প্রতিবেদন

সড়ক নিরাপত্তায় ৬৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন: বিশ্বব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার অতি উচ্চ। প্রতিদিনই দেশের সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে অকালে ঝরছে বহু প্রাণ। ২০১৯ সালে শুধু সড়ক দুর্ঘটনাই ঘটেছে ৪ হাজার ৭০২টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৫ হাজার ২২৭ জন, আহত ৬ হাজার ৯৫৩ জন। সবচেয়ে বেশি ৩০৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়। সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।
সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ক এসব তথ্য জানিয়েছে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। নিসচা জানায়, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ১ হাজার ৫৯৯টি বেশি হয়েছে। ২০১৮ সালে ৩ হাজার ১০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৩৯ জন নিহত ও ৭ হাজার ৪২৫ জন আহত হয়েছিল। আর ২০১৭ সালে ৩ হাজার ৩৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৬৪৫ জন নিহত ও ৭ হাজার ৯০৮ জন আহত হয়েছিল।
নিসচার প্রতিবেদনে বলা হয়, অশিক্ষিত ও অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করা এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ।
নিসচার প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৯ জন বাসচালক ও সহকারী এবং ৭২ জন ট্রাকচালক ও সহকারী মারা গেছেন। এছাড়া ২ হাজার ৬৬১ জন পথচারী মারা গেছেন, যা মোট দুর্ঘটনার ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ। পথচারীরা গাড়ি চাপায়, পেছন দিক থেকে ধাক্কাসহ বিভিন্নভাবে দুর্ঘটনায় পড়েছে। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকা, রাস্তা চলাচল ও পারাপারের সময় মোবাইল ব্যবহার, জেব্রা ক্রসিং, আন্ডারপাস, পদচারী-সেতু ব্যবহার না করা, যত্রতত্র পারাপারের ফলে পথচারীরা দুর্ঘটনায় পড়ছে। বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে বড় শহরের সড়ক ও জাতীয় মহাসড়কগুলোতে।
নিসচার মতো বিশ্বব্যাংকও বলেছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় উচ্চ মৃত্যুহার বিদ্যমান। সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার জন্য বিশ্বব্যাংক পদ্ধতিগত, সুনির্দিষ্ট ও টেকসই সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার চিহ্নিত করতে না পারাকে দায়ী করেছে। এ অবস্থায় দেশের সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুহার অর্ধেকে নামিয়ে আনতে বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দিয়ে বলেছে, আগামী দশকে সড়ক নিরাপত্তায় বাংলাদেশের ৭ লাখ ৮০ কোটি মার্কিন ডলার (৬৬ হাজার ২৯৯ কোটি, ১৯ লাখ ৮ হাজার টাকা) বিনিয়োগের প্রয়োজন।
২০ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাংক ‘রোড সেফটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে। ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি স্টকহোমে ‘সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক তৃতীয় মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন’ উপলক্ষে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক অর্থ সহায়তাকারী সংস্থা, বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংক জানায়, দক্ষিণ এশিয়ার পূর্ব উপ-অঞ্চলে সড়ক নিরাপত্তার ওপর বৃহত্তর গবেষণার অংশ হিসেবে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও নেপালকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে সড়ক ও যানবাহনকে আরো নিরাপদ করতে আঞ্চলিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জাতীয় পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদানের আহ্বান জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট হার্টভিগ শেফার মন্তব্য করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় কয়েক বছর ধরে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে অধিক পরিমাণে যানবাহনের মালিকানা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সড়ক মৃত্যুকে বাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগও নষ্ট করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সড়ক নিরাপত্তা সংকট যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনি তা প্রতিরোধযোগ্যও। সুখবর হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলো এটা মেনে নিয়েছে যে, তাদের জনগণকে রক্ষা করা, জীবন বাঁচানো এবং বৃহত্তর সমৃদ্ধির যাত্রায় টিকে থাকা জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা বিশ্বব্যাংক থেকে তাদের এ প্রচেষ্টায় সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনায় বার্ষিক মাথাপিছু মৃত্যুহার উচ্চ আয়ের তুলনায় দ্বিগুণ এবং সর্বোচ্চ সক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রের তুলনায় ৫ গুণ। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর চতুর্থ সর্বোচ্চ কারণ ছিল সড়ক দুর্ঘটনা। অথচ ১৯৯০ সালে তা ছিল নবমতম কারণ।
প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়, সড়ক অবকাঠামো এমন হওয়া দরকার, যাতে পশু থেকে শুরু করে পথচারী, বাইসাইকেল, রিকশা, মোটরসাইকেল, তিন চাকার মোটরযান, কার, মিনিবাস, বাস, মিনিট্রাক, ট্রাক, কৃষিযানসহ সড়কের সব ধরনের ব্যবহারকারী ও যানবাহনের উপযোগী হয়। এ জন্য বিশুদ্ধ পরিবহনকেন্দ্রিক চিন্তার চেয়ে দরকার মানবকেন্দ্রিক চিন্তা, যাতে সড়কের সঠিক স্থান ও সঠিক পথের ভারসাম্য থাকে। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর মারসি টেমবোন বলেন, বাংলাদেশের জন্য সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়টি হচ্ছে একটি জাতীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকার, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে। তাই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মানবপুঁজির বিয়োগান্ত ক্ষতি কমিয়ে আনতে বাংলাদেশকে অবশ্যই জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, বাংলাদেশে টেকসই সড়ক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ দীর্ঘস্থায়ী করতে হবে। তা না হলে রাস্তায় মৃত্যুহার বাড়তেই থাকবে।
তাছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতি বছর জিডিপির ৩ থেকে ৫ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতি পোষানোর জন্য সড়ক নিরাপত্তায় বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক এই বড় বিনিয়োগ প্রদানে প্রস্তুত।