অর্থনীতি

অবশেষে সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকর হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ব্যতীত সব ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৯ শতাংশ। তবে ঋণটি খেলাপি হলে অতিরিক্ত ২ শতাংশ দ- সুদ আরোপ করতে পারবে ব্যাংকগুলো। এ ছাড়া প্রি-শিপমেন্ট রপ্তানি ঋণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদহার অপরিবর্তিত থাকবে।
২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করা হয়েছে। তবে ঋণের সুদহার বেঁধে দেয়া হলেও ব্যক্তি আমানতের সুদহার নিয়ে সার্কুলারে কিছুই বলা হয়নি।
সার্কুলারে বলা হয়, লক্ষ্য করা গেছে, বর্তমানে ব্যাংকের ঋণের উচ্চ সুদহার দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পসহ ব্যবসা ও সেবা খাতের বিকাশে প্রধান অন্তরায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকের সুদহার উচ্চমাত্রায় হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এতে ঋণগ্রহীতারা যথাসময়ে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলে। ফলে ব্যাংকিং খাতে ঋণশৃঙ্খলা বিঘিœত হয় এবং সার্বিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। এমন প্রেক্ষাপটে ক্রেডিট কার্ড ব্যতীত অন্যান্য সব খাতে অশ্রেণিকৃত ঋণের ওপর সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হলো।
আরো বলা হয়, কোনো ঋণের ওপর ৯ শতাংশ হারে সুদ ধার্য করার পরও যদি সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়, সে ক্ষেত্রে যে সময়কালের জন্য খেলাপি হবে অর্থাৎ মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি কিস্তি এবং চলতি মূলধন ঋণের ক্ষেত্রে মোট খেলাপি ঋণের ওপর সর্বোচ্চ ২ শতাংশ হারে দ- সুদ আরোপ করা যাবে। চলতি বছর থেকে ব্যাংকের মোট ঋণ স্থিতির মধ্যে এসএমইর ম্যানুফ্যাকচারিং খাতসহ শিল্প খাতে দেয়া সব ঋণ স্থিতি পূর্ববর্তী ৩ বছরের চেয়ে কম হতে পারবে না।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ৩০ ডিসেম্বর জানিয়েছিলেন, এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ব্যতীত সব ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৯ এবং আমানতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদহার কার্যকর করা হবে।
ব্যাংক মালিকরা ৯-৬ সুদহার বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন ২০১৮ সালের জুনে। কিন্তু সরকারি ব্যাংক এবং কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক ছাড়া বাকিগুলো ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামায়নি। অথচ ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যাংকের মালিকরা সরকারের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি সুবিধা আদায় করেন। এর মধ্যে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা, বাণিজ্যিক ব্যাংক কর্তৃক কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত নগদ জমা বা সিআরআর সংরক্ষণের হার কমানো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ধারের নীতিনির্ধারণী ব্যবস্থা রেপোর সুদহার কমানো হয়। কিন্তু এসব সুবিধা নিয়েও তারা সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামায়নি। এরপর গত বছরের ১ ডিসেম্বরে কমিটি গঠন করে শুধু উৎপাদনশীল খাতের ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং ১ জানুয়ারি থেকে সেটি বাস্তবায়িত হবে বলে জানানো হয়। কিন্তু শেষ সময়ে এসে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার এবং ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ব্যতীত সব ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খেলাপি ঋণ না কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিট তথা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ হলে এর বড় আঘাতটা আসবে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর। সীমিত আয়ের সঞ্চয়কারীরা ক্ষতির মুখে পড়বেন। কারণ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণের জন্যই আমানতের সুদ ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তাছাড়া এটা করতে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় কমানোর প্রয়োজন হবে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে ব্যাংকভেদে উৎপাদন খাতে সুদহার ১১ থেকে ১৪ শতাংশ। ঋণে ৯ শতাংশ সুদের কথা বলে আমানতকারীদের কাছ থেকে কম সুদে ডিপোজিট নেয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে যাওয়ায় আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছেন। সাধারণ ভোক্তা বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে কার্পণ্য করবে। প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা যারা বারবার খেলাপি হয়ে যায়, তারাই মূলত সিঙ্গেল ডিজিট সুদহারের পুরো সুবিধাটা নেবে।
বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, ক্রেডিট কার্ড ব্যতীত সব ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ হওয়ায় অনেক ব্যাংকের আয় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত কমে যাবে। ৯ শতাংশ সুদ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমানতের সুদও কমিয়ে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে আমানতকারীদের ক্ষতি ছাড়াও মানুষের মাঝে সঞ্চয়ের প্রবণতা অনেকাংশে কমে যাওয়ার কারণে ব্যাংকে তারল্যসংকট প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। আর যেসব ব্যাংক সরকারি আমানত পাবে না, তাদের জন্য ৯ শতাংশ সুদ বাস্তবায়ন করাটা কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) বলছে, সব খাতে ৯ শতাংশ সুদ বাস্তবায়ন করতে হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে ৬ শতাংশ সুদে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকগুলো দিতে হবে। এর সঙ্গে খেলাপি ঋণের মামলা দ্রুত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে হবে।
বিআইবিএমের মতে, ঋণে ৯ শতাংশ সুদ বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতি চাঙা হবে। দেশের শিল্পায়নে অগ্রগতি আসবে। মূল্যস্ফীতিও কমে আসবে। আর মূল্যস্ফীতি যদি কমে আসে, তাহলে আমানতের সুদ কিছুটা কমলেও আমানতকারীদের খুব বেশি ক্ষতি হবে না। তবে ব্যাংকের আয় কিছুটা কমে যাবে। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ২০১৮ সালের জুলাই থেকেই ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জন্যও আগামী ১ এপ্রিল থেকে এটি কার্যকর হবে। এটি কার্যকর করতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধাও দেয়া হয়েছে। এটি কার্যকর হলে ব্যাংকের মুনাফা কিছুটা কমলেও দেশের সাধারণ মানুষ ও দেশের অর্থনীতির উপকার হবে।