অর্থনীতি

ব্যাংকিং কমিশন গঠনে সরকারের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালো সিপিডি

নিজস্ব প্রতিবেদক
গত ২০ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে বিশেষ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ওই নির্দেশনার আলোকে কমিটি গঠনের জন্য মতামত চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদকে চেয়ারম্যান করে কমিটি বা কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে ২২ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সেন্টার ফর পরিসি ডায়লগ (সিপিডি)।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটি কমিশন গঠনের রূপরেখা দেয় সিপিডি। এতে ব্যাংকিং কমিশনের কার্যপরিধি, সম্ভাব্য সুপারিশ এবং তা বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করছে না। ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা, স্বচ্ছতা ও বিশ্বস্ততার সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে ব্যাংক কমিশন করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এ কমিশনের সফলতার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের আলোকিত সমর্থন থাকতে হবে। তা না হলে ব্যাংক খাতে কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।
রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত ব্যাংকিং কমিশন: সিপিডি’র প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই রূপরেখা তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
ড. ফাহমিদা বলেন, ব্যাংকিং কমিশন গঠন বিষয়ে যে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে তার বিস্তারিত আমরা এখনও জানি না। গত ৮ বছর ধরে আমরা ব্যাংকিং কমিশন নিয়ে কথা বলে আসছি। কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য, কার্যপরিধি, কার্যপ্রণালি এবং সুপারিশ কী হতে পারে, সে বিষয়ে আমাদের কিছু ধারণা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রথমত কমিশনের কার্যপরিধি সুনির্দিষ্ট থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত ব্যাংকিং খাতের সঠিক তথ্য পাওয়া এবং পরিসংখ্যানের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যাগুলোর কারণ কী এবং সামনের দিনে চ্যালেঞ্জগুলো কী হতে পারে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতের সমস্যার জন্য কারা এবং কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী দায়ী তা চিহ্নিত করতে হবে। পঞ্চমত, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট থেকে প্রশাসনিক ও আইনগত কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তার সুপারিশ তৈরি করতে হবে। একটি সাময়িক কমিশন হিসেবে এর সময় নির্ধারিত থাকতে হবে। ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে কাজগুলো শেষ করতে হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, আগামী জুনে বাজেট আসছে। বাজেটের পরপরই যাতে কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কী পদ্ধতিতে কমিশন কাজ করবে, তার একটি অন্তর্বর্তীমূলক পদক্ষেপ দরকার। সে জন্য ব্যক্তিখাতের কয়েকজন বড় বড় ব্যবসায়ী বা নীতিনির্ধারকের সঙ্গে আলাপ আলোচনা না করে সবার সঙ্গে বসে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোক্তা, সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ছোট-বড় সঞ্চয়কারী, বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, ব্যাংক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নারী, যুবক এবং ঢাকার বাইরের জনগণ। অর্থাৎ যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীল তাদের সবাইকে আলোচনার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।
প্রতিষ্ঠানটির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অবশ্য বলেন, এ মুহূর্তে ব্যাংকিং খাত নিয়ে আস্থার সংকট আছে। একটা স্বচ্ছতার সংকট আছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততার সংকট আছে। আস্থা, স্বচ্ছতা ও বিশ্বস্ততার সংকট কাটিয়ে উঠে ব্যাংকিং কমিশনকে কাজ করতে হবে। এর জন্য সর্বোপরি প্রয়োজন পড়বে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আলোকিত সমর্থন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এ কমিশনকে সমর্থন না দেন, তাহলে এ কমিশন শুধু একটি কমিশনই থেকে যাবে, ব্যাংকিং খাতের কার্যকর পরিবর্তনের সুযোগ হয়ত আসবে না।
ড. দেবপ্রিয় আরো বলেন, অর্থনৈতিক সমস্যা এক সময় রাজনৈতিক অর্থনীতি সমস্যায় উপনীত হয়েছিল। রাজনৈতিক অর্থনীতি সমস্যা এখন রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে রাজনৈতিক সমর্থন বাদ দিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ যে সীমিত তা প্রমাণ হয় নতুন ব্যাংক দেয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন ব্যাংক হবে না, তারপরও নতুন ৩টি ব্যাংক হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সব থেকে বেশি বিচলিত করছে কেন্দ্রীয়ভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যেসব সুবিবেচিত নীতিমালা দেয়া হয়েছে তার প্রকাশ্য বরখেলাপ। বরখেলাপগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেআইনি কার্যকলাপে উপনীত হচ্ছে। ফলে দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানকে এখানে যুক্ত হতে হচ্ছে। আমরা দেখছি, গুটিকয়েক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছে এখন পুরো ব্যাংক খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি যখন ক্রমান্বয়ে বিকাশ লাভ করছিল, সে রকম একটি পরিস্থিতিতে ২০১২ সালে হল-মার্কের কেলেঙ্কারি উদঘাটিত হয়, তখন থেকে আমরা ব্যাংকিং কমিশনের বিষয়ে বলে আসছি। যেহেতু এক্ষেত্রে এখন কিছুটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে সেহেতু আমরা অত্যন্ত খুশি এবং এর পরিপূর্ণ সাফল্য কামনা করছি।