কলাম

এই লেখার পেছনে কোনো স্বার্থ নেই, দুশ্চিন্তা আছে

অধ্যাপক আবদুল মান্নান
বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও সাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ুন আজাদের একটি কবিতার শিরোনাম ছিল ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’। তিনি ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমি বইমেলা প্রাঙ্গণে জঙ্গিবাদী ঘাতকদের অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসারত অবস্থায় জার্মানির মিউনিখ শহরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। বেঁচে থাকলে বর্তমানে চারদিকে ঘটে যাওয়া পরিস্থিতি দেখে তিনি হয়ত লিখতেন ‘সবকিছু নষ্টদের দখলে চলে যাচ্ছে’।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পরপর ৩ বার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এমনটি হলে একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য ভালো। ধারাবাহিকতা থাকে। তবে তার জন্য চাই সরকারের কর্মকা-ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রজ্ঞা, সরকারের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য আর সরকারপ্রধানকে নিঃস্বার্থ সহায়তা প্রদান।
বাংলাদেশের ভাগ্য ভালো, বর্তমানে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারসহ মোট ৪ বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রায়শ বলে থাকেন তার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। তিনি নিজেকে দেশ ও জনগণের সেবায় উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে তিনি যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন, বেশিরভাগ সময় সেই লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য সরকারের কিছু মানুষ ঠিক উল্টো কাজ করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিনয়ে ক্ষমা চেয়ে বলছি, দল করেন না বা দলকানা নন কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা হিসেবে তাকে ভালোবাসেন, তার সাফল্য দেখলে গর্বিত হন, এককথায় তার নিঃস্বার্থ হিতাকাক্সক্ষী, তারা মনে করেন তাঁর অগোচরে অনেক কিছু ঘটে, যা সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর জন্য প্রায়শ বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
একজন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে দেশের সবকিছু খোঁজ রাখা সম্ভব নয়। তার জন্য আছে তাঁর মন্ত্রিসভা, আছে সরকারি আমলা আর আছেন দলের নেতৃবৃন্দ। তাদের ওপরই তাঁকে নির্ভর করতে হয়। বর্তমানে অনেকের ধারণা, তারা প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ বা সিদ্ধান্ত দেন না বা দেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। তাঁর চারপাশের মানুষরা, যাদের অনেকেই চাটুকার ও স্তাবকের ভূমিকায় আছেন, তারা তাঁকে জনগণ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চেষ্টা করছেন। বঙ্গবন্ধুকেও শেষের দিকে এমন অবস্থায় পড়তে হয়েছিল। তাতে একটি জাতীয় দুর্যোগ সৃষ্টি হয়েছিল।
একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক বাংলাদেশের বেসামরিক পর্যায়ে দেয়া অত্যন্ত সম্মানজনক পদক। দেয়া হয় সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তাদের। স্বাধীনতা পদক তো দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক। প্রধানমন্ত্রী নিজে এই দুটি পদক দিয়ে থাকেন। কারা এই পদকে ভূষিত হবেন তা বাছাই করার জন্য শক্তিশালী কমিটি আছে। বিভিন্ন সময় এই পদক নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, তবে এবারের মতো নয়। প্রথম সমালোচনাটি হয়েছিল যখন জেনারেল জিয়া একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ দোসর শর্ষিনার পীর সাহেবকে ১৯৮০ সালে শিক্ষায় অবদান রাখার জন্য স্বাধীনতা পদক দেন। এরপর বুয়েটের একজন উপাচার্যকে একুশে পদকের জন্য বাছাই করে তারপর তা বাতিল করে সরকার সমালোচনার মুখোমুখি হয়। তখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাসীন (১৯৯৬-২০০১)। বেগম জিয়ার শাসনামলে (২০০১-০৬) হঠাৎ তার সরকার ঘোষণা করল বঙ্গবন্ধু আর জিয়াকে স্বাধীনতা পদক দেবে। এটি ছিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জিয়াকে সমান কাতারে ফেলার একটি কূটকৌশল মাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন একজন শিক্ষককে বাংলা একাডেমি পদকের জন্য বাছাই করা হয়েছিল, যিনি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে যাওয়াতে আক্ষেপ করে কলাম লিখেছিলেন। সেটি ঘটেছিল বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে।
এই বছর একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে তা নিশ্চয় গণমাধ্যমের বদৌলতে প্রধানমন্ত্রী জেনে থাকবেন। যে দিন একুশে পদকপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হলো সেদিন রাতে আমাকে একজন ফোন করে জানতে চান, পদক পেতে কত টাকা লাগে এবং কাকে দিতে হয়। প্রশ্ন শুনে আমি তো অবাক! এই বছর বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘অবদান’ রাখার জন্য ২০ জনকে একুশে পদক দেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকজন বাদ দিলে বাকিরা কী মাপকাঠিতে এই পদকে ভূষিত হলেন Ñ এমন প্রশ্ন করছেন অনেকেই, যাদের বেশিরভাগই শেখ হাসিনার হিতাকাক্সক্ষী।
স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তদের নাম ঘোষিত হওয়ার পর আবারও কিছু বিজয়ীর নাম নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সংবেদনশীল এবং শেখ হাসিনার নিঃস্বার্থ সমর্থক অনেকে মন্তব্য করেছেন, এসব কীর্তির প্রধান উদ্দেশ্য শেখ হাসিনা ও তার সরকারের সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। একজন তো বলেই ফেললেন যে, এসব কর্মকা- হতে পারে অন্তর্ঘাতমূলক, যা হয়ত প্রধানমন্ত্রীর অগোচরে ঘটছে। সবকিছু তো একজন শেখ হাসিনার পক্ষে সামাল দেয়া সম্ভব নয়। তিনি যাদের ওপর আস্থা রেখেছেন, তারা তাকে খুব সহায়তা করছেন বলে মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রী যদি তার প্রকৃত হিতাকাক্সক্ষীদের কথা একান্তে শুনতে পারতেন, তাহলে বুঝতে পারতেন সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা তাদের কতটুকু বিচলিত করে।
কয়েক দিন আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য একজনের নাম ঘোষিত হয়েছে। তাকে যেহেতু আমি চিনি, সেহেতু বলতে পারি তার যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু বাংলাদেশে যে কোনো নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি নয়। নির্বাচনে বিজয়ী হতে আরো অনেক ফ্যাক্টর কাজ করে। চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত ও জননন্দিত নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে কমপক্ষে দীর্ঘ তিন দশক রাজপথে হেঁটেছি। তার প্রতিটি নির্বাচনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকেছি। তিনি আমাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন। তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে আমাকে সম্পৃক্ত করেছেন। সেই জননন্দিত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ২০১০ সালের মেয়র নির্বাচনে যখন একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর মঞ্জুরুল আলম মঞ্জুর কাছে প্রায় ১ লাখ ভোটে হেরে গেলেন, তখন অনেকের মতো আমিও স্তম্ভিত হয়েছিলাম। এই মঞ্জুরুল আলম ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরীর অত্যন্ত আস্থাভাজন, আজীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, কিন্তু রাজনীতিতে তেমন একটা পরিপক্ব ছিলেন না। ভোট শেষে যখন ভোট গণনা চলছিল, তখন মহিউদ্দিন চৌধুরীর নির্বাচনি ক্যাম্পে নেতাকর্মীদের ভিড় সামলানো কঠিন ছিল। রাত ১২টা নাগাদ আমিসহ আরো দু-একজন কর্মী অবশিষ্ট ছিলাম। বাকিরা নীরবে সটকে পড়েছিল। ২০১৫ সালের মেয়র নির্বাচনে সেই একই মঞ্জুরুল আলম মঞ্জুকে বর্তমান মেয়র আ জ ম নাসির হারিয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে উনিশ জন কাউন্সিলর মনোনয়ন পাননি। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ১২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। আরো নাকি করবেন। এটি দলের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।
এতসব কা-কীর্তির রেশ না কাটতেই হঠাৎ সামনে চলে এলো আওয়ামী যুব মহিলা লীগের নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার অভূতপূর্ব গণিকালয়ের নানা কথা। তার স্বামী মফিজুর রহমান সুমন একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল।
পাপিয়াকা- সিনেমার কাহিনিকেও হার মানায়। যুব মহিলা লীগ দ্রুত তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই পাপিয়ারা কী উপায়ে, কেমন করে, কাদের সুপারিশে যুব মহিলা লীগের সদস্য হয়? তার এই নারী ব্যবসার খদ্দের কারা ছিল? তাদের নাম কি প্রকাশিত হবে? এ ঘটনায় তো বদনাম হলো আওয়ামী লীগের। এর দায় কে নেবে?
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, পাপিয়াকে আটক প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্সের বহিঃপ্রকাশ। মানুষ তা-ই বিশ্বাস করতে চায়। কারণ, দেশের মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের যত অশুদ্ধতা, তা একমাত্র শেখ হাসিনাই দূর করতে পারবেন।
উল্লেখিত বিষয়াবলি ছাড়াও আরো অনেক অপকর্ম আছে, যা হয়ত প্রধানমন্ত্রীর অগোচরে সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ধারণা, সবকিছু প্রধানমন্ত্রী জানেন, যা বাস্তবে সত্য নয় বলে আমার ধারণা।
প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি দুটি বিষয়ে পৃথকভাবে দুটি বক্তব্য রেখেছেন। প্রথমটি ছিল ‘আওয়ামী লীগে যদি এত নেতাকর্মীই থাকে, তাহলে ১৫ আগস্ট আমার বাবার লাশ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ৩০ ঘণ্টা কেন পড়ে ছিল?’ আর দ্বিতীয়টি করেছেন সম্প্রতি মহান একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে দলীয় অনুষ্ঠানে। তিনি বলেছেন, ‘আমার মা যাদের রান্না করে খাওয়াতেন, তারাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে।’ বক্তব্য দুটি খুবই প্রণিধানযোগ্য। শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, ‘আমাকে ছাড়া সবাইকে কেনা যায়।’ ঘটনাপরম্পরায় মনে হচ্ছে তার এই বক্তব্য শতভাগ সত্য। বঙ্গবন্ধু ঘরের শত্রু চিনতে পারেননি। শেখ হাসিনার একজন সামান্য হিতাকাক্সক্ষী হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছে এটি একটি সামান্য নিবেদন, তিনি যেন একই ভুল না করেন।
এই লেখার পেছনে কোনো স্বার্থ নেই, দুশ্চিন্তা আছে। আল্লাহ শেখ হাসিনার মঙ্গল করুন।
লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক