রাজনীতি

ঢাকা-১০ উপনির্বাচনে নিরুত্তাপ বিএনপি: হতাশ নেতাকর্মী সমর্থকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী ২১ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা-১০ সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং অন্যতম বিরোধী দল বিএনপিসহ এ উপনির্বাচনে মোট ৬টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। বিএনপির প্রার্থী হলেন দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ধানমন্ডি থানা বিএনপির সভাপতি শেখ রবিউল আলম। বাকি ৪ প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির হাজী মো. শাহজাহান, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের নবাব খাজা আলী হাসান আসকারী, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মিজানুর রহমান চৌধুরী ও পিডিপির আবদুর রহিম।
এ উপনির্বাচনে প্রচলিত ব্যালট পেপারের বদলে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে। তবে ইভিএম ব্যবহারের জন্য অন্য নির্বাচনের মতো সেনা সদস্যদের সহায়তা নেয়া হবে না। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারাই ইভিএম পরিচালনা করবেন।
নির্বাচন কমিশন ২১ মার্চ ভোটের দিন রেখে গত ৬ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা-৩, বাগেরহাট-৪ ও ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মেয়র পদে লড়ার জন্য সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস গত ২৯ ডিসেম্বর পদত্যাগ করলে ঢাকা-১০ আসনটি খালি হয়।
৬ ফেব্রুয়ারি যখন উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় তখন করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি চীনেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে এ ভাইরাস চীন পেরিয়ে বিশ্বের ১৪৭টির মতো দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ৮ মার্চ বাংলাদেশে ৩ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এ ভাইরাসের আগ্রাসন রোধে মুজিববর্ষের সব অনুষ্ঠান সীমিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণকে জনসমাগম এড়িয়ে চলতে পরামর্শ দেন। নির্বাচনি কার্যক্রম একপ্রকার জনসমাগম হলেও ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচন ২১ মার্চ অনুষ্ঠিত করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচনের আর সপ্তাহখানেক বাকি না থাকলেও ঢাকা-১০ আসনে যে একটি উপনির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা জানে না ওই সংসদীয় আসনের অনেক ভোটারই। এর কারণ দু’টি। আসনটিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি হেভিওয়েট ও জনপ্রিয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। ফলে তাদের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়নি। তাছাড়া নির্বাচন কমিশন নির্বাচনি প্রচারণায় নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করায় ভোটারদের পক্ষে জানাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে যে, ঢাকা-১০ আসনে একটি উপনির্বাচন হতে যাচ্ছে।
আরেকটি কারণ হলো করোনা আতঙ্ক। এই আতঙ্কে ভোটারদের মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের জন্য যতটা দৌড়ঝাঁপ দিতে দেখা যাচ্ছে, তার কিছুই দেখা যাচ্ছে না ভোট বিষয়ে। ফলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সর্বকালের সেরা একটি নিরুত্তাপ ভোট হতে যাচ্ছে ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে। অনেকের আশঙ্কা এই উপনির্বাচনে ১৫ শতাংশ ভোটও কাস্ট হবে না এবং অবধারিতভাবে নির্বাচন কমিশন কম ভোট পড়ার জন্য করোনাকে দায়ী করবে।
এই আসনের উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ধরেই নিয়েছেন, তিনি যেহেতু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন, সেহেতু তিনি একপ্রকার এমপি হয়েই গেছেন। তিনি রুটিনমাফিক প্রতিদিনই প্রচারণা চালাচ্ছেন, কিন্তু তাতে যেন প্রাণ নেই। কোনো কেন্দ্রীয় নেতাকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তার পক্ষে জোরেশোরে নির্বাচনি প্রচারণায় নামতে দেখা যায়নি। তার প্রচারণায় করোনার প্রভাবও পড়েছে। ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর-লালমাটিয়া এলাকার এলিট শ্রেণির ভোটাররা নিজেদের করোনা থেকে রক্ষা করতেই ব্যস্ত। ভোট নিয়ে ভাবার সময় তাদের নেই।
একই অবস্থা বিএনপি প্রার্থী শেখ রবিউল আলমেরও। শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনের পক্ষে কিছু প্রচারণা দেখা গেলেও রবিউল আলমের পক্ষে তা-ও নেই। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের চেয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা যেন করোনায় বেশি আতঙ্কিত। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সব ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশই বন্ধ ঘোষণা করে তারা বাসার ড্রইং রুমে বসে টিভিতে করোনার খেলা দেখছেন। ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনের নির্বাচনি প্রচারণায় নামার সময় তাদের কোথায়?
এ নিয়ে বিএনপি প্রার্থীরও কোনো হা-পিত্যেশ নেই। তিনি ধরেই নিয়েছেন, শফিউল ইসলামের কাছে তিনি পরাজিত হচ্ছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা-১০ উপনির্বাচন পরিচালনা করার জন্য বিএনপি গঠিত আহ্বায়ক উপকমিটির দুই সদস্য হেলেন জেরিন খান ও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, করোনা ভাইরাস যেভাবে ধেয়ে আসছে তাতে নেতাকর্মীরা কিভাবে প্রচারে অংশ নেবেন? করোনা আতঙ্কের মধ্যে নেতাকর্মীদের রাজপথে নামানো কঠিন হয়ে যাবে। করোনা ভাইরাসের আক্রমণ বিএনপির প্রার্থীর জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হতে পারে। এতে করে নির্বাচনি প্রচারে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কম হতে পারে। এ অবস্থায় দলকে প্রচারের নতুন নতুন কৌশল বের করতে হতে পারে। শুধু বিএনপি নয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও নির্বাচন কমিশনকে এ নিয়ে ভাবা উচিত।
এর বাইরে দেখা যাচ্ছে, কোথাও পোস্টারের ছড়াছড়ি নেই। লেমিনেটিং পোস্টারের দূষণ নেই। নেই উচ্চমাত্রার শব্দযন্ত্রের ব্যবহার। ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে প্রচারের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। অনেকটা পরিবেশসম্মত উপায়ে নির্বাচনি এলাকায় চলছে প্রচার, যেখানে জনগণের ভোগান্তি নেই বললেই চলে। এই আসনের প্রার্থীরা ইসির বেঁধে দেয়া নিয়মের মধ্যে থেকে প্রচার চালাচ্ছেন। নির্বাচনি প্রচারের ক্ষেত্রেও সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইসির নিয়ম মেনে প্রার্থীরা নির্ধারিত স্থানে পোস্টার সাঁটিয়েছেন। শুধু নির্বাচনি ক্যাম্পেই শব্দযন্ত্রের ব্যবহার এবং বেঁধে দেয়া জায়গায় পথসভা করার কারণে জনগণের ভোগান্তি কমে এসেছে।
তবে নির্বাচনি কোনো উত্তাপই দেখা যাচ্ছে না ঢাকা-১০ আসনে। করোনা একেবারে ম্রিয়মান করে দিয়েছে উপনির্বাচনকে। এর ওপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা করোনার কারণে জনসমাগমে যেতেই চাচ্ছেন না। এর প্রভাব পড়েছে নির্বাচনি প্রচারণায়। এতে হতাশ হয়ে পড়েছেন ঢাকা-১০ আসনের আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা।