প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : মুজিববর্ষে আধুনিক সড়ক যোগাযোগে নতুন যুগের সূচনা

মো. শহীদ উল্যাহ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষের প্রাক্কালে ১২ মার্চ যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-ভাঙ্গা রুটে দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করেছেন। এর ফলে দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা হলো।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে নবনির্মিত বিশ্বমানের এই এক্সপ্রেসওয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনকালে বলেন, এটি দেশের প্রথম নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ে। তিনি এটিকে ‘জাতির জন্য মুজিববর্ষের উপহার’ বলেও উল্লেখ করেন।
ভ্রমণের সময় কমানোর পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য আরামদায়ক ও নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মুজিববর্ষের প্রাক্কালে বাংলাদেশ আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রে নতুন এক যুগে প্রবেশ করলো।
আন্তর্জাতিক মানের এই এক্সপ্রেসওয়ে দুটি সার্ভিস লেনের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীকে যুক্ত করবে। এখন মাত্র ২৭ মিনিটে ঢাকা থেকে মাওয়া যাওয়া যাবে।
প্রকল্পসূত্রে জানা যায়, এক্সপ্রেসওয়েতে ৫টি ফ্লাইওভার, ১৯টি আন্ডারপাস এবং প্রায় ১০০টি সেতু ও কালভার্ট রয়েছে, যা দেশের ব্যবসাবাণিজ্য বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। মাওয়া থেকে ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এবং ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাচ্চর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে পুরো খুলনা ও বরিশাল বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের একটি অংশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বরিশাল বিভাগের ৬ জেলা, খুলনা বিভাগের ১০ জেলা এবং ঢাকা বিভাগের ৬ জেলাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২২টি জেলার মানুষ সরাসরি এই এক্সপ্রেসওয়ে থেকে উপকৃত হবেন।
এক্সপ্রেসওয়ের দুটি অংশ ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মাসেতুর সঙ্গে সংযুক্ত হবে, যা বর্তমানে নির্মাণাধীন। গত ১০ মার্চ দেশের দীর্ঘতম পদ্মাসেতুর ২৬তম স্প্যান বসানো হয়েছে। এতে সেতুর ৩৯০০ মিটার বা প্রায় ৪ কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে ট্রাফিকের জন্য পদ্মাসেতু চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে, ভাঙ্গা থেকে ঢাকা আসা ও যাওয়ায় এক ঘণ্টারও কম সময় লাগবে।
এই হাইওয়েতে আগামী ২০ বছরের জন্য ক্রমবর্ধমান ট্রাফিকের পরিমাণ বিবেচনা করে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে প্রায় ১১ হাজার ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মিত হয়েছে।
এই প্রকল্পে প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ হাজার ২৫২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। পরে সংশোধিত ডিপিপিতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৮৯২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর বাইরে মূল প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়নি এমন কিছু কাজের জন্য ২০১৮ সালের জুনে ৪ হাজার ১১১ কোটি টাকার আরেকটি পৃথক ডিপিপি অনুমোদন করে সরকার। এ ডিপিপি অনুযায়ী কাজের মেয়াদ ধরা হয় ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। দুটি ডিপিপি মিলিয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে মোট ব্যয় হয় প্রায় ১১ হাজার ৪ কোটি টাকা।
জানা গেছে, এক্সপ্রেসওয়ের পোস্তগোলার যে অংশে রেলপথ এড়িয়ে যান চলাচলের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, আগে সেখানে যানজট লেগেই থাকত। এখন সব যানবাহন ওপর দিয়েই যাচ্ছে। দূরের গাড়ি ঢাকায় ঢুকতে এখানে দীর্ঘসময় আটকে থাকত, এখন আর এই এলাকায় যানজট নেই। এই এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করতে টোল দিতে হচ্ছে সব ধরনের যানবাহনকে।
পদ্মাসেতু চালু হওয়ার পর এক্সপ্রেসওয়েটির মাধ্যমে ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা যেতে সময় লাগবে মাত্র ৪২ মিনিট। ঢাকা থেকে মাওয়া যেতে সময় লাগছে মাত্র ২৭ মিনিট।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগের সদস্যদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত মহাসড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে করিডোরের অন্তর্ভুক্ত। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল। স্থানীয় ও ধীরগতিসম্পন্ন যানবাহনের জন্য এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশে দুটি পরিসেবা লেন রাখা হয়েছে, যাতে দ্রুতগামী যানবাহনগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে রাস্তায় চলাচল করতে পারে এবং দীর্ঘ পথের যাত্রীদের ভ্রমণের সময় কমে আসে। তাছাড়া পরিসেবা লেনগুলোও তৈরি করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যৌথভাবে ২০১৬ সালে ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করে এবং নির্ধারিত সময়সীমার ৩ মাস আগে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ২০২০ সালের ২০ জুন।
এক্সপ্রেসওয়ের ৫টি ফ্লাইওভারের মধ্যে একটি ২ দশমিক ৩ কিলোমিটার কদমতলী-বাবুবাজার লিংক রোড ফ্লাইওভার রয়েছে। অন্য ৪টি ফ্লাইওভার হলো আবদুল্লাহপুর, শ্রীনগর, পুলিয়াবাজার ও মালিগ্রামে। তাছাড়া ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়েতে জুরাইন, কুচিয়ামোড়া, শ্রীনগর ও আটিতে ৪টি রেলওয়ে ওভারব্রিজ রয়েছে এবং কয়েকটি বড় সড়কসেতু রয়েছে; যার মধ্যে ৩৬৩ মিটার দীর্ঘ ধলেশ্বরী-১, ৫৯১ মিটার দীর্ঘ ধলেশ্বরী-২, ৪৬৬ মিটার দীর্ঘ আড়িয়াল খাঁ এবং ১৩৬ মিটার দীর্ঘ কুমার সেতু অন্যতম।
দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এই এক্সপ্রেসওয়ে ধরে যানবাহনগুলো কোনো ধরনের বাধা বা ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই সরাসরি গন্তব্যে যেতে পারছে। এর পাশাপাশি আশপাশের এলাকার জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য ধীর গতির যানবাহন চলাচলের জন্যও পৃথক লেন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে সড়কে যানচলাচলের ক্ষেত্রে কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হবে না।
স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এক সময় এই ভাঙ্গা পর্যন্ত যেতে হলে আমাদের গোপালগঞ্জ যেতে স্টিমারেই ২৪ ঘণ্টা লাগতো। লঞ্চে সময় লাগতো আরো বেশি। এমনকি ১৯৮১ সালে যখন দেশে ফিরে আসি তখনো সেই অবস্থাই ছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু সড়ক নয়, নৌ, বিমান ও রেলপথেরও উন্নয়ন করছে তাঁর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের উদ্যোগ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা জানেন, এই পদ্মাসেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল। আমি সেটা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। কানাডার কোর্টে প্রমাণ হয়, পদ্মাসেতুতে কোনো দুর্নীতি হয়নি। এটা আমাদের জন্য অনেক সম্মানের।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের বড় বড় প্রকল্প বাংলাদেশের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করবে, এ ধরনের আধুনিক সড়কপথ নির্মাণ হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার চিত্রও পাল্টে যাবে। এখন থেকে খুব দ্রুত টুঙ্গিপাড়া যেতে পারব। এ মাসেই আমি টুঙ্গিপাড়া যাব। তখন এক্সপ্রেসওয়ে দেখা যাবে।
পদ্মাসেতু নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শুধু বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ খ-নই করিনি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে যাচ্ছি। আমরা নিজেরা করতে পারি Ñ এই একটা সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সারা বিশ্বে সকলের কাছে একটা সম্মান পেয়েছে।
শেখ হাসিনা দেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী জাপানে তাঁর প্রথম সফর স্মরণ করে বলেন, আমি প্রথমবার সরকার গঠন করে জাপান যাই। তখন পদ্মা ও রূপসা সেতু নির্মাণের জন্য তাদের অনুরোধ করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুও ১৯৭৩ সালে জাপান সফরে গিয়ে যমুনা সেতু নির্মাণের কথা বলেছিলেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে যমুনা সেতু নির্মাণের ফিজিবিলিটি স্টাডি করে দেয় জাপান, যার পরিপ্রেক্ষিতে পরে যমুনা সেতু নির্মাণ করা হয়। পরে জাপান পদ্মাসেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডিও করে দেয়।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ক্ষমতায় আসার পর দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করেছি, যাতে ঢাকা থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত জনগণ নিরবিচ্ছন্নভাবে চলাচল করতে পারে।
সরকার যোগযোগব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করতে চায় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সেজন্য সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, আন্ডারপাস, ওভারপাস নির্মাণ কাজ অব্যাহত রয়েছে।
এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানের এই এক্সপ্রেসওয়ে দুইটি সার্ভিস লেনের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীকে যুক্ত করবে। ভ্রমণের সময় কমানোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর জনগণের জন্য আরামদায়ক ও নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমে মুজিববর্ষের প্রাক্কালে বাংলাদেশ যোগাযোগ ক্ষেত্রে এক নতুন যুগে প্রবেশ করল।
অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্রকল্প বিষয়ে তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন। রেলপথ মন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পিএমওর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক জুয়েনা আজিজ, সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রেসসচিব ইহসানুল করিম অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।