রাজনীতি

খালেদা জিয়ার কারামুক্তিতেই ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপির রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক : খালেদা জিয়ার কারামুক্তিতে ঘুরপাক খাওয়া বিএনপির রাজনীতিতে নতুন ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে করোনা ভাইরাস। বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন নিয়ে আন্দোলনবিমুখ দলের নেতারা এতদিন বলে আসছিলেন, আন্দোলনে নামলে গ্রেপ্তার-নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়, পুলিশ সমাবেশ করতে দেয় নাÑ ইত্যাকার নানা কিছু। সর্বশেষ হাইকোর্ট থেকে জামিন নাকচ হয়ে গেলে বিএনপির নেতারা যখন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দাবির মুখে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য বিক্ষোভ কর্মসূচির দিকে যাওয়ার লোকদেখানো চেষ্টা করছিলেন, তখনই ত্রাতা হিসেবে আগমন ঘটে করোনার। করোনায় দেশে ৩ জন আক্রান্ত হয়েছে শোনার ৩ ঘণ্টার মাথায় বিএনপি নেতারা খালেদার কারামুক্তির জন্য সব ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করে দেন। বিক্ষোভ কর্মসূচির মতো ঝামেলা থেকে তাদের রক্ষা করে করোনা। তারা সুযোগ বুঝে করোনার ওপর সকল দোষ চাপিয়ে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি ইস্যুতে আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেয়।
করোনার ভয়ে বিএনপি নেতারা যখন পলায়নপর, তখন পরিবারের সদস্যরা মাঠে নামেন। খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য সাময়িক কারামুক্তি চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করে পরিবার। গত ৪ মার্চ খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর একটি চিঠি দেন।
শামীম ইস্কান্দারের এই চিঠি দেয়া ভালোভাবে নিতে পারেনি বিএনপি নেতারা। এ বিষয়ে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে আবেদন করা হয়েছে তাতে কী আছে তা জানা নেই। এটি সম্পূর্ণ তাঁর ও তাঁর পরিবারের ব্যাপার।
খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে সরকার ও তার পরিবারের মধ্যে একটা সমঝোতা চলছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। জানা গেছে, পরিবারের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকার ইতিবাচক মনোভাব দেখালে খালেদা জিয়া শেষ মুহূর্তে প্যারোলের জন্য আবেদন করতে পারেন। এ ব্যাপারে তার সম্মতি নিতে পরিবারের পক্ষ থেকে বার বার চাপ দেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ৭ মার্চ পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করে জামিন ও প্যারোলের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া যখন কারাবন্দি হন, তখন দল ও দলের বাইরের সাধারণ মানুষও ভেবেছিল, অল্প কয়েকদিন জেল খেটেই জামিনে মুক্ত হয়ে যাবেন বিএনপি চেয়ারপারসন। কিন্তু দিনের পর মাস, মাস পেরিয়ে বছর, আর বছর পেরিয়ে এখন ২ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল Ñ এখনও কারামুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে না বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। এ নিয়ে চরম হতাশ বিএনপির নেতাকর্মী ও খালেদা পরিবারের সদস্যরা। এজন্য তারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ আনছেন। সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব খালেদা জিয়ার মুক্তিপ্রশ্নে জোরালো কোনো আন্দোলন করছে না বলেও তাদের অভিযোগ রয়েছে। তারা বলছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় বারবার চেষ্টা করেও জামিন লাভে ব্যর্থ হওয়ার পরও সক্রিয় আন্দোলনের দিকে না যাওয়া বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নতজানু মনোভাবের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এ কারণে তারা দলের শীর্ষ নেতাদের ‘অকৃতজ্ঞ’ বলেও অভিহিত করছেন।
এদিকে খালেদা জিয়ার সাময়িক মুক্তি চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে আবেদন করা হয়েছে তাকে প্যারোল বলা যাবে কিনাÑ এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন বলেন, না, এটি প্যারোল নয়, সাময়িক মুক্তি। কারাবন্দি যে কেউ সরকারের কাছে যেকোনো কারণ দেখিয়ে সাময়িক মুক্তির আবেদন করতে পারে। কারণে সন্তুষ্ট হয়ে সরকার নির্বাহী আদেশে তার আবেদন বিবেচনা করতে পারে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ (১) ধারা অনুযায়ী সরকার শর্তহীনভাবে যেকোনো কারাবন্দির সাজা স্থগিত করে বিশেষ বিবেচনায় মুক্তি দিতে পারে।
এদিকে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা জানান, খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা নিয়ে তারেক রহমান খুবই উদ্বিগ্ন। যেকোনো প্রক্রিয়ায় হোক তিনি খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং তাঁকে লন্ডনে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চান। তাদের আশা, আগামী ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর দিনের আগে গুরুতর অসুস্থ খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেবে সরকার।
বিএনপিদলীয় আইনজীবীরা এ বিষয়ে বলেন, খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন তারা। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দ-িত খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট।
৩ মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় খালেদা জিয়ার জামিন খারিজ হওয়ার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় চেয়ারপারসনের মুক্তির আর সম্ভাবনা নেই।
বিএনপি চেয়ারপারসনের কারামুক্তি প্রশ্নে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়েই পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন চলছিল। হাইকোর্টে জামিনের জন্য আরেক দফা আবেদন উঠলে বিএনপির তৃণমূলের অনেকেই ভেবেছিল, সরকারের গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই হয়ত জামিনের আবেদনটি হাইকোর্টে ওঠানো হয়েছে। কিন্তু ২৭ ফেব্রুয়ারি জামিন আবেদনটি খারিজ হয়ে যাওয়ায় বিএনপির তৃণমূল সব দোষ দিতে থাকে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর। তারা বলতে থাকে, খালেদা জিয়ার মুক্তিপ্রশ্নে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব সরকারের সঙ্গে আসলে কোনো আলোচনাই করেনি।
খালেদা জিয়ার কারামুক্তির বিষয়টি এখন রাজনৈতিক ‘সমঝোতা’ ও ময়দানের সিদ্ধান্তের বিষয় বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা মনে করেন। তারা মনে করেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রহর গোনা ছাড়া বিএনপির সামনে অন্য পথ খোলা নেই। মুক্তির জন্য সরকারের ওপরই খালেদা জিয়াকে নির্ভর করতে হচ্ছে। সময়ই বলে দেবে সরকার নির্বাহী আদেশের দিকে যাবে কি না। ততদিন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার মুক্তিপ্রশ্নে বিএনপিকে সরকারের অনুকম্পার দিকেই চেয়ে থাকতে হবে।