প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য : তপন কুমার ঘোষ : নিরক্ষরতামুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো

বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রের চিরচেনা দৃশ্যপটও। নানামুখী কার্যক্রমের ফলে প্রতি বছর বাড়ছে সাক্ষরতার হার। ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরক্ষতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছেন। সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হয়ে এখন তারা সমাজে কার্যকর নাগরিক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারছেন। শুধু প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে এই পরিবর্তন ঘটানো কোনোভাবেই সম্ভব হতো না বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। তারা এর জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর বহুমুখী কর্মযজ্ঞকে বিশেষভাবে কৃতিত্ব দেন। অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো সত্যিই অসাধারণ কাজ করেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব আনুযায়ী, দেশে সাক্ষরতার হার ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, ২০১৮ সালে যা ছিলো ৭২.৯ শতাংশ।
অবশ্য এই অর্জনকে ইতিবাচক উল্লেখ করলেও খুব উচ্ছ্বসিত নন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব তপন কুমার ঘোষ। তার প্রত্যাশা, সাক্ষরতার হার শতভাগ কিংবা তার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া।
জানতে চাইলে তপন কুমার ঘোষ স্বদেশ খবরকে বলেন, সাক্ষরতার হার বাড়ছে, এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দেরও। তবে আমরা এখানে থামতে চাই না। সত্যি বলতে, এই পথ এখানে শেষ হওয়ার নয়। আমাদের লক্ষ্য শতভাগ সাক্ষরতা এবং সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা ‘দেশে কেউ নিরক্ষর থাকবে না’, সে জন্য যা যা দরকার সবই করা হবে। আমরা সরকারপ্রধানের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এক প্রশ্নের জবাবে সংস্থার ডিজি তপন কুমার ঘোষ বলেন, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সামগ্রিক কার্যক্রম সার্বক্ষণিক তদারকির পাশাপাশি যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়ে সহায়তা করে আসছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কী:
সবার জন্য শিক্ষা, সাংবিধানিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার মতো নয়। শুধু প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থায় নিরক্ষরতামুক্ত দেশ গড়া সম্ভব নয়। তাই সরকার জোর দিয়েছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায়, যা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। এটি মূলত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে পরিচালিত শিক্ষাদান কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের সুবিধাজনক কোনো জায়গায় এই কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ করেন দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ। যে কেউ অংশগ্রহণ করতে পারেন। নিরক্ষর মানুষকে অক্ষর, লেখাপাঠ, গণনা, হিসাব, মনের ভাব লিখন প্রভৃতি মৌলিক বিষয় শেখানো হয়। শেখানো হয় সমাজ, পরিবেশ ও বিজ্ঞান সম্পর্কে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ এ প্রসঙ্গে স্বদেশ খবরকে বলেন, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সবার জন্য উন্মুক্ত। এ শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ের পাঠবঞ্চিতদের জন্য নয়, যারা দারিদ্র্য ও অন্যান্য কারণে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে বা ছাড়তে বাধ্য হয় তাদের জন্যও। সবার জন্য সাম্যের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলে এ শিক্ষা কার্যক্রম। কোনো টাকা-পয়সার প্রয়োজন হয় না, যে কেউ এখানে এসে সাক্ষরজ্ঞান অর্জনসহ নানা বিষয় শিখতে পারে। শিক্ষা মানুষের ন্যায়সঙ্গত নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার, সেই অধিকার পূরণে এই শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। আর সে কারণেই সাক্ষরতার হার বাড়ছে প্রতি বছর।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ স্বদেশ খবরকে বলেন, সরকার উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সাব-সেক্টরকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন-২০১৪ পাস করেছে। আইনটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরজ্ঞানদান, জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, আত্ম-কর্মসংস্থানের যোগ্যতা সৃষ্টিকরণ এবং বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষার বিকল্প সুযোগ সৃষ্টি করা। মোট কথা, শিক্ষিত জাতি গড়তে যা যা করা দরকার, সব ধরনের কৌশলই আছে এতে।
তপন কুমার ঘোষ উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর নানা কার্যক্রম তুলে ধরে স্বদেশ খবরকে বলেন, এটি হচ্ছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন করছে এ ব্যুরো। সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পেশাদারী নেতৃত্ব দিয়ে আসছে এ প্রতিষ্ঠান। আর এ জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে স্বল্প মেয়াদি বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো সরকারি সংস্থা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানকারী সংস্থা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বাজারজাতকারী সংস্থার মধ্যে অংশীদারিত্ব উন্নয়ন ও সহযোগিতার মাধ্যমে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো সরকারি সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), সিভিল সোসাইটি এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সহযোগিতায় একটি সমন্বিত সাব-সেক্টর কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে। বহুমুখী এ কর্মযজ্ঞ অব্যাহত থাকবে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন-২০১৪ অনুযায়ী, সাধারণত দুই ধরনের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা পদ্ধতি আছে। এগুলো হলো উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা এবং উপানুষ্ঠানিক বয়স্ক ও জীবনব্যাপী শিক্ষা। উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষার্থীরা হচ্ছে ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সের শিশু, যারা কখনও বিদ্যালয়ে যায়নি। বা প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই যারা বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে তারাও এর আওতাভুক্ত। উপানুষ্ঠানিক বয়স্ক ও জীবনব্যাপী শিক্ষার শিক্ষার্থীরা হচ্ছে ১৫ ও তদূর্ধ্ব বয়সের নারী-পুরুষ, যারা কখনও বিদ্যালয়ে যায়নি বা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছেন বা নব্য-সাক্ষর হয়েছেন বা চাহিদাভিত্তিক জীবন-দক্ষতা ও জীবিকায়ন-দক্ষতা অর্জন অব্যাহত রাখতে চান।
সূত্র জানায়, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতাভুক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে সাক্ষরতা, মৌলিক শিক্ষা বা অষ্টম শ্রেণি সমমানের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কাঠামোর প্রি-ভোকেশনাল-২ স্তর পর্যন্ত ভোকেশনাল শিক্ষা। অর্জিত সাক্ষরতা, জীবিকায়ন, দক্ষতা ও মৌলিক শিক্ষাকে শাণিত, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনও এই শিক্ষার আওতাভুক্ত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা, বন ও পরিবেশ, মৎস্য ও পশু পালন, কুটির শিল্প, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সড়ক ব্যবহার, সড়ক নিরাপত্তা জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জেন্ডার, গণতন্ত্র, মূল্যবোধ, প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা, এইচআইভি-এইডস বা অন্য কোনো জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় ও প্রতিবন্ধিতা ও অটিজমসহ আরো নানা বিষয় এ শিক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। কেউ যদি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন লঙ্ঘন করে বা এ আইনের অধীন দায়িত্বপালনকারী কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে তার দায়িত্ব পালনে বাধা দেন, তাহলে তিনি অনধিক ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদ- বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ স্বদেশ খবরকে বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষা সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১৭ অনুযায়ী একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রের প্রতি নির্দেশ রয়েছে। তাই শিক্ষা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সে অনুযায়ী সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এটা শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণেরও অংশ।
তপন কুমার ঘোষ বলেন, জাতীয় পর্যায়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সাব-সেক্টর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় অনেক অবদান রাখছে এ ব্যুরো। এর ফলে সংগঠিত পদ্ধতিতে দেশে সাক্ষরতার হার বাড়ছে।

নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর কার্যক্রম
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর বিলুপ্ত হয় ২০০৫ সালে। গঠন করা হয় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো। নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ভিশন সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষানীতি, যেখানে রয়েছে সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যাবলি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সাব-সেক্টর তৈরি করা, শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করা। একইসঙ্গে চাহিদামূলক, অর্থ উপার্জনোপযোগী ও যথার্থ উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো ও সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি অংশীদারি এবং সহযোগিতাপূর্ণ কর্মপদ্ধতি তৈরি করা। মেয়েশিশু ও কর্মজীবী শিশুদের মৌলিক শিক্ষা, অর্থ উপার্জনোপযোগী প্রশিক্ষণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষানীতিতে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় ১৯৯৭ সালে ‘সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলন’ কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। সারাদেশে সাক্ষরতা কর্মসূচিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই কর্মসূচির মাধ্যমে ১৯৯৭ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করা হয়। সাক্ষরতার হার ১৯৯১ সালের ৩৫ শতাংশ থেকে ২০০০ সালে ৬০ শতাংশে উন্নীত হয়। বিশাল এ অর্জনের জন্য সরকার ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার-১৯৯৮ অর্জন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ পুরস্কার গ্রহণ করেন।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ স্বদেশ খবরকে বলেন, বর্তমান সরকারের নিরলস প্রচেষ্টায় সাক্ষরতা ব্যাপক হারে বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী নানামুখী কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো। এর অন্যতম সাক্ষরতাত্তোর কর্মসূচি (চড়ংঃ খরঃবৎধপু চৎড়মৎধস), যার উদ্দেশ্য হলো চর্চার মাধ্যমে অর্জিত সাক্ষরতা দক্ষতা ধরে রাখা এবং উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো বিভিন্ন আয়-সৃজনী কার্যক্রম (ওহপড়সব এবহবৎধঃরহম অপঃারঃরবং) পরিচালনা করে। শিক্ষার্থীকে কারিগরি দক্ষতা প্রদানের মাধ্যমে অধিকতর যোগ্য করে তোলার পর আয়-সৃজনী কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করা হয়। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রমের (ছঁধষরঃু ড়ভ খরভব ওসঢ়ৎড়াবসবহঃ চৎড়মৎধস) আওতায় শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান, জীবন দক্ষতা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজে একজন অগ্রবর্তী সদস্য হিসেবে তৈরি করে। শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে কার্যক্রম (ওহফরারফঁধষ ঞধষবহঃ চৎড়সড়ঃরড়হ চৎড়মৎধস) পরিচালনা করে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো। জীবনব্যাপী শিক্ষাকেন্দ্রে এমন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় যাতে তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটে। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম প্রভৃতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সুপ্ত প্রতিভার চর্চা ও বিকাশের সুযোগ পায়। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো ভবিষ্যতমুখী কার্যক্রমের (ঋঁঃঁৎব ঙৎরবহঃবফ চৎড়মৎধস) মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের উপযোগী করে গড়ে তোলে। পরিবর্তনশীল জ্ঞান, দক্ষতা ও কারিগরি চাহিদা বিবেচনা করে নতুন জ্ঞান ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ করা হয় প্রত্যেককে। এছাড়া সমতাস্থাপক কার্যক্রমের (ঊয়ঁরাধষবহপব চৎড়মৎধস) মাধ্যমে মেধা ও দক্ষতার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছে যাদের মেধা ও দক্ষতা আছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাবে কাজে লাগাতে পারছে না। এসব মেধাবী ও দক্ষ ব্যক্তির জন্য স্বল্পময়াদি কোর্স পরিচালন করা হয়।

কেন জরুরি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, দেশে শিক্ষার মান ও হার বৃদ্ধিতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে। বিদ্যমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় শুধু আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর নির্ভর করলে কাক্সিক্ষত ফল আসবে না, দেশে সামগ্রিক শিক্ষার উন্নয়নও সম্ভব হবে না। সে কারণে শিক্ষার মান ও হার বৃদ্ধিতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষার এই ধারাটি বেশি কার্যকর। কারণ, সাধারণ ধারণার বাইরে গিয়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপদ্ধতি বা প্রতিষ্ঠানের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যে কারণে শিক্ষাবঞ্চিত দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা জরুরি। এখানে বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপদ্ধতি ও পাঠ্যক্রম থেকে যা ভিন্ন।
জানা যায়, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার ধারণা নতুন নয়। নব্বই দশক থেকে এর গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন কারণেই আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পায় না অনেক মানুষ। প্রাথমিকের গ-ি পার হতে পারে না অনেক শিশু। তাই সরকার উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছে। ঝরে পড়া এসব শিক্ষার্থীকে নতুন করে শিক্ষিত করে তুলতে কাজ করছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো। নিরক্ষরতার হার কমাতে এ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এখন দেশ-বিদেশে আলোচিত ও প্রশংসিত।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ স্বদেশ খবরকে বলেন, বর্তমান সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়গামী প্রায় শতভাগ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কিন্তু আর্থসামাজিক ও ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতার কারণে এখনও অনেক শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা, অসচেতনতা ইত্যাদি কারণে প্রায় ৩০ লাখ শিশু এখনও বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। এ ছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩১.০২ শতাংশ শিক্ষার পরবর্তী ধাপে ভর্তি হয় না বা শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটায়। এসব বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুকে শিক্ষার সুযোগ প্রদান, নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতা ও দক্ষতাউন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সর্বোপরি জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার মাধ্যমেই কেবল দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব হবে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ স্বদেশ খবরকে বলেন, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে সব শ্রেণির মানুষকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনা নানা কারণে অসম্ভব। সে জন্যই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা জরুরি। যারা বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়নি, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে নিরক্ষর রয়ে গেছে তাদের জন্য এর বিকল্প নেই। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে বয়স্কদের ব্যবহারিক শিক্ষা দেয়া হয়। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশু, কিশোর ও বয়স্কদের জন্য বিকল্প শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করাই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
শিক্ষার সুযোগ, শিক্ষা কার্যক্রম ও সময়সূচি, পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষার পরিবেশ বিবেচনায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা দরিদ্রদের জন্য একটি আকর্ষণীয় শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাছেই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার বিদ্যালয় বসানো হয়, যাতে তাদের যেতে-আসতে কম সময় লাগে। আর শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সাধারণত হয় একই পাড়া বা মহল্লার মানুষ। উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে অধিকাংশ শিক্ষকই নারী, শিক্ষার পাঠ বিদ্যালয় ঘরভিত্তিক। এ কারণে বাড়িতে পাঠের চাপ থাকে না। তাছাড়া পাঠ্যক্রম বেশ সাজানো।
তপন কুমার ঘোষ জানান, এটি শিশু শিক্ষার্থী, কিশোর ও বয়স্কদের প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় এবং শিক্ষার পদ্ধতিও অংশগ্রহণমূলক। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নাচ, গান, শরীরচর্চা, চিত্রাঙ্কন ও অন্যান্য পাঠ্যবহির্ভূত কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করার সুযোগ মেলে। শিক্ষা উপকরণ দেয়া হয় বিনামূল্যে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। শিক্ষার্থীদের অহেতুক পরীক্ষার ভয়ে ভীত থাকতে হয় না। নিয়মিত পাঠের তত্ত্বাবধান ও মূল্যায়ন হয়। শিক্ষার্থীদের বাবা, মা, স্থানীয় সমাজকর্মী ও নেতাদের সঙ্গে পরামর্শের জন্য নিয়মিতভাবে মাসিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সবমিলিয়ে সমাজকে বদলে দেয়ার জন্য একটি আদর্শ ব্যবস্থা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা: ফিরে দেখা এবং জাতির পিতার অবদান
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার রয়েছে দীর্ঘ কয়েক দশকের ইতিহাস। কালের পরিক্রমায় এ শিক্ষায় নানা বৈচিত্র্য যুক্ত হতে হতে আজকের এ অবস্থানে পৌঁছেছে।
স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করা এবং শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৩ সাল থেকে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশে সাক্ষরতা অভিযান শুরু হয়।
পরবর্তীতে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ অর্জনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ইউনেস্কোর উদ্যোগে থাইল্যান্ডের জমতিয়েনে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ শীর্ষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, বাংলাদেশও সেখানে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও সাক্ষরতা বিস্তারে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের ফলেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসতে শুরু করে।

জীবনব্যাপী শিক্ষার ধারণা ও লক্ষ্য
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জীবনব্যাপী শিক্ষা। শিক্ষাগবেষকদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক কিংবা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্যক্তির সমগ্র জীবনে নানা বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ যা চিত্তের উৎকর্ষ বৃদ্ধি, অর্জিত দক্ষতার ক্রমবিকাশ কিংবা জীবনমানের অব্যাহত উন্নয়নের সহায়ক হয় এমন শিক্ষাকে জীবনব্যাপী শিক্ষা বলে। সাক্ষরতা কর্মসূচি, উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ইত্যাদির মাধ্যমে একটি পূর্বপরিকল্পিত ও নির্দিষ্ট সময়ের গ-িতে সীমাবদ্ধ শিক্ষা-প্রশিক্ষণ কোর্স সম্পন্ন করার পরও পরিবর্তনশীল বিশ্বে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের চাহিদা শেষ হওয়ার নয়। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আর্থসামাজিক অবস্থার এক স্তর থেকে আরো উন্নত অবস্থায় উপনীত হতে মানুষকে সর্বক্ষণ নতুন নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে হয়। সার্বক্ষণিক জ্ঞান ও দক্ষতার চাহিদা মেটানোর জন্য সারা জীবন প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতার অন্বেষণ করতে হয়। মানুষের এ রকম জ্ঞান ও দক্ষতার চাহিদা মেটানোর জন্যই জীবনব্যাপী শিক্ষা।
জীবনব্যাপী শিক্ষা ও এর প্রয়োজনীয়তা বর্তমান বিশ্বে বিশেষভাবে আলোচিত। বলা হয়ে থাকে, জন্মের পর থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিস্তৃত শিক্ষার ধারণা এটি। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, শুধু সাক্ষরতা যথেষ্ট নয়, সামাজিক জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ প্রভৃতির উন্নয়নও জরুরি। জীবনমান উন্নয়নে সমর্থ করে তুলতে জীবনব্যাপী শিক্ষার বিকল্প নেই। দেশের কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক উন্নয়নে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং অব্যাহত শিক্ষা ও জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা।

টেকসই উন্নয়ন ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা
জীবনব্যাপী শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি)। এসডিজি অর্জনে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে এসডিজি-৪ হচ্ছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাপূর্ণ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ স্বদেশ খবরকে বলেন, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন-২০১৪, এসডিজি-৪ এবং ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। নিরক্ষরতা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে ১৫ এবং তদূর্ধ্ব বয়সী নিরক্ষর নারী-পুরুষকে সাক্ষরতা জ্ঞান প্রদানের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দেশের ৬৪ জেলায় নির্বাচিত ২৫০টি উপজেলার ৪৫ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষরতা প্রদানের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (এনএফইডিপি) চলছে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম এ যাবৎ খ-কালীন প্রকল্পনির্ভর কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যে কারণে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সাব-সেক্টরে কোনো টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে দেশে নিরক্ষরতা সম্পূর্ণ দূরীকরণসহ জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি সাধিত হয়নি। বর্তমান সরকার এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সাব-সেক্টরে একটি দীর্ঘমেয়াদি সেক্টরওয়াইজ অ্যাপ্রোচ প্রোগ্রাম হিসেবে এনএফইডিপি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ স্বদেশ খবরকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে একটি টেকসই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠবে। পিছিয়ে পড়া বিশাল নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে ২০২১ সালের মধ্যেই একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এবং প্রতিটি সেক্টরে স্বনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সাফল্য অর্জন
সাফল্য যেমন আছে তেমনি চ্যালেঞ্জের কথাও জানালেন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ। তিনি স্বদেশ খবরকে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মিশনে শামিল হয়ে আরও অবদান রাখতে আমরা সবাই সচেষ্ট। তবে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন ২০১৪, ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং এসডিজি-৪ অর্জনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সামনে রয়েছে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ। প্রতিষ্ঠানের দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামোকে জরুরি ভিত্তিতে শক্তিশালী করা দরকার। উপজেলা পর্যায়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যালয় স্থাপনসহ নিয়োজিত করতে হবে প্রয়োজনীয় জনবল। ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে স্থায়ী কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি; যেখানে নিয়মিত সাক্ষরতা, উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করা যাবে। দেশব্যাপী নিরক্ষর জরিপের মাধ্যমে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার লক্ষ্যদলের ডেটাবেইজ প্রস্তুত করতে হবে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বাড়াতে হবে আর্থিক বরাদ্দ। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাবোর্ড কার্যকরী করার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বিভিন্ন গ্রেডের সাথে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার বিভিন্ন কোর্স-কারিকুলামের সমতা স্থাপন এবং শিক্ষার্থীদের সনদ দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও আর্থিক চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে নিয়মিত কারিকুলাম ও পাঠ্যবিষয়ের উন্নয়ন, উপকরণ উন্নয়ন, পাঠদান পদ্ধতির উন্নয়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিয়মিত গবেষণা ও জরিপ কার্যসম্পাদনের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোতে একটি গবেষণা উইং প্রতিষ্ঠা করা দরকার।
জরুরিভাবে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে তপন কুমার ঘোষ আরও বলেন, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন-২০১৪ এর ৪ (৩) ধারায় বর্ণিত জীবনব্যাপী শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে কৌশল প্রণয়ন প্রয়োজন। সুবিধাভোগীদের ডেটাবেজ প্রস্তুত করতে হবে। বিভিন্ন আর্থসামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষা জীবন পরিত্যাগকারী কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, যুব ও বয়স্ক এবং সাক্ষরতা কোর্স সম্পন্নকারী নব্যসাক্ষরদের এলাকাভিত্তিক জরিপের মাধ্যমে ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। নিয়মিত তা হালনাগাদ করতে হবে। শিখন ও দক্ষতা চাহিদা নিরূপণ করতে হবে। জরিপ ও গবেষণা পরিচালনার মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক লক্ষ্যদলের শিখন চাহিদা, বাজারের চাহিদাভিত্তিক ট্রেড- পেশা-জীবিকায়ন দক্ষতা, স্থানীয় সম্পদ ইত্যাদি নিরূপণ করতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে রিসোর্স সেন্টার। স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিত্য-নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে সহজবোধ্য বই-পুস্তক ও শিক্ষা উপকরণ প্রস্তুতের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি রিসোর্স সেন্টার প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি। সেইসঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে কমিউনিটিভিত্তিক সেবাপ্রদানকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে একটি টেকসই সমন্বয় নীতিমালা করা যেতে পারে, যাতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সেবাসমূহকে জীবনব্যাপী শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত করা যায়। গঠন করা যেতে পারে ইন্ডাস্ট্রি-ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদ। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর নেতৃত্বে দেশে বিদ্যমান সব পর্যায়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ইন্ডাস্ট্রি, কল-কারখানা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির সমন্বয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বয় কমিটি বা পরিষদ গঠন করা যায়। এর মাধ্যমে জীবনব্যাপী শিক্ষার সুবিধাভোগীদের কর্মসংস্থান, আত্ম-কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠায় জোর দিতে হবে। সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে পাড়া-মহল্লা, গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থায়ী কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার (সিএলসি) প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের চাহিদামোতাবেক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। সমতামানের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বোর্ডকে কার্যকরী করার মাধ্যমে সমতামানের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কোর্স চালু করা, যাতে শিক্ষার মূলধারা থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা যেকোনো বয়সে জীবনব্যাপী শিক্ষার আওতায় এসে তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার মূল্যায়নে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার স্তরভিত্তিক সমতামানের স্বীকৃতি পেতে পারে। জীবনব্যাপী শিক্ষার সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

মুজিববর্ষে উপানুষ্ঠানিক
শিক্ষা ব্যুরোর অঙ্গীকার: ২১ লাখ নিরক্ষর হবে সাক্ষর
মুজিববর্ষে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো। এ বছর মৌলিক সাক্ষরতা পাবেন ২১ লাখ নিরক্ষর নারী ও পুরুষ। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর অধীনে ৬০ জেলার ১১৪টি উপজেলার নিরক্ষর মানুষ এই সুযোগ পাবে। মৌলিক সাক্ষরতা ও জীবনদক্ষতা সম্পর্কে জ্ঞান দিতে এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে আগামী মাসেই।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর কর্মকর্তারা জানান, ২১ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষরতা দিতে মাঠ পর্যায়ের কর্মসূচি বাস্তবায়নে ১১৪টি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) কাজ করবে। এনজিওগুলোর কর্মএলাকায় বেইজলাইন সার্ভের মাধ্যমে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নিরক্ষরের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। শিখন কেন্দ্রের স্থান নির্বাচন করে শিক্ষক ও সুপারভাইজার নিয়োগ করে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ৬ মাসের মধ্যেই এই মৌলিক সাক্ষরতা পাবেন ২১ লাখ মানুষ। এনজিওগুলোর বেইজলাইন সার্ভের মাধ্যমে তৈরি করা ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারী-পুরুষের তালিকা ঠিক আছে কি না তা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ৬০ জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জেলাগুলোর উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালকদের তালিকাসহ প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে।
সম্প্রতি সংসদে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেনও জানিয়েছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষে’ মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের মাধ্যমে ২১ লাখ নিরক্ষর নারী-পুরুষকে সাক্ষরতা দেয়া হবে। এর মধ্যে অর্ধেক নিরক্ষর নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
শুধু সাক্ষরতা নয়, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো জোর দিচ্ছে কর্মমুখী শিক্ষায়ও। বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে দেশের একটি বিশাল অংশ সাক্ষরতার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। গ্রামাঞ্চলে পড়াশোনা শেষ করে যারা এখনো চাকরি করছেন না তাদের জন্য এটি হবে একটি বড় সুযোগ। মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালনসহ নানাবিধ শিক্ষায় পাল্টে যাবে তাদের জীবনচিত্র। সেইসঙ্গে গ্রামীণজীবনেও আসবে নতুন মাত্রা।

শেষ কথা: শতভাগ সাক্ষরতাই
চূড়ান্ত লক্ষ্য
শতভাগ সাক্ষরতার লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো। মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়ার যে অভীষ্ট গন্তব্য ঠিক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তারই অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করতে চায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, এখনো ২৬ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর রয়ে গেছে। বিপুল এই জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতার বাইরে রাখলে প্রত্যাশিত উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, সরকার নন-ফর্মাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম হাতে নিচ্ছে, যার আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় সোয়া ৩ কোটি লোক সাক্ষরতার আওতায় আসবে। নিশ্চিত করা হবে মানসম্মত ও সার্বজনীন শিক্ষাও।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ স্বদেশ খবরকে এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের লক্ষ্য নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়া। সে জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার আরও যুগোপযোগী, অত্যাধুনিক ও সর্বজনগ্রহণীয় পরিবেশ বিনির্মাণ করা হবে। নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর জন্য সাক্ষরতা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার জন্য সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তপন কুমার ঘোষ। তিনি বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলব আমরা, এক্ষেত্রে শিক্ষাই হবে আমাদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।