কলাম

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশে জনগণের সার্বভৌমত্ব

অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার গোস্বামী : (শেষ অংশ)
জনগণ
বস্তুত রোমের উচ্চ শ্রেণির এলিটগণ জনগণকে একটি বিমূর্ত ধারণা হিসেবে গণ্য করতেন এবং একে নগরের বা রাষ্ট্রের নিত্যনৈমিত্তিক মেজাজ বা মানসিক পরিস্থিতি যেমন ভিড় হতে পার্থক্য করতেন। প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের বিখ্যাত বাগ্মী, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ এবং ল্যাটিন ভাষায় বিখ্যাত গদ্য রচয়িতা মার্কুস টুল্লিয়াস সিসেরো (১০৬-৪৩ খ্রি.পূর্ব) রাষ্ট্রকে ‘দ্য অ্যাফেয়ার অব দি পিপল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে জনগণ হচ্ছে একটি স্ব-শাসিত সংগঠন, যার নিজেকে টিকিয়ে রাখা এবং এর অস্তিত্ব অব্যাহত রাখার ক্ষমতা আছে। সিসেরা বলছেন, ‘অ ঢ়বড়ঢ়ষব রং ধ ংবষভ-মড়াবৎহরহম ড়ৎমধহরুধঃরড়হ, যিরপয যধং হবপবংংধৎরষু ঃযব ঢ়ড়বিৎং ঃড় ঢ়ৎবংবৎাব রঃংবষভ ধহফ পড়হঃরহঁব রঃং বীরংঃবহপব: ঝধষঁং ঢ়ড়ঢ়ঁষর ংঁঢ়ৎবসধ ষবী বংঃড়’ অর্থাৎ, জনগণ হচ্ছে স্বশাসিত সংগঠন, নিজেকে রক্ষা করার এবং নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার ক্ষমতা যার আছে: জনগণের নিরাপত্তা বিধান এবং কল্যাণ সাধন হওয়া উচিত সর্ব্বোচ্চ আইন।
রাজনৈতিক ক্ষমতা যখন সঠিক ও আইনগতভাবে প্রয়োগ করা হয় তখন তা প্রকৃতপক্ষে জনগণের করপোরেট ক্ষমতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। রোমের জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিল এবং যেমনটি রোনাল্ড সাইম (২০০২) বলছেন, তারা ছিল মুক্ত রিপাবলিকের সার্বভৌম জনগণ ‘…আর যার প্রতি তারা সন্তুষ্ট তাকেই সমর্থন করত। সুতরাং বঞ্চিত জনগণের মধ্যে জনপ্রিয়তা ছিল অপরিহার্য। ‘…পড়হভবৎৎবফ রঃং ভধাড়ৎং ড়হ যিড়স রঃ ঢ়ষবধংবফ. চড়ঢ়ঁষধৎরঃু রিঃয ঃযব ঢ়ষবনং ধিং ঃযবৎবভড়ৎব বংংবহঃরধষ.’
এডমান্ড বার্ক (১৭২৯-৯৭)-এর মতে জনগণ হচ্ছে একটি সংগঠিত গোষ্ঠী: এর একটি ইতিহাস এবং কতিপয় প্রতিষ্ঠান আছে, প্রথানুযায়ী কর্মানুষ্ঠানের পদ্ধতি, অভ্যাসগত কর্তব্যনিষ্ঠা, আনুগত্য ও কর্তৃত্ব আছে। এটি হচ্ছে একটি বিশুদ্ধ ‘সুবিবেচনাপূর্ণ রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য’ (ঢ়ড়ষরঃরপ ঢ়বৎংড়হধষরঃু).
১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে তৎকালীন বাংলাদেশের বঞ্চিত জনগণ বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের প্রতিই তাদের অবিভাজ্য সমর্থন ব্যক্ত করেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশ তাই বঞ্চিত জনগণের সার্বভৌমত্বসম্পন্ন রাষ্ট্র, যা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।

জনগণের সার্বভৌমত্ব ও বাংলাদেশ
জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির মাধ্যমে উদ্ভূত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি তথা একটি রাষ্ট্র আর একটি রাষ্ট্রের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না Ñ এমন ধারণা থেকে আলাদা।
জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি মূলত আধুনিক গণতান্ত্রিক চেতনা থেকে উৎসারিত। ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে সার্বভৌমত্বের নীতি অনুযায়ী ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারিত হয়ে থাকে। সে সময় অর্থাৎ ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে বাংলাদেশে নবাব আর বারো ভূঁইয়াদের শাসন ছিল, যদিও জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো বিদেশি ধারণা নয়। সংস্কৃত, সাহিত্যে এবং বিশেষত কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্রে’ বারবার বলা হয়েছে যে, ‘রাজাকে অবশ্যই জনমতের কাছে নতি স্বীকার করতে হবে’ (নেহেরু ১৯৪২: ১৯৯)। আবার মাৎস্যন্যায়ের বৈরী পরিবেশ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য গোপালকে রাজা নির্বাচিত করার অভিজ্ঞতা বাংলার গণতন্ত্রের প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে দেখা যেতে পারে। ইতিহাসের পাতা থেকে এদেশে জনগণের সার্বভৌমত্বের এইসব প্রাচীন নিদর্শন হাজির করা গেলেও স্বাভাবিক পরিবেশে সুদীর্ঘকালব্যাপী এদেশে রাজনীতি সম্পর্কে জনগণের অনীহার উদাহরণও সুবিদিত।
বর্তমানে প্রচলিত জনগণের সার্বভৌমত্বে বিষয়টি ইংরেজ আমলের পূর্বে অজ্ঞাত ছিল। এমনকি ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজদের সেনাবাহিনীর সাথে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বাহিনীর যে যুদ্ধ হয়েছিল সেখানে বাঙালিদের কোনো অংশগ্রহণই ছিল না। এখানে পক্ষে-বিপক্ষের সবাই ছিল অবাঙালি অথচ পলাশীর যুদ্ধ ছিল বাংলা তথা বাঙালির জন্য ভাগ্যনির্ধারণী যুদ্ধ। বলা হয়ে থাকে, পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষের ভাগ্যাকাশ থেকে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। অথচ বাস্তব কথা হচ্ছে, জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা তখনকার বাংলায় ছিল অনুপস্থিত। জনপ্রিয় লোকসংগীতের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যেতে পারে, যেখানে বলা হচ্ছে ‘চাই না মাগো রাজা হতে, রাজা হবার স্বাদ নাই মাগো, পাই যেন দু’বেলা খেতে…।’
এর দ্বারা বোঝা যায় এদেশের মানুষ নিজের দেশ শাসনের নিমিত্তে রাজা হতে চায় না, তাই বিদেশিদের শাসনে তাদের অনাপত্তিটা সহসাই প্রকাশিত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ সে সময়ের বাংলার জনগণ শাসনকার্য সম্পর্কে তেমন আগ্রহী ছিল না।
বর্তমান অর্থে ‘জনগণ’ হয়ে ওঠার পূর্বে বিশে^র এ অঞ্চলের মানুষের ওপর নিকট-অতীতে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের পরিচালিত শোষণের বিষয়টি সুবিদিত। তবে এর অনেক অনেক পূর্বে থেকে এদেশের জনগণের ওপর অনেক অন্যায়-অত্যাচার আর দুঃখ-কষ্টের বন্যা বয়ে গিয়েছে। আর বাঙালিদের তা মুখ বুজে সইতে হয়েছে। কখনো কখনো হয়ত এর একটা প্রতিকার হয়েছে, কিন্তু তা ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী।
এ ব্যাপারে আমরা ইতিহাসের মাৎস্যন্যায়ের সময়ের কথা উল্লেখ করতে পারি। ইতিহাসবিদ তারনাথ একটি কাহিনি উল্লেখ করেছেন। কাহিনিটি এ রকম Ñ সেকালের বাংলাদেশে বহুদিন যাবৎ অরাজকতার ফলে জনগণের দুঃখ-কষ্টের সীমা ছিল না। এর প্রেক্ষিতে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ মিলিত হয়ে আইনানুগ শাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে একজন রাজা নির্বাচিত করেন। কিন্তু রাজা রাত্রিতে এক কুৎসিত নাগ রাক্ষসী কর্তৃক নিহত হন। অবশেষে চু-াদেবীর এক ভক্ত এক বাড়িতে আসেন। সেই বাড়ির সকলে খুব বিষন্ন ছিল। কারণ, ওইদিন নির্বাচিত রাজা হওয়ার ভার পড়েছে ওই বাড়িরই এক ছেলের ওপর। আগন্তুক ওই ছেলের স্থলে রাজা হতে রাজি হন। সে এক রুদ্ধশ^াস ঘটনা! সবাই ভাবে, আগন্তুক রাত্রে রাক্ষুসী কর্তৃক নিহত হবেন এবং প্রত্যুষে তার লাশ পাওয়া যাবে। কিন্তু পরের দিন সকালে সেই ব্যক্তিকে বেঁচে থাকতে দেখে সব মানুষ বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ে। কীভাবে তিনি নাগ রাক্ষুসীর হাত থেকে বেঁচে থাকতে সক্ষম হলেন তা জানতে চাইলে তিনি জানালেন, রাত্রে নাগ রাক্ষুসী তাকে মারতে এলে তিনি চু-াদেবীর মহিমাযুক্ত এক লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করেন এবং তাতে রাক্ষুসী মারা যায়! তার এই অভূতপূর্ব যোগ্যতার কারণে মানুষ আনন্দিত হয় এবং তাকে রাজা নির্বাচিত করে। তার নাম দেয়া হয় ‘গোপাল’।
এদেশে গণতন্ত্রের আদি নিদর্শন হিসেবে জনগণের সম্মতিতে ‘গোপাল’-এর রাজা হয়ে ওঠার ঘটনা উল্লেখ করা হয়। এখন বাংলাদেশে যে গণতান্ত্রিক নির্বাচন চলছে সেই নির্বাচনের স্বাদ, কিছুটা ভিন্নভাবে বা ভিন্ন আঙ্গিকে বাঙালি বহুকাল আগে থেকেই পেয়ে আসছে।
এখানে আর একটি বিষয় লক্ষণীয়, তা’ হলো দুঃসময় অতিক্রম করার জন্য বাঙালি গণতন্ত্রকেই আঁকড়ে ধরেছে, যদিও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসনব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের মনোযোগ খুব একটা দৃশ্যমান হতো না। যেমন জনগণের সমর্থনপুষ্ট গোপাল রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। খালিসপুর লিপির শ্লোক আর তারনাথের লেখার ওপর ভিত্তি করে রচিত ইতিহাস অনুযায়ী রাজা গোপাল বাংলাদেশে এক বাঙালি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। আবার এটিও একটি শক্তিশালী মত যে, রাজা গোপাল যেহেতু জনগণের সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত হয়েছিলেন সেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি গণতন্ত্রের একটি উদাহরণ। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, রাজা গোপালের শাসনকাল তথা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনকাল ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ থেকে ১৮৫৭ সালে সংঘটিত প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল না। ব্রিটিশ শাসনের ফলে উপমহাদেশের অর্থনীতি, দেশীয় শিল্প, কৃষি ধ্বংস হয় এবং জনগণকে দারিদ্র্যের পরিস্থিতিতে নিয়ে যায়। এসময় ব্রিটিশদের মূল লক্ষ্য ছিল তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব স্থায়ী করা। এদেশের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নের দিকে ইংরেজদের কোনো নজর ছিল না। জনগণকে তারা খুব নীচু মনে করত এবং ‘কালারড’ জনগণকে শাসন করার জন্য ‘সাদা মানুষের বোঝা’ [হোয়াইট মেন’স বার্ডেন/ডযরঃব সবহ’ং নঁৎফবহ.] এর মতো জঘণ্য তত্ত্বের প্রচারণা চালাতো।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সমাজের অধঃপতন, ঐক্যের অভাব এবং জনগণের মধ্যে জাতীয় সচেতনতার অভাব প্রভৃতি ব্যবসাবাণিজ্য উপলক্ষে আসা ইংরেজদেরকে এদেশে শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে সাহায্য করেছিল। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশরা সমগ্র উপমহাদেশের প্রশ্নহীন প্রভূতে পরিণত হয়ে যায়। ব্রিটিশরা যখন এদেশে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা সংহত করতে ব্যস্ত ছিল সেসময়টা এদেশের অন্ধকারতম সময় হিসাবে গণ্য। সাংঘাতিকভাবে স্তরবিন্যাসকৃত সমাজের সাথে বিভিন্ন পদসোপান এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রথা এবং রীতি-নীতি, নিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণবিধি ব্যক্তিকে সম্পূর্ণরূপে অধীনস্ত করে তুলেছিল। এ অবস্থায় একজন ব্যক্তি, যে ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে জনগণ গড়ে ওঠে, সম্পূর্ণ অসহায় ও অস্থির হয়ে পড়েছিল। ফলে সুবিধাভোগী শ্রেণির হাতে জনগণ বিচ্ছিন্ন, শোষিত ও নির্যাতিত হচ্ছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে যথার্থই বলেছেন যে, জনগণের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন দেশে জাতীয় সচেতনতা জন্ম ও বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করেছে। সামাজিক এবং ধর্মীয় কুসংস্কার, ধর্মীয় ও সামাজিক কড়াকড়ি নিয়মকানুন ও প্রথার প্রতি অন্ধ আনুগত্য চরমভাবে স্তরীকৃত সমাজকে অব্যাহতভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। জনগণের সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনা দূরীকরণের জন্য জনগণের মধ্যে ঐক্য এবং জাতীয় সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উপমহাদেশে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার এদেশের শিক্ষিত মানুষকে কুসংস্কারমুক্ত করতে সাহায্য করেছে। ইংরেজি শিক্ষা এদেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিয়মকানুন দ্রুত পরিবর্তনের প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এ সচেতনতা সহসাই রাজনৈতিক সচেতনতায় পর্যবসিত হয়। আর এই রাজনৈতিক সচেতনতাই পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে জনগণকে সংগঠিত হতে প্রেরণা যুগিয়েছে, পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথ ধরে এদেশে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ধারণা জনগণের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে।
রাজনৈতিক দলের নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, বিভিন্ন সংস্কারমূলক কর্মকা-, ব্রিটিশ কর্তৃক প্রণীত বিভিন্ন আইন এবং এই আইনের আওতায় অথবা আইনকে অমান্য করে গড়ে ওঠা আন্দোলন-সংগ্রামের দ্বারা এদেশের মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হওয়ার সাথে সাথে এদেশে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথ করে নিয়েছে, ব্রিটিশ শাসনাধীন উপমহাদেশে ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। সর্বভারতীয় জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসাবে নিজেদের কর্মসূচি বাস্তবায়নে অসমর্থ কংগ্রেসের পাশাপাশি মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা, সব মিলিয়ে উপমহাদেশে ১৯৪৭ সালের মধ্য আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি দেশ স্বাধীনতা লাভ করে।
উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর থেকে পাকিস্তানের শাসনাধীনে বাংলাদেশ ছিল প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের ধর্মীয় উপনিবেশ। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসলাম ধর্মাবলম্বী বলেই (পূর্ব) বাংলা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়েছিল। এখানে অন্য আর কোনো কারণই নেই। ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক প্রভৃতি দিক দিয়ে বাঙালিদের ওপর চলে সীমাহীন বঞ্চনার মহড়া। এর প্রতিবাদে বাঙালিরা প্রতিবাদ করেছে, সংগঠিত হয়েছে এবং সবশেষে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীনতা অর্জন করে। ভাষা আন্দোলন থেকে যদি আমরা শুরু করি তাহলে দেখব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন সংগঠিত করার কাজে এগিয়ে যাচ্ছেন। কারা নির্যাতন ভোগ করছেন। তিনি তাঁর মাতৃভাষা বাংলাকে, স্বজাতি বাঙালি জাতিকে এবং মাতৃভূমি বাংলাদেশকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। ফাঁসির মঞ্চে যেয়েও তিনি বাঙালি, বাংলা ভাষা এবং বাংলাদেশকে নিজের দেশ হিসেবে বলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ‘করডন’ প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পক্ষে আন্দোলন করার দায়ে প্রদত্ত শাস্তি মওকুফের জন্য সবাই বললেও বঙ্গবন্ধু তা করেননি। ভাষা আন্দোলন, মুসলিম লীগের অপশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের সংগঠন প্রতিষ্ঠা, সেই সংগঠন থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে জয়লাভ প্রভৃতির মাধ্যমে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৫৬ সালের ১৪ জুলাই আওয়ামী লীগের সভায় প্রশাসনে সামরিক আইনের বিরোধিতা, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান রাষ্ট্রদ্রোহী (পাকিস্তানদ্রোহী) আসামি, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু এই প্রতিটি আন্দোলনকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সংগঠিত ও পরিচালনা করেছেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এদেশের জনসাধারণ রাস্তায় বেরিয়ে এসে আন্দোলন করেছে। এই আন্দোলন বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে অবশেষে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে উপনীত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আর ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর ৩০ লক্ষেরও বেশি তাজা প্রাণ, আড়াই লক্ষেরও বেশি মা-বোনের সম্ভ্রম এবং কয়েক হাজার ভারতীয় সৈন্যের প্রাণের বিনিময়ে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সোনালি সূর্য বাংলার ভাগ্যাকাশে উদিত হয়।
জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা প্রচেষ্টার কন্টকাকীর্ণ পথ পরিক্রমণের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম অস্তিত্ব লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। এর জন্য জনগণের সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে। সুদীর্ঘ কালব্যাপী এদেশের জনগণ শোষিত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত হয়েছে। এই বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করার চেষ্টা যুগে যুগে হয়েছে। কিন্তু তা পুরোপুরি সফলতা পায়নি। ১৯৪৭ সালের পর থেকে বঙ্গবন্ধু যেভাবে জনগণকে সংগঠিত করেছেন এবং তাঁর প্রতি আস্থা স্থাপিত হওয়ার পরে জনগণ তাঁর আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছে বলেই ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্ভব হয়েছে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাও বাস্তবের রূপ দেখতে পেরেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের অন্যান্য অধ্যায় বা অনুচ্ছেদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় চার মূল নীতি Ñ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের মধ্যে ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব’-এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। এই চার মূলনীতির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ১৯৭৩ সালের ১৭ জুলাই বঙ্গবন্ধুর সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিল্লুর আর. খানের সাক্ষাৎকারের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। এই সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘গণতন্ত্র মানে হচ্ছে জনগণের ইচ্ছার সুপ্রিমেসি; শাসিতের সম্মতির ভিত্তিতে গঠিত সরকার এবং জনগণের জন্য অন্যান্য জনপ্রিয় স্বাধীনতা, যা হৃদয় ও মনের বিকাশের জন্য প্রয়োজন। অন্যরা গণতন্ত্রের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে পারে এবং এভাবে গণতন্ত্রের অসংখ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব। গণতন্ত্রের প্রতি আমার আস্থার পাশাপাশি আমি এটাও বিশ^াস করি যে একটি শোষণমুক্ত সমাজেই কেবল গণতন্ত্র কার্যকর থাকতে পারে। আর এই জন্যই প্রয়োজন সমাজতন্ত্র। আমি এটাও বিশ^াস করি যে, বাংলাদেশের সব ধর্ম সমান মর্যাদায় টিকে থাকবে এবং তাই ধর্মনিরপেক্ষতা দ্বারা সব ধর্মের স্বাধীনতা বুঝায়। আর আমি এটাও চাই যে বাংলাদেশের মানুষ বাঙালি সংস্কৃতি, ভাষা, লোককাহিনি এবং সাধারণ বাঙালি পরিবেশ থেকে উৎসাহ-উদ্দীপনা গ্রহণ করুক। এই ধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা সোনার বাংলা গড়ার কাজে বাঙালিদের মটিভেটিং শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আর এটাই হচ্ছে জাতীয়তাবাদ।’
মূলত স্বাধীনতা তথা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এদেশে জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা আস্তে আস্তে জাগ্রত হয়েছে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে কাজ করেছে রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক দলের নেতা। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সংগঠনে মতিলাল নেহেরু, নেতাজী সুভাষ বোস, জওহরলাল নেহেরু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল প্রমুখ নেতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু সেসব নেতার অবদান মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে সমন্বিত হয়ে সে দেশে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেস এক সময় ব্যাপক গণভিত্তি লাভ করতে পারেনি। ১৯১৪ সালে মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে প্রত্যবর্তন করেন। ওই সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কংগ্রেসের কোনো শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি না থাকায় এই দলটি আন্দোলন সংগঠনে তেমন সুবিধা করতে পারছিল না। প্রধানত শহরে স্বল্পশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত এমন ধরনের যোগাযোগের মাধ্যমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের নেতৃত্বের ছিল না তেমন কোনো ব্যাপক বিস্তৃত অনুসারী গোষ্ঠী অথবা সাংগঠনিক সমর্থন। এ সময় উদার নিয়মতান্ত্রিক এবং চরম উগ্রপন্থি উভয় ধরনের নেতৃবৃন্দ প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হন। এতে দেশে এক ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হয়। আর এই শূন্যতা পূরণ হয় ভারতীয় রাজনীতিতে একজন তাৎপর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে।’ (গোস্বামী ২০০৭:২৩৪)।
জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবদানের গুরুত্ব অনুধাবন করে সে দেশে তাঁকে ‘বাপুজী’ বলে সম্বোধন করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ তিনি ভারতের জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু ও মহাত্মা গান্ধীর রাজনীতি ও আন্দোলন স্থান, কাল ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হওয়ায় তাদের অভিজ্ঞতা ও কর্মক্ষেত্র সম্পূর্ণ আলাদা। এতদসত্ত্বেও ভারতে যেমন মহাত্মা গান্ধী তেমনি বাংলাদেশে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও তা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ও অবস্থান সমহিমায় ভাস্বর।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সংগঠিত জনগণের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জনগণের সার্বভৌমত্বসম্পন্ন বাংলাদেশ।
(শেষ)
লেখক: চেয়ারম্যান
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ও পরিচালক
সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়