কলাম

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশে জনগণের সার্বভৌমত্ব

অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার গোস্বামী
(পূর্ব প্রকাশের পর)
গবেষণা পদ্ধতি
গবেষণায় বিষয়টি মূলত ইতিহাসনির্ভর। তাই যে ঐতিহাসিক পথ অতিক্রম করে বাংলাদেশে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করে গ্রন্থটির অবয়ব গড়ে উঠেছে। এদিক থেকে বিবেচনায় এটি বর্ণনামূলক গবেষণা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি এই গবেষণাকর্মটি মূলত গুণগত হলেও গবেষণার কোনো কোনো পর্যায়ে সংখ্যাগত উপাত্ত ব্যবহৃত হয়েছে। আবার এখানে পর্যবেক্ষণপদ্ধতি এবং ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ পদ্ধতিও অনুসরণ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণকৃত এবং বিভিন্ন ডকুমেন্টে সন্নিবেশিত গুণগত ও সংখ্যাগত উপাত্তের বৈধতা নিশ্চিত করতে উপাত্ত ট্রায়াঙ্গুলেশন ১ করা হয়েছে। এছাড়া, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশে জনগণের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কিত তথ্য ও উপাত্তের বিভিন্ন মাত্রা ও ব্যাপ্তির প্রয়োজনেও ট্রায়াঙ্গুলেশনের দরকার হয়েছে।

তাত্ত্বিক কাঠামো
সাধারণভাবে তত্ত্ব হচ্ছে নির্দেশিকা যা অধিকতর যৌক্তিক আকারে গবেষণাকর্ম পরিচালনা করতে পরিশীলিত পথ দেখায়। একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির বিভিন্ন স্পর্শকাতরতা অনুধাবনে তত্ত্ব প্রয়োজনীয় ও অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। এভাবে আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার্থে একটি জটিল ও নির্দিষ্ট পথে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সংগ্রামী ও রক্তাক্ত প্রচেষ্টা এগিয়ে যাওয়াকে ব্যাখ্যা করতে চাই, তাহলে সংগ্রামের যে চড়াই-উৎরাই পথ ধরে তা এগিয়েছে তা ব্যাখ্যা করার মতো উপযুক্ত তত্ত্ব প্রয়োজন। তবে, এভাবে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন তত্ত্ব প্রয়োগ করা যেতে পারে, যদিও প্রতিটি তত্ত্বেরই রয়েছে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা। কারণ, কোনো নির্দিষ্ট একটি তত্ত্বের মাধ্যমে সমগ্র বিষয়টি ব্যাখ্যাযোগ্য নয়। নেতৃত্ব একটি গবেষণা ক্ষেত্র এবং একটি কার্যকর নৈপূণ্য যা ব্যক্তিবর্গ, দল বা সংগঠনকে পরিচালিত করার ব্যাপারে একজন ব্যক্তির বা সংগঠনের কার্যকর নৈপূণ্যকে বোঝায়। বর্তমান গবেষণাটির তাত্ত্বিক কাঠমো গড়ে উঠেছে ১. বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব; ২. জনগণ; ৩. সার্বভৌমত্ব; ও ৪. বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব
যেহেতু বঙ্গবন্ধুর অনন্য সাধারণ ঐতিহাসিক নেতৃত্ব বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রধানতম সংগঠক ও অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে সেহেতু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে ‘নেতৃত্বের’ ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করা যুক্তিসঙ্গত হবে। রাজনৈতিক বিষয় বিবেচনার ক্ষেত্রে স্মরণাতীত কাল থেকে নেতা ও নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্বন্ধে নিয়মবদ্ধ গবেষণা এখনো অঙ্কুরেই আছে। যেমন বার্নস (১৯৭৮:২) বলেন, পৃথিবীতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সর্বাধিক পর্যবেক্ষণকৃত অথচ সবচেয়ে কম অনুধাবনকৃত। (চড়ষরঃরপধষ ষবধফবৎংযরঢ় রং ড়হব ড়ভ ঃযব সড়ংঃ ড়নংবৎাবফ নঁঃ ষবধংঃ ঁহফবৎংঃড়ড়ফ ঢ়যবহড়সবহড়হ ড়হ বধৎঃয.) এর আংশিক কারণ হচ্ছে নেতৃত্ব কী এবং এই ধরনের নেতৃত্ব চর্চার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয় সংশ্লিষ্ট সে সম্বন্ধে ঐকমত্যের অভাব। ভিন্নতার আর একটি কারণ হচ্ছে যারা রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে পড়াশুনা করছেন তারা নেতা এবং নেতৃত্ব দেখেন ভিন্ন ভিন্ন সুবিধাজনক অবস্থান থেকে এবং তাদের মনে থাকে বিভিন্ন ধরনের উদ্দেশ্য। এটি সেই প্রবাদের অন্ধ ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক হাতির শুধু এক একটি অঙ্গ অনুভব করার মতো, বিশাল হাতির শুধু একটি অঙ্গ অনুভব করে যারা প্রত্যেকেই মনে করে যে তিনি যা অনুভব করছেন সেটাই হচ্ছে একটি সামগ্রিক অবস্থা। কিন্তু যেকোনো নেতৃত্ব বুঝতে হলে নেতৃত্বের উপাদানগুলো বুঝতে হবে। মার্গারেট জি. ঘারস্যান (১৯৮৬) তাঁর ‘ইনগ্রিডিয়েন্টস অব লিডারশিপ’ শীর্ষক নিবন্ধে নেতৃত্বের ৫টি উপাদানের কথা বলেছেন। এগুলো হচ্ছে, ১. নেতার ব্যক্তিত্ব এবং পটভূমি একইসাথে নিয়োগ প্রক্রিয়া যার দ্বারা তিনি নেতা হয়েছেন; ২. যে গোষ্ঠী বা ব্যক্তিবর্গকে নেতা নেতৃত্ব দেন তার বৈশিষ্ট্য; ৩. নেতা এবং যাদেরকে নেতৃত্ব দেয়া হচ্ছে এই উভয়ের মধ্যে সম্পর্কের প্রকৃতি; ৪. যে প্রেক্ষাপট এবং অবস্থায় নেতৃত্ব দেয়া হচ্ছে সেটি, এবং ৫. নেতা এবং তিনি যে সুনির্দিষ্ট অবস্থায় যাদেরকে নেতৃত্ব দেন তাদের মধ্যে সম্পর্ক।
কোন ধরনের নেতৃত্ব আমাদের আছে তা নির্ভর করে এই ৫টি উপাদানের প্রকৃতি ও সংমিশ্রণের ওপর। যেকোনো ধরনের খাবারের বেলায় যেমন, তেমনি বিচিত্র ধরনের সব ফল পাওয়ার জন্য এই উপাদানগুলোর সংমিশ্রণ ঘটানো যায় বিভিন্নভাবে। এই ৫টি মানদ-ে যদি আমরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব বিবেচনা করি তাহলে আমরা দেখব, বঙ্গবন্ধুর ছিল সাধারণ মানুষের নিকট সহজে মিশে যাওয়ার মতো আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং তিনি খুব সাধারণ বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলার কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষদের, যারা যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন শাসকদের দ্বারা বঞ্চিত হয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার প্রত্যন্ত একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশ একটি গ্রামপ্রধান দেশ। অতএব সেই গ্রামবাংলার গ্রামের মানুষদের সাথে তার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। যার উদাহরণ আমরা গবেষণার বিভিন্ন স্তরে দেখতে পাব। বলা চলে, তিনি এক রাজনৈতিক যুগসন্ধিক্ষণে বাঙালিদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। একদিকে ব্রিটিশ শাসনামল থেকে পাকিস্তানের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আর এর পরই ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তানের অধীনে শুধু শোষণ আর নির্যাতন ভোগই ছিল বাঙালির ললাট লিখন। এমন এক পরিস্থিতিতে মুক্তি সংগ্রামের জন্য বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের প্রস্তুত করেছেন এবং তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালিরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। (পূর্ব) বাঙালিদের ওপর শোষণের এক কঠিন দুঃসময়ে তিনি নেতৃত্বের হাল ধরেছেন।
যেকোনো দেশে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সেদেশের নেতার একটা ভূমিকা থাকে। সপ্তদশ শতকের ইংরেজ কবি ও ঔপন্যাসিক জন মিল্টনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ‘জনগণ’ হচ্ছে একজন প্রাকৃতিক এলিটের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি সম্প্রদায়। মিল্টনের এই উক্তির মধ্যে যদিও প্রাকৃতিক এলিটের উপাদান সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি, তবে এটি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন নেতাকেই বুঝাতে চেয়েছেন। এই প্রাকৃতিক এলিট তথা নেতার উপাদান হিসেবে আমরা হারম্যান যে উপাদানগুলোর কথা বলেছেন সেগুলোকেও গ্রহণ করতে পারি। এটি সত্যি যে একটি দেশের ‘জনগণ’ সেই দেশের সাথে নিজেদের পরিচিতি এক করে দেখেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সার্জেন্ট এটিকে জাতীয় সচেতনতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বলা বাহুল্য, জাতীয় সচেতনতা ও জাতীয় পরিচিতি, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের মৌলিক উপাদান ( লইম্যান টাওয়ার সার্জেন্ট ১৯৮১: ১৯)।

সার্বভৌমত্ব
লাতিন শব্দ ঝঁঢ়বৎধহঁং ফরাসি শব্দ ঝড়াঁবৎধরহবঃব এর মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব (ঝড়াবৎবরমহঃু) প্রত্যয়টি দ্বারা মূলত সুপ্রিম ক্ষমতার সমতুল্য অর্থে বোঝানো হতো। বাস্তবে এর প্রয়োগ প্রায়শ প্রচলিত অর্থ থেকে বিচ্যুত হয়ে থাকে।
ষোড়শ শতকের ফরাসি দার্শনিক জাঁ ব্যোদা (১৫৩০-৯৬) বিদ্রোহপ্রবণ সামন্ত প্রভূদের ওপর ফরাসি রাজার ক্ষমতা উচ্চকিত করতে সার্বভৌমত্বের নতুন ধারণা ব্যবহার করতেন; যা সামন্তবাদ হতে জাতীয়তাবাদে উত্তরণে সহায়ক হয়েছে।
সার্বভৌমত্ব ধারণাটি যিনি আধুনিক অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বাধিক অবদান রেখেছেন তিনি হচ্ছেন ইংরেজ দার্শনিক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯)। হবস যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, প্রতিটি যথার্থ রাষ্ট্রে কতিপয় ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের সমষ্টির হাতে আইন জারি করার চূড়ান্ত এবং নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব থাকতে হয়; তাঁর মতে এই কর্তৃত্ব বিভক্ত হলে রাষ্ট্রের ঐক্যও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
ইংরেজ দার্শনিক জন লক (১৬৩২-১৭০৪) এবং ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ জ্যাক রুশোর (১৭১২-১৭৭৮) তত্ত্বসমূহ নাগরিকদের আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক ঘনিষ্ঠতার একটি সামাজিক চুক্তি; যার মাধ্যমে তারা একটি সরকারের প্রতি এ ধরনের ক্ষমতার আস্থা রাখে, যা সাধারণের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে। আর এই অবস্থাতেই জন্ম নেয় জনপ্রিয় সার্বভৌমত্বের ধারণা, যা ১৭৭৬ সালে আমেরিকার এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। এই ধারণার আর একটি দিক ১৭৯১ সালের ফরাসি সংবিধানের বিবৃতিতে দেয়া হয়েছিল, ‘ঝড়াবৎবরমহঃু রং ড়হব রহফরারংরনষব, ঁহধষরবহধনষব ধহফ রসঢ়ৎবংপৎরঢ়ঃরনষব; রঃ নবষড়হমং ঃড় ঃযব ঘধঃরড়হ; হড় মৎড়ঁঢ় পধহ ধঃঃৎরনঁঃব ংড়াবৎবরমহঃু ঃড় রঃংবষভ হড়ৎ পধহ ধহ রহফরারফঁধষ ধৎৎড়মধঃব রঃ ঃড় যরসংবষভ’ অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব হচ্ছে এক, অবিভাজ্য, অনবহার্য এবং অবিচ্ছেদ্য এটি জাতিতে সংসৃষ্ট হয়; কোনো গোষ্ঠী তার নিজের প্রতি এই গুণ যোগ করতে পারে না অথবা কোনো ব্যক্তি নিজের সার্বভৌমত্বের ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে পারে না। এভাবে, জনপ্রিয় সার্বভৌমত্বের ধারণা প্রাথমিকভাবে জনগণ দ্বারা চালিত হয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার সাথে সমন্বিত হয়। জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রকৃতির রাজ্যের কোনো অসংগঠিত জনগণ দ্বারা চালিত হয় না, বরঞ্চ জাতি একটি সংগঠিত রাষ্ট্রে মূর্ত হয়ে ওঠে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ জুরিস্ট জন অস্টিন (১৭৯০-১৮৫৯) ধারণাটির আরও বিকাশ ঘটান, জনগণের বা রাষ্ট্রের নামে কে সার্বভৌমত্ব চালিত করে। তিনি এই মর্মে উপসংহারে উপনীত হন যে, সার্বভৌমত্ব একটি জাতির পার্লামেন্টের মধ্যে সমর্পিত হয়। তিনি আরও যুক্তি দেখান যে, একটি পার্লামেন্ট হচ্ছে একটি সুপ্রিম অঙ্গ যা সকলের ওপর বাধ্যবাধকতার শর্তযুক্ত আইন প্রণয়ন করে। তবে যে আইন দ্বারা পার্লামেন্ট নিজে আবদ্ধ নয় আবার এটি (পার্লামেন্ট) ইচ্ছা করলে এ আইন পরিবর্তন করতে পারে।
এই বিবরণ, যা-ই হোক, নির্দিষ্ট একটি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন ঊনবিংশ শতাব্দির গ্রেট ব্রিটেনে প্রচলিত ব্যবস্থা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতিতে অস্টিনের সংসদীয় সার্বভৌমত্ব ধারণাটি পুরোপুরি প্রযাজ্য নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে, যেটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ইউনিয়নের মৌলিক আইন, জাতীয় আইনসভাকে সার্বভৌমত্বের গুণে বিভূষিত করেনি বরং এর ওপর গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। ১৮০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মার্বারি বনাম মেডিসন মামলার রায়ের মাধ্যমে আরোপিত জুডিশিয়াল রিভিউ বা বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার দ্বারা আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার অধিকার ঘোষণার মাধ্যমে সার্বভৌমত্বের ধারণার সাথে আরও জটিলতা যুক্ত করেছে। যদিও এই পরিস্থিতি বিচার বিভাগীয় সার্বভৌমত্বের দিকে নিয়ে যায় না, এটি সংবিধান নামের মৌলিক দলিলের মধ্যে সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা অর্পন করে।
সাংবিধানিক সার্বভৌমত্বের এই ব্যবস্থা আরও জটিল করা হয়েছে এভাবে যে সংবিধান পরিবর্তনের প্রস্তাব এবং তা অনুমোদনের কর্তৃত্ব শুধু কংগ্রেসের ওপর অর্পিতই হয়নি, অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপরও হয়েছে এবং ওই উদ্দেশ্যে বিশেষ কনভেনশন আহ্বানের এখতিয়ার দেয়া হয়েছে।
এভাবে যুক্তি দেখানো যায় যে সার্বভৌমত্ব অঙ্গরাজ্যসমূহ বা জনগণের মধ্যে অবস্থান করে। অঙ্গরাজ্যসমূহ বা জনগণের মধ্যে অবস্থান করে। অঙ্গরাজ্যগুলো বা জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস এটি সংবিধান দ্বারা আরোপিত কিংবা নিষিদ্ধ হয়নি (দশম সংশোধনী)। ফলে রাষ্ট্রের অধিকারসমূহের প্রবক্তাদের দাবি যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অব্যাহত থাকছে তা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সার্বভৌমত্বের একক সংগ্রহস্থলে দাঁড় করানো জটিল ও কঠিন। একই সাথে ইউনিয়ন এবং অঙ্গীভূত একক উভয়ের দ্বৈত সার্বভৌমত্বের ধারণা একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি লাভ করে। যদিও প্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয় সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের সার্বভৌমত্ব আরোপ করে, তা গৃহীত হয়েছিল, এতদসত্ত্বেও, একটি যুক্তি দেখানো যায় যে, এই সার্বভৌমত্ব জাতীয় সরকার কর্তৃক এককভাবে জনগণের পক্ষে চালনা না করে যুক্তরাষ্ট্রীয় এবং রাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্য অনুসারে ভাগ করা যেতে পারে।
রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বের মতবাদের মধ্য থেকে আরেকটি আঘাত বিংশ শতাব্দীতে লিওন ডুগুইট, হিউগো ক্রাব্বি, হ্যারল্ড প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছ থেকে এসেছে। তাদের তত্ত্ব হচ্ছে বহুত্ববাদী সার্বভৌমত্ব (বহুত্ববাদ) যেটি রাজনৈতিক, অর্থনেতিক, সামাজিক, এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো দ্বারা চালিত হয় যা প্রতিটি রাষ্ট্রের সরকারের কর্তৃত্বে পরিচালিত হয়, তবে জাতি একটি সংগঠিত রাষ্ট্রে অবয়ব লাভ করে। এই মতবাদ অনুযায়ী, প্রতিটি সমাজে সার্বভৌমত্ব কোনো নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে না বরঞ্চ এটি দৃঢ়তার সাথে একটি গোষ্ঠী হতে অথবা গোষ্ঠীসমূহের জোট হতে আর একটিতে স্থান বদল করে। বহুত্ববাদী তত্ত্বটিও পোষণ করে যে, রাষ্ট্র সামাজিক সংহতির অনেক উদাহরণের একটি এবং সমাজের অন্যান্য উপাদানের তুলনায় কোনো বিশেষ কর্তৃত্ব ধারণ করে না। (চলবে)
লেখক: চেয়ারম্যান
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ও পরিচালক
সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়