খেলা

যে কারণে পেশাদারিত্ব আসছে না নারী ফুটবলে

ক্রীড়া প্রতিবেদক
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে যে দলগুলো খেলে, তারা এগিয়ে না এলে নারী ফুটবল পেশাদারিত্বের কাঠামোয় আসবে না Ñ এমন মন্তব্য করেছেন বাফুফে নারী উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ। তবে ২২ ফেব্রুয়ারি যে লীগ শুরু হয়েছে তা পুরোপুরি পেশাদার না হলেও যথেষ্ট জমজমাট হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গত কয়েক বছর ধরে দেশের নারী ফুটবলের উন্নতির গল্পটা সবার জানা। পাশাপাশি এটাও সত্য, এই অগ্রগতিটা সীমাবদ্ধ একটি নির্দিষ্ট গ-ির মধ্যে।
যথেষ্ট প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও কেন এ অবস্থা? এর কারণ খুঁজলে বেরিয়ে আসে নারী ফুটবল নিয়ে ক্লাবগুলোর অনাগ্রহের বিষয়টি।
গত কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নারী উইং এবার উদ্যোগ নিয়েছে লীগ আয়োজনের। তবে তাতে মোটেও আগ্রহ দেখায়নি ‘পেশাদার’ ট্যাগ লাগানো ক্লাবগুলো। একমাত্র বসুন্ধরা কিংস সেখানে ব্যতিক্রমী নাম। ক্লাবগুলোর এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে রাখায় হতাশা প্রকাশ করেছে বাফুফে।
এ প্রসঙ্গে কিরণ বলেন, ক্লাবগুলো মুখে একটা বলে, করে অন্যটা। নারী লীগের আসরে তারা অংশগ্রহণ করে না। তাদের ফুটবল এখন মুখে, মাঠে নয়।
ঢাকার ক্লাবগুলো মুখ ফিরিয়ে রাখায় বাধ্য হয়ে ফেডারেশনকে যেতে হয়েছে বিভাগীয় দলগুলোর দিকে। এতে এই লীগের আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমেছে। তবে নারী উইংয়ের দাবি, লীগটা পুরোপুরি পেশাদার না হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘাটতি থাকবে না।
এ প্রসঙ্গে বাফুফের ভাষ্য, লীগটাকে যদি আমরা প্রফেশনালভাবে নিতে চাই তাহলে ছেলেদের যে ক্লাবগুলো অংশগ্রহণ করে, তাদের এগিয়ে আসতে হবে, অন্যথায় সম্ভব না। এ বছর আমরা যে লীগ শুরু করেছি, সেটা প্রফেশনাল লীগ নয়, এটা উইমেন্স লীগ। এটাকে আমরা ক্রমেই প্রফেশনাল লীগে রূপ দেবো।
২২ ফেব্রুয়ারি থেকে কমলাপুর স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে মহিলা ফুটবল লীগ। যেখানে অংশ নেয় বসুন্ধরা কিংস, এফসি উত্তরবঙ্গ, আনোয়ারা স্পোর্টিং, নাসরিন স্পোর্টিং, কাচারিপাড়া একাদশ, কুমিল্লা ইউনাইটেড ও স্বপ্নচূড়া ফুটবল একাডেমি।
নারী ফুটবলে পেশাদারিত্ব না আসার অন্যতম আরেকটি কারণ, খুব অল্প বয়সে নারী ফুটবলাররা খেলা ছেড়ে দেন বা দিতে বাধ্য হন।
একসময় জাতীয় ফুটবল দলের নেতৃত্ব দিতেন ডালিয়া আক্তার। তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, ‘আমি ফুটবল ছাড়িনি, ছেড়ে দিতে অনেকটা বাধ্য হয়েছি।’ মাত্র ২৫ বছর বয়সেই তিনি ফুটবল ছেড়ে দিয়ে শুরু করেন হ্যান্ডবল খেলা, এরপর কোচিং। তিনি বলেন, শেষ যখন অধিনায়কত্ব করি তখন ইন্দো-বাংলা গেমসে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই। এর ঠিক পরই সাফ গেমসের জন্য যে ৩৮ জনের দল ঘোষণা করা হয়, সেখানে আমাকে রাখাই হয়নি।
জানা গেছে, অল্প বয়সেই ফুটবল ছেড়ে কোচিং, রেফারিং বা অন্য ক্রীড়ায় যোগ দেয়া নারীদের তালিকা বেশ লম্বা।
সাবিনা খাতুন, যাকে বলা হয় বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সাকিব, তিনি ফুটবল ছেড়ে দেন ২৪ বছর বয়সে। অম্রাচিং মারমা সাফ ফুটবলেও গোল করেছেন, ২৩ বছর বয়সে ফুটবল ছেড়েছেন। জয়া চাকমা, ২৮ বছর বয়সের এই সাবেক নারী ফুটবলার বাংলাদেশ ও দেশের বাইরে রেফারির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ফুটবল ছেড়েছেন ২০১২ সালে, অর্থাৎ মাত্র ২১ বছর বয়সে।
এ বিষয়ে ডালিয়া আক্তার জানান, বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন শুধু বয়সভিত্তিক ফুটবল দল নিয়ে কাজ করেছে। নারীদের লিগ হওয়ার কথা থাকলেও তার কোনো ধারাবাহিকতা নেই। খেলোয়াড়রা খেলা ছাড়েন না। তবে একজন নারী ফুটবলার নিজেকে কতদিন কোনো লক্ষ্য ছাড়া উজ্জীবিত রাখবেন? বাফুফের কাছ থেকে সহায়তা পান না বলেই তারা নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই খেলা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে যান। একজন নারী ফুটবলার যখন দেখেন কোনো লিগ নেই, কোনো আয়োজন নেই, তখন তিনি বিকল্প দেখতে বাধ্য হন।
ডালিয়া আক্তার আরো বলেন, গত ১০ বছরে জাতীয় পর্যায়ের চ্যাম্পিয়নশিপ হয়েছে মাত্র দু’বার। ক্লাবগুলোও এখন আগ্রহ হারাচ্ছে। যেহেতু খেলা নেই তাই ফুটবলারদের বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হয় – যেটা শেষ পর্যন্ত ক্লাবগুলোর জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু অনূর্ধ্ব-১৪ এবং অনূর্ধ্ব-১৬তে সর্বোচ্চ ৪০ জন ফুটবলার রয়েছে, কিন্তু একটা দেশে ন্যূনতম ৪ থেকে ৬ হাজার নারী ফুটবলার প্রয়োজন।
ডালিয়া আক্তার মনে করেন, গ্রাম থেকে আসা একটা মেয়ের জন্য ১৮ বছর বয়স হওয়ার পর কোনো পেশাদার মঞ্চ ছাড়া ফুটবল চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যায়, যার কারণে অনেক অভিভাবক ফুটবলারদের খেলা থেকে নিয়ে যান।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নারী উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণ বলেন, অনেক নারী ফুটবলার বিয়ে করে আর ফুটবল চালিয়ে যেতে পারেন না। যেহেতু আমরা বাঙালি, বিয়ে-শাদীর ব্যাপারটা চলে আসে।
তবে তিনি জানান, বয়সভিত্তিক পুরুষ দলেও কোনো বেতনের ব্যবস্থা নেই, কিন্তু নারী দলের জন্য বেতন দেয়া হয়, যদিও তা পেশাদারিত্বের জন্য যথেষ্ট নয়।
ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে হলে পুরুষ ফুটবলারদের মতো নারী ফুটবলারদের দিকেও সমান নজর দিতে হবে। একজন নারী ফুটবলার ফুটবল খেলাকে তখনই পেশাদারিত্বের দৃষ্টিতে দেখবে, যখন এই খেলায় প্রচুর টাকা থাকবে। এক্ষেত্রে ক্লাবগুলোকে এবং বাফুফেকে এগিয়ে আসতে হবে। নারী ফুটবল লীগের আয়োজন করতে হবে এবং সেখানে আবাহনী-মোহামেডানের মতো ক্লাবগুলোকে খেলতে বাধ্য করতে হবে।