রাজনীতি

খালেদা জিয়ার কারামুক্তিতে দীর্ঘসূত্রতা: হতাশ বিএনপির নেতাকর্মীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘসূত্রতার ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে গেছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তি। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া যখন কারাবন্দি হন, তখন দল ও দলের বাইরের সাধারণ মানুষও ভেবেছিল, খুব শিগগিরই জামিনে মুক্ত হচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। কিন্তু দিনের পর মাস, মাস পেরিয়ে বছর, আর বছর পেরিয়ে এখন ২ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল Ñ এখনও কারামুক্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট সম্ভাবনাও দেখছে না বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। এ নিয়ে চরম হতাশ বিএনপির নেতাকর্মী ও খালেদা পরিবারের সদস্যরা। এজন্য তারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ আনছেন। সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব খালেদা জিয়ার মুক্তিপ্রশ্নে জোরালো কোনো আন্দোলন করছে না বলেও তাদের অভিযোগ রয়েছে। তারা বলছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় বারবার চেষ্টা করেও জামিন লাভে ব্যর্থ হওয়ার পরও সক্রিয় আন্দোলনের দিকে না যাওয়া বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নতজানু মনোভাবের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এ কারণে তারা দলের শীর্ষ নেতাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেও অভিহিত করছেন।
জানা গেছে, হাইকোর্ট জামিনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেও এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগের পাশাপাশি প্যারোল (বিশেষ ব্যবস্থায় সাময়িক মুক্তি) ও ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী সরকারের বিশেষ বিবেচনায় দ- স্থগিত করে খালেদা জিয়ার মুক্তির পথ খোলা রয়েছে। তবে বিএনপির চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা জানান, তারা কোন পথে যাবেন তা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার করা দ্বিতীয় দফা জামিনের আবেদনটি গত ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রত্যাখ্যান করে হাইকোর্ট। বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে চেয়ে করা জামিনের আবেদনটিতে ‘কোনো সারবত্তা নেই’ জানিয়ে শুনানি শেষে তা প্রত্যাখ্যান করে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা দুটি মামলায় ১৭ বছরের কারাদ-প্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন গত বছরের এপ্রিল থেকে কারা কর্তৃপক্ষের অধীনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আদেশে হাইকোর্ট বলেছে, খালেদা জিয়া যদি মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যাডভান্সড ট্রিটমেন্ট (উন্নত চিকিৎসা) নিতে সম্মতি দেন তাহলে দ্রুত তার উন্নত চিকিৎসা শুরু করতে হবে। এছাড়া উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে মেডিক্যাল বোর্ড চাইলে নতুন কোনো বিশেষজ্ঞকেও অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে বলে আদেশ দিয়েছে আদালত।
বিএনপি চেয়ারপারসনের কারামুক্তি প্রশ্নে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়েই পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন চলছিল। হাইকোর্টে জামিনের জন্য আরেক দফা আবেদন উঠলে বিএনপির তৃণমূলের অনেকেই ভেবেছিল, সরকারের গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই হয়ত জামিনের আবেদনটি হাইকোর্টে ওঠানো হয়েছে। কিন্তু ২৭ ফেব্রুয়ারি জামিন আবেদনটি খারিজ হয়ে যাওয়ায় বিএনপির তৃণমূল সব দোষ দিতে থাকে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর। তারা বলতে থাকে, খালেদা জিয়ার মুক্তিপ্রশ্নে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব সরকারের সঙ্গে আসলে কোনো আলোচনাই করেনি। তারা যা বলছে, তা হঠকারিতা।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, দলের নেতারা গত ২ বছরেও কি বুঝেননি যে, সরকারের সাথে সমঝোতা ছাড়া আন্দোলন বা আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার কারামুক্তি সম্ভব নয়! এতদিনে পরিষ্কার বোঝার পরও কেন বিএনপি নেতৃত্ব সরকারের সাথে কার্যকর কোনো আলোচনা-সমঝোতা না করেই দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন?
সর্বশেষ আদালত থেকে শূন্য হাতে ফেরার পর দলের তৃণমূলের প্রশ্ন হলো সরকারের সাথে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সমঝোতা ছাড়া বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব কেন এবং কিভাবে দলের চেয়ারপারসনকে জেলে রেখে জাতীয় নির্বাচন, উপনির্বাচন ও সিটি নির্বাচনসহ সকল নির্বাচনে একর পর এক অংশগ্রহণ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকারকে অব্যাহতভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন? তারা বলছেন, সরকারের সাথে বিএনপির যদি ন্যূনতম কোনো সমঝোতা না থাকে তাহলে কেন বিএনপি বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সকল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে বৈধতা দিয়ে চলেছে? কেন বিএনপি এখনও সংসদ থেকে এক দফা এক দাবিতে পদত্যাগ করছে না, কেন-ই-বা তারা সরকার পতনের মতো কঠোর আন্দোলন কর্মসূচির ডাক দিচ্ছেন না?
তাছাড়া বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব খালেদা জিয়ার কারামুক্তির প্রশ্নে সরকারের অনুকম্পা চাইলে তা-ও তো পরিষ্কার করতে হবে এবং এ বিষয়ে সরকারের সাথে আলোচনা করে সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব মুখে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির কথা বললেও কার্যত এক্ষেত্রে তারা কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করছেন বলে দৃশ্যমান হচ্ছে না। বিএনপির তৃণমূলের জনৈক নেতা এ প্রসঙ্গে স্বদেশ খবরকে বলেন, যেহেতু যে কারণেই হোক আমরা আইনি প্রক্রিয়া বা কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করতে পারছি না সেহেতু আমাদের উচিত ছিল সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে কৌশলে দলের নেত্রীকে মুক্ত করা। কিন্তু বিগত ২ বছরে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব অনেক বড় বড় কথা বললেও কার্যত তারা নিজেরাই খালেদা জিয়ার কারামুক্তির বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক নয় বলেই মনে করছেন দলের তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী।
একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির বিষয়টি এখন রাজনৈতিক ‘সমঝোতা’ ও রাজনৈতিক ময়দানের সিদ্ধান্তের বিষয় বলেও খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা মনে করেন। তারা মনে করেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ ব্যবস্থায় কারামুক্তির বিষয়টি তার পরিবারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তার কারামুক্তি প্রশ্নে এই মুহূর্তে আইন অঙ্গনে করার তেমন কিছুই নেই। এটি এখন রাজনৈতিক ময়দানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সেটি সরকারের ইচ্ছানুযায়ী প্যারোল বা দ- স্থগিতের মাধ্যমে হতে পারে।