প্রতিবেদন

ঢাকায় এবার পাতাল রেল নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক : দুই বছর আগে ঢাকার চারপাশে ৯০ কিলোমিটার সাবওয়ে বা পাতাল রেল নির্মাণের যে পরিকল্পনা করেছিল সরকার, সেখান থেকে সরে এসে মোট ২৩৮ কিলোমিটার পাতাল রেল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফলে পাতাল রেলের পরিধি বাড়ছে ১৪৮ কিলোমিটার। ব্যাপ্তি বাড়ার ফলে খরচও বেড়েছে। পাতাল রেল নির্মাণে সমীক্ষা করতে আগে যেখানে খরচ দেখানো হয়েছিল ২১৯ কোটি টাকা, সেটি বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৩১৮ কোটি টাকা।
১১ মার্চ সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে এই প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে রাজধানীর শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে কমিটির বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্ত হয়।
জানা যায়, জাপানের ওসাকার আদলে ঢাকায় সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা হচ্ছে। এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা এবং প্রাথমিক নকশা প্রণয়নের জন্য ২০১৮ সালের আগস্টে টেকনিকা ওয়াই প্রয়েক্টসের সঙ্গে ২১৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। সেই খরচ এখন ৯৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা বাড়িয়ে ৩১৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। ২০১৮ সালে করা চুক্তি অনুযায়ী ঢাকা মহানগরীতে ৪টি রুটে আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করার কথা ছিল টেকনিকা ওয়াই প্রয়েক্টসের। সেই পরিকল্পনায় এখন কিছুটা পরিবর্তন আসছে। সাবওয়ে হলে ভূপৃষ্ঠ থেকে ২০-৩০ মিটার নিচ দিয়ে চলবে যাত্রীবাহী ট্রেন। এতে মহানগরীর প্রায় ৪০ লাখ যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে এবং যানজটের সমস্যা অনেকাংশে মিটে যাবে বলে সরকার আশা করছে।
সূত্রমতে, ঢাকায় পাতাল রেল হবে সড়কের ১৫০ থেকে ২০০ ফুট নিচ দিয়ে স্টেশনগুলোর আকার হবে কয়েক হাজার বর্গফুট ও তিন-চার তলাবিশিষ্ট। এতে পাতাল রেলের টানেল ও স্টেশন থেকে প্রচুর মাটি অপসারণ করতে হবে। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় এত পরিমাণ মাটি ফেলার মতো পর্যাপ্ত নিচু জমি নেই। কিছু স্থানে নিচুজমি বা খাল থাকলেও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সেখানে মাটি ফেলা সম্ভব নয়। তাই পাতাল রেলের মাটি ফেলার জন্য একাধিক বিকল্প নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকার জন্য প্রস্তাবিত পাতাল রেলের মাটি অপসারণ এবং তা ফেলতে যে ব্যয় হবে, তা দিয়ে উড়ালপথে আরেকটি মেট্রোরেল নির্মাণ সম্ভব। পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষও। তাই কম ব্যয়ে ও সময়ে কিভাবে মাটি অপসারণ করা যায় তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব মহলের মতামত চাওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণও বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে বলেন, মাটি ফেলার জন্য সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের জন্য নিচু জমি ভরাটে প্রচুর বালি ও মাটি দরকার হবে। এক্ষেত্রে পাতাল রেলের মাটি সরবরাহ করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে। এজন্য আবাসন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
রাজধানীর যানজট নিরসনে এখন চলছে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ। রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় আরো গতি আনতে এবার পাতাল রেলের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর আওতায় ঢাকা শহর ঘিরে ৪টি পাতাল রুট করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে রাজধানীতে পাতাল রেল স্থাপনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিনির্ধারকরা।
বর্তমান সরকার আমলে পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় বড় প্রকল্প এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা। এ বাস্তবতা থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীতে পাতাল রেল স্থাপনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
পাতাল রেল প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিও পাওয়া গেছে। বিশ্বব্যাংক এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন করতে আগ্রহী। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা শহরে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর দ্রুত সংযোগ ঘটবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকার ৮০ ভাগ কর্মজীবী মানুষ সাবওয়ে দিয়ে চলাচল করবে। দিনে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ঢাকা শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটবে মাটির নিচ দিয়ে।
সেতু বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রস্তাবিত যেসব মেট্রোরেল রুট আছে সেগুলো ঢাকা শহরের উত্তর-দক্ষিণের মধ্যে টানা হয়েছে। এ কারণে ঢাকার পূর্ব-পশ্চিম বরাবর সাবওয়ে রুট টানার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পাতাল রেলের জন্য এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য ৪টি রুট চিন্তা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রথম রুট হবে টঙ্গী থেকে উত্তরা, এয়ারপোর্ট, খিলক্ষেত, কাকলী, মহাখালী, মগবাজার, কাকরাইল, পল্টন, শাপলা চত্বর যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া হয়ে নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড পর্যন্ত।
দ্বিতীয় রুটে থাকছে আমিনবাজার থেকে গাবতলী, শ্যামলী, আসাদগেট, নিউমার্কেট, টিএসসি, বঙ্গবাজার, ইত্তেফাক মোড় হয়ে সায়দাবাদ পর্যন্ত।
তৃতীয় রুটটি শুরু হবে গাবতলী থেকে মিরপুর-১, মিরপুর-১০, কাকলী, গুলশান, নতুন বাজার, রামপুরা টিভি ভবন, খিলগাঁও, শাপলা চত্বর হয়ে সায়দাবাদ পর্যন্ত।
সাবওয়ের চতুর্থ রুটটি রামপুরা টিভি স্টেশনের সামনে থেকে শুরু হয়ে নিকেতন, তেজগাঁও, সোনাগাঁও হোটেল, রাসেল স্কয়ার, ধানমন্ডি ২৭, রায়ের বাজার, জিগাতলা, আজিমপুর, লালবাগ হয়ে শেষ হবে সদরঘাটে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেট্রোরেল বা ফ্লাইওভার করতে গিয়ে ঢাকায় যে ধরনের জনদুর্ভোগ হয়েছে, পাতাল রেল করতে গিয়ে তেমন কিছু হবে না। কারণ, এ প্রকল্পের পুরো কাজটি হবে মাটির নিচে দিয়ে। ঢাকা শহরের মাটির ৩০ মিটার নিচ দিয়ে যাবে প্রতিটি পাতাল রেলের রুট। তাই জমি অধিগ্রহণেরও প্রয়োজন হবে না।
মেট্রোরেলের পর মেগাসিটি ঢাকার যানজট নিরসনে পাতাল রেল সবচেয়ে বেশি ফলদায়ক হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ২০৪১ সালের মধ্যে বা তার আগেই উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নিরলস যে কাজ করে চলেছে, রাজধানীতে পাতাল রেল নির্মাণের প্রকল্পটি তারই আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।