রাজনীতি

জামায়াত: বিএনপির জন্য আশীর্বাদ না অভিশাপ?

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির জন্য জামায়াত আশীর্বাদ না অভিশাপ Ñ এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক আছে। বাংলাদেশে জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে বিএনপি Ñ এ নিয়ে বিএনপি আত্মপ্রসাদ লাভ করলেও জামায়াত মনে করে, ইসলামি মূল্যবোধ তথা ধর্মকে ব্যবহার করে তারা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সংসদীয় ব্যবস্থায় একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল সঙ্গে থাকলে ভোটের মাঠে সুবিধা পাওয়া যায় Ñ এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিএনপি ১৯৯০ সালের পর থেকে জামায়াতকে সঙ্গে রেখেছে। এই সুবিধা নিয়ে বিএনপির কাছ থেকে বিভিন্ন ফায়দা লুটে নিয়েছে জামায়াত, এমনকি মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত। বিএনপি যখন সরকারে ছিল তখন বিভিন্ন সুবিধা নিলেও দলটি যখন সরকারের বাইরে চলে গেছে, তখন জামায়াত আবার বিএনপির প্রতিপক্ষ হওয়ার চেষ্টা করেছে। এই চেষ্টার অংশ হিসেবে জামায়াত ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিশে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ আন্দোলনও করেছে।
জামায়াতের এই আচরণের কারণে বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করেন, দলটি আসলে দু’মুখো সাপের মতো। রাজনীতিতে যখন বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে, তখন দলটি বিএনপিকে জড়িয়ে ধরে, বিএনপি যখন অসুবিধায় থাকে তখন বিএনপির গলা চেপে ধরার চেষ্টা করে। সে হিসেবে এমন দলকে বিএনপির কাছেপিঠে ঘেঁষতে দেয়াই ঠিক নয়। রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির জন্য জামায়াত অভিশাপ ছাড়া কিছুই নয়। আওয়ামী লীগের নিষ্পেষণ থেকে বাঁচতে তারা এখন বিএনপির সঙ্গে ঝুলে থাকতে চাইবে, কিন্তু বিএনপিকে তার অস্তিত্বের প্রশ্নে জামায়াতকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে।
এরই অংশ হিসেবে জামায়াতকে ছেড়ে দেয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বিএনপিতে। সম্প্রতি গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে দলটির বর্তমান ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্য জামায়াতকে ত্যাগ করার পক্ষে মতামত দেন। তবে জামায়াতের সাম্প্রতিক ভূমিকা বিশ্লেষণ করে এক নেতা বলেন, ঘোষণা দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিএনপির সঙ্গে আদৌ জামায়াত আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে, না সরকারি দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টায় আছে Ñ সেসবও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বহু আগ থেকেই জামায়াতকে ছেড়ে দেয়ার জন্য দলের হাইকমান্ডের কাছে মতামত দিয়েছেন। বিশেষ করে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলকে শক্তিশালী করতে ঢাকায় ডেকে স্কাইপের মাধ্যমে সারাদেশের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামত নিয়েছেন। সেখানে তৃণমূলের নেতারাও জামায়াতকে ছেড়ে দেয়ার পক্ষে জোরালো মতামত দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, জামায়াত কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলছে। কোথাও কোথাও জামায়াতের কারণে বিএনপিকে সংকটেও পড়তে হচ্ছে।
বিএনপির অনেক ত্যাগী নেতা মনে করেন, এই দলটি নিজেদের স্বার্থ ছাড়া এক চুলও নড়ে না। বিগত ওয়ান-ইলেভেনে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের পর বিএনপির পক্ষ থেকে তৎকালীন একজন যুগ্ম মহাসচিব (বর্তমানে স্থায়ী কমিটির সদস্য) জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদের (আদালতের রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি কার্যকর) সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একটি বিবৃতি দেয়ার অনুরোধ করেন। জবাবে জামায়াত সেক্রেটারি বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়ার দুর্নীতিবাজ পুত্রের পক্ষে জামায়াত কোনো বিবৃতি দেবে না’। এছাড়া ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে ছিলেন না। ওই নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব প্রয়াত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। এ নিয়ে দেলোয়ারের সঙ্গে খালেদা জিয়ার দূরত্বও হয়েছিল। কিন্তু জামায়াতের চাপ ও কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর পরামর্শে শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়া ওই নির্বাচনে যেতে রাজি হন। তার আগে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে টেবিলে কাগজ ছুড়ে ফেলে খালেদা জিয়াকে হুমকি দিয়েছিলেন, বিএনপি না গেলেও জামায়াত নির্বাচনে যাবে।
বিএনপি নেতারা মনে করেন, জামায়াতের প্ররোচনায় ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হওয়ার পর থেকেই বিএনপি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। কারণ, বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশ নেয়ায় আওয়ামী লীগের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়ে যায়, যার সুবিধা আওয়ামী লীগ এখনো ভোগ করছে এবং বিএনপি ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।
জানা যায়, ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। জোটের অন্য শরিকরাও ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছে। কিন্তু জামায়াতের কোনো প্রতিনিধিকে পক্ষে পায়নি বিএনপি। বিশেষ করে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনেও ধানের শীষের পক্ষে জামায়াতের কোনো নেতাকে দেখা যায়নি। এছাড়া ২১ ও ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদের ৫টি উপনির্বাচন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচার শুরু হলেও জামায়াতের নেতাকর্মীরা বিএনপির প্রার্থীর পাশে নেই।
বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে অন্তত ভোটের দিন হলেও জামায়াতের নেতাকর্মীদের পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য ও একজন ভাইস চেয়ারম্যান। তাদের কথা দিয়েছিলেন বলেও বিএনপির ওই দুই নেতা জানান। তারা বলেন, জামায়াতের কাছে প্রথমে ধানের শীষের পক্ষে পোলিং এজেন্ট চাওয়া হয়েছিল; কিন্তু জামায়াত বলেছে, তারা পোলিং এজেন্ট দেবে না, কিন্তু ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবে। কিন্তু ভোটের দিন জামায়াত মাঠেই নামেনি।
এসবের ফল হিসেবেই জামায়াতকে অভিশাপ হিসেবে দেখছে বিএনপি। দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কথা হলো, জামায়াত সব সময় বিএনপির কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছে, কিন্তু বিএনপি তাদের কাছ থেকে কোনো সুবিধা পায়নি। এসবের পাশাপাশি জামায়াতের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধিতার যে অভিযোগ আছে, তার ভারও বহন করতে হয়েছে বিএনপিকে।
তাদের কথা হলো, দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে যে দল, সে দলকে কিছুতেই বিএনপির ছায়াতলে ঠাঁই দেয়া উচিত হয়নি। ঘোষণা দিয়েই জামায়াতের সাথে সকল সম্পর্ক ত্যাগ করা উচিত বিএনপির।