কলাম

যে ক্ষত কোনো দিন শুকাবে না

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)
বছর ঘুরে আবার ২৫ ফেব্রুয়ারি এলো। ২০০৯ সালের এই দিনে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদর দপ্তর ঢাকার পিলখানায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের কলঙ্ক থেকে আজও আমরা পরিপূর্ণভাবে মুক্ত হতে পারিনি। আদৌ কোনো দিন মুক্ত হতে পারব কি না, সে প্রশ্নও মনে জাগে।
ওই ঘটনার বিচার এখন শেষ পর্যায়ে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পেন্ডিং। বিচারিক আদালত মামলার রায় দেন ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর। আর হাইকোর্ট রায় প্রদান করেন ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর, তাতে ১৩৯ জনের মৃত্যুদ- বহাল থাকে এবং ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন ও ২০০ জনের মেয়াদি শাস্তি দেয়া হয়। একটি মামলায় এতসংখ্যক আসামি ও সাক্ষীর সংশ্লিষ্টতা বোধ হয় বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। সেই বিচারে বলা যায়, অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে হাইকোর্ট পর্যন্ত বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। আশা করা যায়, আপিল বিভাগ স্বল্প সময়ের মধ্যে শুনানি সম্পন্ন করে চূড়ান্ত রায় দেবেন। দ-প্রাপ্তদের দ-ও হয়ত যথাযথভাবে দ্রুত কার্যকর করা হবে। কিন্তু তাতে কি সব প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে যাবে?
তা যে হবে না, সেটি উঠে এসেছে হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কোনো রকম ষড়যন্ত্র ছাড়া এত বড় হত্যাকা- ঘটতে পারে না। সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকা-ের মাধ্যমে সরকারকে বিপদে ফেলা এবং রাজনৈতিক সংকট তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল।
পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তায় বিঘœ সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই ষড়যন্ত্র করে। মামলার তদন্তে এবং আদালতের রায়ে ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করা হয়নি বা যায়নি। এতে ষড়যন্ত্রকারীরা অর্থাৎ মূল হোতারাই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেল।
নেপথ্যের খলনায়করা সব সময় বিচারের বাইরে থাকে বলেই ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং তার ক্রসফায়ারে পড়ে অকালে প্রাণ হারায় কিছু হতভাগ্য মানুষ। সন্তানহারা হন মা, বিধবা হন নারী এবং এতিম হয় অনাগত স্বপ্নে ভরা কিছু নিষ্পাপ ছেলে-মেয়ে।
একটু ফিরে দেখি, কেমন পরিস্থিতিতে কী ঘটেছিল সেদিন পিলখানায়।
সেগুনবাগিচায় অবস্থিত একটি প্রাইভেট সংস্থায় আমি আমার কার্যালয়ে পৌঁছে সবেমাত্র কাজ শুরু করেছি। সকাল সাড়ে ৯টা হবে। হঠাৎ মোবাইলে ফোন আসে। অপর প্রান্তে একজন মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত মেজর, যিনি নিজস্ব ঠিকাদারির কিছু কাজ সম্পাদনের জন্য ওই দিন খুব সকালেই পিলখানায় গিয়েছিলেন। মোবাইল কানে ধরতেই শুনি, হাঁপাতে হাঁপাতে মেজর সাহেব বলছেন, ‘সর্বনাশ! পিলখানার ভেতরে গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে, পরিস্থিতি ভীষণ বিপজ্জনক, আমি দৌড়ে মূল গেটের বাইরে চলে এসেছি।’ আমি কিছুটা অবিশ্বাসের সুরে এবং হতভম্ব হয়ে বলি, ‘আপনি এসব কী বলছেন, আজ তো দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর পিলখানায় যাওয়ার কথা।’ তিনি কথা না বাড়িয়ে খবর নিতে বলে টেলিফোন কেটে দিলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে কনফারেন্স রুমে গিয়ে টেলিভিশন অন করে দেখি, দুটি চ্যানেল পিলখানা থেকে সরাসরি ঘটনার বৃত্তান্ত প্রচার করছে। এতে বিদ্রোহী জোয়ানদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ প্রদর্শিত এবং কথাবার্তা প্রচারিত হচ্ছে।
নিজের সামান্য স্মৃতি তুলে ধরলাম মূলত দুটি কারণে। প্রথমত এতে বোঝা যায় গোলাগুলি শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত পিলখানার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে ছিল খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সব কিছু জানার পর তো সবাই বুঝতে পারছেন, ওই স্বাভাবিকতাই ছিল সবচেয়ে অস্বাভাবিক ঘটনা। এত বড় একটি ষড়যন্ত্র, বাহিনীর এতসংখ্যক লোক জড়িত, অথচ গোলাগুলি শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ কিছু জানতে বা আঁচ করতে পারল না Ñ এটি কি অস্বাভাবিক নয়? আগের দিন ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী পিলখানায় গিয়েছিলেন, ২৫ তারিখে দুপুরেও যাওয়ার কথা ছিল। রাষ্ট্রের সব গোয়েন্দা সংস্থারও কয়েক দিন আগে থেকেই সব এলাকাকে নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে ফেলার কথা, একটি পাতা নড়লেও টের পাওয়ার কথা।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণেও গোয়েন্দা ব্যর্থতার কথা এসেছে। কিন্তু এটি কি শুধুই ব্যর্থতা, নাকি অন্য কিছু? দেশের মানুষ হিসেবে আমরা কিছুই জানি না। কারণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত গোয়েন্দা ও কর্মকর্তা Ñ কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার কথা আমরা শুনিনি।
আমার মনে দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি জেগেছে তা হলো, গোলাগুলি শুরু হওয়ার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের ভেতর দুটি চ্যানেল কী করে সরাসরি সম্প্রচার শুরু করতে সক্ষম হলো; যার মাধ্যমে বিদ্রোহী জোয়ানদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ একতরফা অভিযোগপূর্ণ কথাবার্তা ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে! এই প্রচারের কারণে প্রথম দিকে সাধারণ মানুষের কিছুটা সহানুভূতিও জোয়ানদের দিকে চলে গিয়েছিল। কেন গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং কিভাবে দুটি চ্যানেল কর্তৃক এত দ্রুত সরাসরি সম্প্রচার সম্ভব Ñ এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর হয়তো কোনো দিন পাওয়া যাবে না।
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে এর সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের সম্পর্কে আমরা জেনেছি এবং পর্যবেক্ষণে ষড়যন্ত্রের কথা আদালত উল্লেখ করেছেন, যদিও সেই ষড়যন্ত্রকারী কারা তা আদালত বলেননি। সুতরাং এটি নিয়ে প্রপাগান্ডা, অপপ্রচার যেমন চলছে, তেমনি বহু কর্নার থেকে বিচার-বিশ্লেষণও অব্যাহত আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামত হচ্ছে, মূল ষড়যন্ত্রকারীদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল একটি সামরিক-বেসামরিক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে ৫০ দিনের নতুন সরকারকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দেয়া। অন্য আরেকটি মত হচ্ছে, ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়া।
যেকোনো কাজের একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে। পথিমধ্যে যা কিছু করা হয়, তা ওই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পন্থা মাত্র অথবা বলা যায় মধ্যবর্তী লক্ষ্য। ওই সময়ে এবং এখনো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক এবং বিশ্ব রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের বাস্তবতায় আমাদের প্রতিরক্ষাশক্তিকে দুর্বল করে কোন দেশের কোন দিক থেকে কতটুকু কী লাভ হওয়ার আছে বা তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী হতে পারে।
সামরিক ইতিহাসে দেখা যায়, বিবদমান রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান থাকলে অথবা অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধের আশঙ্কা থাকলে একে অপরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করার জন্য বিপরীত পক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ এবং ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমে শত্রু দেশের সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে থাকে। এসব ক্ষেত্রেও সেনা পরিবার ও তাদের বাসস্থানে আক্রমণের ঘটনা ইতিহাসে নেই। অতীতে এবং বর্তমানে বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের এমন কোনো অবনতি হয়নি, যার জন্য বিদেশি কোনো রাষ্ট্র তাদের সামরিক অভিযানের সুবিধার্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার লক্ষ্যে এই আক্রমণ চালাতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার জন্য বিদেশি কোনো পক্ষ ষড়যন্ত্র করেছে Ñ এ কথার কোনো ভিত্তি নেই।
১৯৭৫ সালের পর যারা সেনাবাহিনীকে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত করেছে এবং সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছে, তাদের বর্তমান প্রতিভূরাই মূলত উপরোক্ত প্রপাগান্ডার সঙ্গে জড়িত। তাই এ ঘটনা যারাই ঘটিয়ে থাকুক না কেন, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল সরকারকে এমন একটি চরম ক্রাইসিসে ফেলে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করা, যার ফলে ৫০ দিনের ক্ষমতাসীন সরকার চরম অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যায়।
ওই সময়ে এমনটি কারা চাইতে পারে, কেন এবং কী লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা এ কাজ করতে পারে? মামলার তদন্তে এবং আদালতের রায়ে যেহেতু কোনো পক্ষের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তাই আমরাও সুনির্দিষ্টভাবে কোনো পক্ষের দিকে আঙুল ওঠাতে পারছি না। তবে বিচার-বিশ্লেষণ ও যুক্তিবাদ তো সমাজ-রাষ্ট্র থেকে উঠে যায়নি!
অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ৭ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার তখন সবেমাত্র ক্ষমতায় এসেছে। তারা জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় এসেছে যে তারা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন করবে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সংঘটিত গ্রেনেড হামলার বিচার করবে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহীদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জায়গা দেয়া হবে না। শত বাধা পেরিয়ে গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার এই কাজগুলো করেছে। সুতরাং আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করায় ওই অপকর্মকারী পক্ষগুলো অস্তিত্বসংকটের চিন্তায় পড়বে, সেটিই স্বাভাবিক। অপকর্মকারীরা যখন বুঝতে পারে কৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত থেকে রক্ষা পাওয়ার বৈধ আইনি পথ নেই তখন তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সামান্য কোনো সুযোগ পেলে সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিতে তারা দ্বিধা বোধ করে না।
বহুদিন ধরে পিলখানার ভেতরে সৈনিকদের মধ্যে নানা কারণে চরম একটি অসন্তোষ বিরাজমান ছিল, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সেটিকেই ওই অপকর্মকারীরা সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। সঙ্গত কারণেই মাঝামাঝি বলতে আর কিছু থাকে না। কারা টিকে থাকবে আর কারা থাকবে না Ñ সেটিই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
একটি পক্ষ থেকে এখনো অযৌক্তিক অপপ্রচার চালানো হয় এই মর্মে যে ২৫ ফেব্রুয়ারি গোলাগুলি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক অভিযান চালালে নাকি ক্ষয়ক্ষতির পরিধি কম হতো। এই ‘সঙ্গে সঙ্গে’ বলতে তারা কত সময় বোঝে জানি না। তবে পরিপূর্ণ শান্তিকালে হঠাৎ করে একটি বড় সেনাদলের যুদ্ধের অস্ত্র-গোলাবারুদ-সরঞ্জামাদি নিয়ে সব কিছুর সমন্বয় সাধনপূর্বক প্রস্তুত হওয়ার একটি স্ট্যান্ডার্ড সময় আছে। তদন্ত প্রতিবেদন এবং বেঁচে থাকা কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, সকালে একেবারে ঘটনার শুরুতেই মহাপরিচালকসহ বেশির ভাগ কর্মকর্তাকে তারা হত্যা করে। এটি তো এখন স্পষ্ট যে সামনে থেকে যারা অস্ত্র ব্যবহার করেছে তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে। তাই কৌশলে প্রথম ধাক্কায় বেশির ভাগ কর্মকর্তাকে হত্যা করিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা বিদ্রোহী সেনাদের হাতের পুতুল বানিয়ে ফেলে। প্রত্যক্ষ অস্ত্রধারীদের পেছনে ফেরার আর কোনো পথ থাকে না। শুধু কিছু দাবিদাওয়া আদায়ের ব্যাপার হলে তারা কিছুতেই প্রথম ধাক্কায় মহাপরিচালকসহ বেশির ভাগ কর্মকর্তাকে হত্যা করত না, বড়জোর কর্মকর্তাদের জিম্মি করে দর-কষাকষির পথ বেছে নিত। প্রথম ধাক্কায় বেশির ভাগ কর্মকর্তাকে হত্যা করতে পেরে সরকারের প্রতিক্রিয়ার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা অপেক্ষা করতে থাকে, যাতে পরবর্তী সময়ে যা ঘটবে তার সব দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে সরকারের ওপর পড়ে।
এই পরিপ্রেক্ষিতেই বুঝতে হবে, যারা বলছে ২৫ ফেব্রুয়ারির শুরুতেই সামরিক অভিযান চালালে ক্ষয়ক্ষতি কম হতো, তা যুক্তিতে টেকে না। ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের পরিকল্পনা অনুসারে সেনা অভিযান শুরুর অপেক্ষায় ছিল। সেনা অভিযান শুরু হলে হত্যাযজ্ঞের পরিধি বৃদ্ধি করার জন্য পিলখানার ভেতরে জীবিত বাকি কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারগুলোকে দ্রুত হত্যা করার সমূহ আশঙ্কা ছিল। তাদের কাছে রক্ষিত হেভি মর্টার ও মেশিনগানের মাধ্যমে পিলখানার চারদিকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এলোপাতাড়ি ফায়ারিং করে বেসামরিক এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাতে পারত। ঢাকার বাইরে ৪৬টি বিডিআর ব্যাটালিয়ন এবং ১২টি সেক্টরে ষড়যন্ত্রকারীদের নির্দিষ্ট লোক ছিল, যাদের দ্বারা ওই সব স্থানে কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা শুরুও হয়ে গিয়েছিল। তাই পিলখানায় সেনা অভিযান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে দেশব্যাপী ব্যাটালিয়ন ও সেক্টর সদর দপ্তরে চিহ্নিত জোয়ানদের দ্বারা স্থানীয় কর্মকর্তা এবং বেসামরিক প্রশাসনের ওপর বেপরোয়া আক্রমণ চালানোর ব্যাপক আশঙ্কা ছিল। এ রকম পরিস্থিতিতে যদি সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারসহ কয়েক হাজার বেসামরিক লোক হতাহত হতো, তাহলে দেশের অবস্থা কী হতে পারত তা অনুমান করা কঠিন নয়। উপরন্তু দেশব্যাপী বিডিআর ও সেনাবাহিনীর মধ্যে একটি অনিয়ন্ত্রিত গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। বিপন্ন হতো গণতন্ত্র। লাভবান হতো ষড়যন্ত্রকারীরা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে ষড়যন্ত্রকারীরা সে পথে গেল না কেন? এর সম্ভাব্য উত্তর, ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সরকার উচ্ছেদের উপাদান হিসেবে এ ধরনের একটি হত্যাযজ্ঞের দায়দায়িত্ব সরাসরি সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপাতে চেয়েছিল। কিন্তু সরকারের ধৈর্য ও কৌশলের কাছে তারা পরাজিত হয়েছে। ২৫ ফেব্রুয়ারির ঘটনা সবার জন্য নিঃসন্দেহে ছিল অপ্রত্যাশিত ও অভাবনীয়।
এ রকম ঘটনায় যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারের উদ্দেশ্য থাকে যত কম ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে সংকট কাটিয়ে ওঠা যায় সে মোতাবেক সিদ্ধান্ত নেয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রজ্ঞাবান কৌশলের কারণে সেটি সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসীম ধৈর্য, বিচক্ষণতা, রাজনৈতিক সৎসাহস, দৃঢ়চেতা মনোবল এবং মানবিক চেতনাই শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করেছে, যে কথা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণেও এসেছে।
ঘটনার ১১ বছর পর আমরা অবশ্যই বলতে পারি, ২০০৯ সালের ন্যক্কারজনক ঘটনাকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজিয়ে পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠন করা হয়েছে বাহিনীকে। বিডিআর থেকে নতুন নাম হয়েছে বিজিবি। পতাকার পরিবর্তন হয়েছে। চেইন অব কমান্ডকে শক্তিশালী করা হয়েছে। আশা করা যায়, এমন নৃশংস ঘটনা আর কোনো দিন ঘটবে না। ৫৭ জন কর্মকর্তাসহ যাঁরা জীবন হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবার প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্র ও সমাজের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহানুভূতি ও সমর্থন পেয়েছে।
কিন্তু তার পরও কথা থেকে যায়। বিনা অপরাধে শান্তিকালীন এতজন কর্মকর্তা যেভাবে নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার হলেন, তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি দেশের সীমানা ছেড়ে দুনিয়ার মর্মন্তুদ খবরের শিরোনাম হয় বাংলাদেশ। এত দিনে অনেক কিছু বদলে গেছে। আগামী দিনে হয়তো আরো অনেক কিছু বদলে যাবে। কিন্তু সেদিনের সেই কান্না, হাহাকার এবং দুঃসহ বেদনার ক্ষত থেকে আমরা হয়তো কোনো দিন মুক্ত হতে পারব না। এই ক্ষত শুকানোর নয়, কোনো দিন শুকাবে না।
লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক