রাজনীতি

রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন রূপে জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে জামায়াত বিদায় নিয়েছে Ñ এমন আত্মপ্রসাদ আছে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করায় দলটি তাদের নির্বাচনি প্রতীক দাড়িপাল্লা নিয়ে যেকোনো নির্বাচনে অংশ নেয়ার অধিকার হারায়। ইসির এই সিদ্ধান্তের কারণে গত ২টি সংসদ নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিতে পারেনি জামায়াত। ফলে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও নেমে আসে স্থবিরতা। যুদ্ধাপরাধের দায়ে দলটির শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদ- কার্যকর হলে অন্য নেতারা নিজেদের গুটিয়ে নেন। সরকারবিরোধী আন্দোলন থেকেও দলটি নিজেদের সরিয়ে নেয়। এ অবস্থায় অনেকেই ভাবতে থাকেন, বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছে জামায়াত।
কিন্তু বাস্তবে জামায়াতের বিদায় ঘটেছে, না দলটি গোপনে সংগঠিত হচ্ছে তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই গেছে। অনেকেই বলছেন, জামায়াত নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে সত্য, কিন্তু পর্দার অন্তরালে তাদের রাজনৈতিক কর্মকা- ঠিকই চালু আছে। তারা ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন নির্বাচনে কখনও বিএনপির সাথে যুগপৎভাবে আবার কখনও বেনামে নতুন রূপে অংশ নিচ্ছে।
জানা গেছে, জামায়াত তার নতুন কর্মপন্থা অনুযায়ী তাদের নেতাকর্মীদের আপাতত ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন’-এর পতাকাতলে আশ্রয় নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। কথিত আছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির প্রায় ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার নেপথ্যে নাকি ছিল জামায়াত। তাছাড়া বিভিন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘হাতপাখা’ মার্কার প্রার্থীরা অংশ নিয়ে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার ভোট পাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, হাতপাখা মার্কার এত এত ভোটের নেপথ্যেও নাকি আছে জামায়াত।
সে যা-ই হোক, জামায়াতের নেতারা এখন নতুন নামে নিবন্ধনের চেষ্টা চালাচ্ছে। জানা গেছে, জামায়াত নেতারা ‘জন আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছেন। এমনকি এ প্ল্যাটফর্মে বিএনপিপন্থি নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবীরাও যুক্ত হচ্ছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে। নেতৃত্বহীন বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে হতাশ অনেক নেতাকর্মীকে নতুন রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে জামায়াত।
জানা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি সভায় সংস্কার ও একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এমনকি দল বিলুপ্ত করে সমাজসেবার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তও আসে সভায়। তবে বিষয়টি তখনও দলের মজলিশে শূরায় অনুমোদন পায়নি। দলটির নেতৃত্বের একটা অংশ এ ধরনের প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেয়। এই অংশ একাত্তরের ভুল স্বীকার করে বর্তমান নামে দলকে সচল রাখতে অথবা নতুন নামে দল গঠন করতে চায়।
৯ বছর আগে অনেকটা একই রকম প্রস্তাব দিয়েছিলেন জামায়াতের তখনকার সহকারী সেক্রেটারি-জেনারেল যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। তিনি ২০১০ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিন পর কারাগার থেকে দেয়া এক চিঠিতে প্রস্তাব করেছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন দায়িত্বশীলদের হাতে জামায়াতকে যেন ছেড়ে দেয়া হয়। তিনি একাধিক বিকল্পের মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতের নামও পরিবর্তন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর জামায়াত ও শিবিরের একটি অংশ নতুন করে ওই প্রস্তাব সামনে আনে।
ঠিক এমন অবস্থায় গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি সংস্কার ও একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে নেতৃত্ব সাড়া না দেয়ার প্রতিবাদে দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন লন্ডনে অবস্থানরত দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।
দলটির এমন একজন প্রভাবশালী নেতার পদত্যাগে কিছুটা চাপের মধ্যে পড়েছিল জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব। একটি অংশ তার পদত্যাগের পর নতুন করে সংগঠিত হয়ে চাপ তৈরি করে। এমন অবস্থার মধ্যেই সংস্কারের দাবি তোলায় বহিষ্কার করা হয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও জামায়াতের ঢাকা মহানগর মজলিসে শূরার অন্যতম সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জুকে। দুটি ঘটনার প্রভাব বুঝতে পেরে দলটির শীর্ষ নেতারা পরিস্থিতি সামাল দিতে সংস্কার ও ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে ‘কাজ হচ্ছে’ বলে প্রচার চালাতে থাকেন। দলের মধ্যে অসন্তোষ সামাল দিতে একটি কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছিল।
এ অবস্থায় জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব ‘জন আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ নামে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এমন ঘটনা জামায়াতের রাজনীতির ইতিহাসে কখনও দেখা যায়নি। গত বছরের ২৭ এপ্রিল যাত্রা শুরু হয়েছিল জন আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ নামে নতুন এ রাজনৈতিক উদ্যোগের। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা যাচ্ছে, এই উদ্যোগের মূলে আছেন জামায়াতের পদত্যাগী প্রভাবশালী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এবং তার নেতৃত্বেই জামায়াত নতুন নামে সংগঠিত হতে চাচ্ছে।
রাজ্জাকের উদ্যোগকে সমর্থন দিচ্ছেন যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্যে পলাতক জামায়াত নেতা ও ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবু নাসের, শিবিরের প্রতিষ্ঠাকালীন সেক্রেটারি ইংল্যান্ডে বসবাসকারী ড. আব্দুল বারী, ফরিদ আহমদ রেজাসহ বেশ কয়েকজন সাবেক প্রভাবশালী নেতা। দেশে এই প্ল্যাটফরমের মূল নেতৃত্ব দিচ্ছেন শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য ও স্যাটেলাইট চ্যানেল দিগন্ত টেলিভিশনের উপ-নির্বাহী পরিচালক মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং জামায়াত ঘরানার আলোচিত আইনজীবী তাজুল ইসলাম।
সম্প্রতি জামায়াতের সর্বোচ্চ কেন্দ্রীয় পর্ষদ মজলিশে শূরা থেকে পদত্যাগ করে এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন সাবেক সচিব এএফএম সোলায়মান চৌধুরী। এছাড়া ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেশ কয়েকজন আলোচিত জামায়াত ও শিবিরের সাবেক নেতা যুক্ত হয়েছেন এই প্রক্রিয়ায়।
এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অনেক রাজনীতিবিদও এখন বলছেন, জামায়াত-শিবিরের মতো সুশৃঙ্খল সংগঠন রাজনীতির মাঠে বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা নেই; বরং নতুন রূপে শক্তি সঞ্চয় করে গোপনে সুসংগঠিত হচ্ছে জামায়াত-শিবির।