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ধর্ষণের মতো জঘন্য এ অপরাধ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারও বেশ চিন্তিত। এ ধরনের ঘৃণ্য কর্মকা- সমাজ থেকে দূর করতে ধর্ষণ প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সরকার ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে এই ঘোষণা দিয়ে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন।