কলাম

বাংলাদেশের কবিতা ও রাজনৈতিক চেতনায় ৭ই মার্চ

অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস : বিভাগোত্তর কালে ১৯৪৭-৫৮ সালের ঘটনাপ্রবাহে নবোদ্ভূত মধ্যবিত্তের মোহ ও মোহভঙ্গ, শোষণ ও চক্রান্তের ফলে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার চেতনার উজ্জীবন ঘটে পূর্ববাংলার জনগোষ্ঠীর মধ্যে। মূলত এ সময়ের কালানুক্রমিক ইতিহাস বাঙালির জীবনাভিজ্ঞতার রক্তাক্ত অধ্যায়। একদিকে ব্রিটিশ রাজশক্তির সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষ ভারতবিভাগ, অন্যদিকে দেশবিভাগের ফলস্বরূপ বাংলাভাষী অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলের পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্তি Ñ এই রাজনৈতিক মীমাংসা অবিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চলের মধ্যবিত্তশ্রেণির জন্য ছিল অসঙ্গত, ঐতিহাসিক ধারার পরিপন্থি একটি সিদ্ধান্ত। কি অর্থনৈতিক, কি রাজনৈতিক-সামাজিক কোনো দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব-পাকিস্তানের সমক্ষক ছিল না। এজন্য পশ্চিম পাকিস্তানের ধূর্ত শাসকগোষ্ঠী এবং আধুনিক শিক্ষাবিবর্জিত সামন্ত-মূল্যবোধ ও অর্থনৈতিক বিন্যাসের সুযোগপ্রাপ্ত ঢাকার নবাব পরিবার ও তাদের কতিপয় অনুসারী পূর্ববাংলাকে আধা-ঔপনিবেশিক ও আধা-সামন্তবাদী সমাজরূপে গড়ে তুলতে চাইল। এক্ষেত্রে ধর্ম তাদের মূল হাতিয়ার হিসেবে দেখা দিল। এসময় পূর্ববাংলা ভূখ-ে দু’শ্রেণির মধ্যবিত্তের আত্মপ্রকাশ ঘটল। এক শ্রেণি সামন্ত মূল্যবোধআশ্রয়ী ধর্মীয় ঐক্যের মানদ-ে স্বাগত জানাল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে; অন্যদিকে বাংলাদেশে নব্যশিক্ষিত প্রগতিশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রত্যাখ্যান করল ধর্মকেন্দ্রিক, পাকিস্তানি শাসকবর্গের জাতিশোষণ, শ্রেণিশোষণ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসী মনোভাবকে। পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই মোহভঙ্গের ফলে ঢাকা নগরকেন্দ্রিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণি ভাষার প্রশ্নে প্রথম প্রতিবাদ করে ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে। অন্যদিকে ১৯৪৭-৫১ সময়প্রবাহে পাকিস্তানশাসিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ঘটে একাধিক ঘটনা। বিভাগোত্তরকালে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার ভিত্তিতে বহুসংখ্যক মুসলিম বাস্তুচ্যুত পরিবারের পূর্বাঞ্চলে আগমন এবং পরবর্তী সময়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগ জনজীবনকে করে তোলে দুর্বিষহ। জনগণ মৌলিক চাহিদাগুলো থেকে বঞ্চিত হয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সরকারের ভ্রান্ত খাদ্যনীতি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাঙালির জন্য রীতিমত অত্যাচারের ভয়াল রূপ হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে। ভাষা প্রশ্নে ১৯৪৮ সালের মার্চের প্রতিবাদের পথ বেয়ে ১৯৪৯-এ জন্ম হয় আওয়ামী মুসলিম লীগের। এই রাজনৈতিক সংগঠনটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান অনুঘটক। অন্যদিকে বিভাগোত্তর কালের কমিউনিস্ট পার্টির একমাত্র প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ’ ক্রমশই কমিউনিস্ট বিপ্লবের দ্বিধাবিভক্তি ও তাত্ত্বিক বিতর্কের ফলে ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা জেলায় এর অস্তিত্ব একেবারে হারিয়ে ফেলে।
কেন্দ্রীয় সরকারের দমননীতি ও বাংলাদেশকে পাকিস্তানের নতুন-কলোনিতে পরিণত করার চক্রান্তে এবং রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে যে ষড়যন্ত্র ও বিতর্ক উত্থাপিত হয়, এরই ফলে সংগঠিত হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ এই কালক্রমিক ঘটনাপ্রবাহে পাকিস্তানের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তদান ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব জানান দেয়ার ঘটনা।
দেশ-বিভাগোত্তর কেন্দ্রীয় প্রশাসনের রাজনৈতিক কূটজাল, অত্যাচার, নিপীড়ন, ধর্মীয় কলহ ও দুর্নীতির ভয়াবহ বিস্তারের বিরুদ্ধে বাঙালির ঐক্য ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় অনিবার্য করে তোলে। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা গঠিত হলেও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের চক্রান্তে বাংলাদেশের খাদ্যপরিস্থিতির অবনতি এবং বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দাঙ্গার সৃষ্টি করে ১৯৫৪ সালের মে মাসে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা পরিকল্পিতভাবে বাতিল করা হয়। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক প্রশাসনের বিচিত্রমুখী ষড়যন্ত্রের পরে দেশে সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখলের ঘটনা ঘটে। সামরিক শাসক দেশের রাজনীতি, সং¯ৃ‹তি, সাহিত্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়।
মূলত দেশবিভাগ থেকে ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তী ৫ বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ দ্বন্দ্ব-জটিল হলেও এর সাংস্কৃতিক পরিম-লটি ছিল সকল বিকৃতি, কুসংস্কার, কূপম-ুকতা এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায়গত সকল প্রকার বৈরীভাবের বিরুদ্ধে মানবতার আদর্শকে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের সকল ক্ষেত্রে মহিমাদীপ্ত করার কাল। এদিক থেকে ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কাগমারিতে পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক সম্মেলনের কথা উল্লেখযোগ্য। রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির এই যোগসূত্র বাংলাদেশের কবিদের আলোড়িত করেছিল স্বাভাবিক কারণে। তবে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ সালের সামরিক জান্তার করতলগত বাংলাদেশের নগর-গ্রামের গণ-জাগরণ এ অঞ্চলের সমাজমানসের প্রগতিশীল রূপান্তরের স্বতন্ত্র মাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এরপর স্বাধিকার অর্জনের পথে ১৯৬৯ পথ বেয়ে ১৯৭১-এর মুক্তিসংগ্রাম দেশবিভাগের পরবর্তী আরেকটি দেশবিভাগের ঘটনাকে ত্বরান্বিত করে দেয়। জন্ম হয় নতুন দেশÑ ‘বাংলাদেশ’। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বিভিন্ন কালানুক্রমিক ঘটনাধারায় আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানসে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবতাবাদী আদর্শ এবং প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক জীবনবোধের বিকাশ ঘটে। কবিরা সেই শ্রেণির অংশ হিসেবে তাঁদের কবিতার ধারায় ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মাণ করেন স্বাধিকারের সপক্ষে আমাদের সমাজমানসের বিচিত্র তরঙ্গ। বঙ্গবন্ধু নিজে কবি ছিলেন না কিন্তু ছিলেন রাজনীতির কবি- ‘রাজনীতির প্রকৌশলী নন মুজিব, মুজিব হচ্ছেন রাজনীতির কবি, বাঙালির স্বাভাবিক প্রবণতা প্রয়োগিক নয়, শৈল্পিক। তাই মনে হয়, বাংলাদেশের সকল মানুষ, শ্রেণি ও মতাদর্শকে এক সূত্রে গাঁথা হয়ত কেবল মুজিবের মতো রাজনৈতিক কবির পক্ষেই সম্ভব।’ বেলাল চৌধুরী বলেছেন, কবিতা একটি জাতির ভাষার স্মৃতি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত কবিতায় বাঙালি জাতির ভাষার স্মৃতি উচ্চকিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মতো মহাপুরুষকে নিয়ে রচিত কবিতায় কবি সমাজ ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য। কারণ, কবিতার মাধ্যমে কবি একাত্মতার বাণী প্রচার করেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের একাত্ম হওয়ার এই বাণী অসংখ্য কবির অজস্র চরণে কখনো শেখ মুজিব, কখনো বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষরিত হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে।
কবিতায় বঙ্গবন্ধুর নাম প্রথম উচ্চারিত হয় নির্মলেন্দু গুণের কবিতায়। তাঁর একাধিক কবিতা কিংবা বলা চলে সবচেয়ে বেশি কবিতায় বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ উচ্চারিত হয়েছে। কবির ‘মুজিবমঙ্গল’ কাব্যে সংকলিত উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো- ‘প্রচ্ছদের জন্য: শেখ মুজিবুর রহমানকে’, ‘সুবর্ণ গোলাপের জন্য’, ‘হুলিয়া’, ‘শেখ মুজিব ১৯৭১’, ‘সেই খুনের গল্প ১৯৭৫’, ‘ভয় নেই’, ‘রাজদ-’, ‘নেড়ী কুত্তার দেশে’, ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’, ‘মুজিব মানে মুক্তি’, ‘শেষ দেখা’, ‘সেই রাত্রির কল্পকাহিনি’, ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’, ‘শোকগাথা: ১৬ আগস্ট ১৯৭৫’, ‘পুনশ্চ মুজিবকথা’, ‘আগস্ট শোকের মাস, কাঁদো’, ‘প্রত্যাবর্তনের আনন্দ’ প্রভৃতি। মুজিবকে বিবেচনায় নিয়ে ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর প্রথম তিনি কবিতা লেখেন ‘প্রচ্ছদের জন্য’ (পরে এটি ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কাব্যগ্রন্থে ‘স্বদেশের মুখ শেফালি পাতায়’ নামে অন্তর্ভুক্ত); তখন শেখ মুজিব কারাবন্দি। ১৯৬৯ সালে রচিত ‘হুলিয়া’ কবিতায় নির্মলেন্দু গুণ তাঁকে নায়কের আসন দান করেন, যাঁকে কেন্দ্র করে বাংলার স্বপ্ন ও আশা-আকাক্সক্ষা আবর্তিত হচ্ছিল তখন। মূলত ১৯৬৭-৬৮ সালে গণ-আন্দোলন যখন সামান্য ভাটা পড়েছে, রাজনৈতিক মহলে বঙ্গবন্ধুর একলা চলার নীতি নিয়ে যখন নানা রকম দোলাচল ও বিভ্রান্তি, ঠিক সেই সময় ‘হুলিয়া’ কবিতায় তিনি লেখেন-
… … …
ওরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবর
Ñ আমাদের ভবিষ্যৎ কী?
Ñ আইয়ুব খান এখন কোথায়?
Ñ শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?
Ñ আমার নামে কতদিন আর এরকম হুলিয়া ঝুলবে? (কাব্যসমগ্র-১, ২০১১: ২৭)
এ সম্পর্কে কবি লিখেছেন- ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমি প্রথম কবিতা লিখেছিলাম ১৯৬৭ সালে, যখন তাঁর নাম ছিল শুধুই শেখ মুজিবুর রহমান। খুব সম্ভবত ঐটি ছিল তাঁকে নিয়ে রচিত প্রথম কবিতা। সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যায়, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে প্রথম কবিতাটি আমার পক্ষে লেখা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। কেননা আমার কবিতা তো তাঁকে অনুসরণ করে এসেছে অনেক আগে থেকেই। তিনি ছিলেন আমার কাব্যের এক প্রধান চরিত্র। দোষে-গুণে মিলে তিনি ছিলেন আমার কবিতার নায়ক। ফলে, নির্মম হত্যাকা-ের ভিতর দিয়ে তাঁর জীবনাবসানের পর তাঁকে নিয়ে প্রথম তো আমারই কবিতা লেখার কথা। এটা ছিল ইতিহাস-নির্ধারিত।’
তিনি এর পরই জানিয়েছেন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর প্রথম কবিতাটি লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধুর বাল্যসুহৃদ মৌলবী শেখ হালিম, আরবি ভাষায়। বঙ্গবন্ধুর মরদেহ কবরস্থ করার পর বাড়ি ফিরে তিনি যা লিখেছিলেন তার বাংলা এরকম-
হে মহান, যার অস্থি-মজ্জা, চর্বি ও মাংস এই কবরে প্রোথিত
যাঁর আলোতে সারা হিন্দুস্তান, বিশেষ করে বাংলাদেশ আলোকিত হয়েছিল
আমি আমার নিজেকে তোমার কবরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করিতেছি, যে তুমি কবরে শায়িত
আমি তোমার মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ দেখেছি, ক্ষমা, দয়া ও দানশীলতা-
নিশ্চয়ই তুমি জগতে বিশ্বের উৎপীড়িত এবং নিপীড়িতদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলে
সেইহেতু অত্যাচারীরা তোমাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছেÑ
আমি/আমরা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের কাছে তাদের বিচারের প্রার্থনা জানাই, যারা তোমাকে বিনা-বিচারে হত্যা করেছে।
আমরা মহান আল্লাহর নিকট তোমার আখিরাতের মঙ্গল কামনা করি। বিদায়! বিদায়! বিদায়! হে মহান জাতির জনক। (কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০১২: ৬০)
নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে তাঁর প্রশস্তিমূলক কবিতা রচনা করেননি; এমনকি ‘বাকশাল’ গঠনকে মেনে নিতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে আহত হৃদয়ে পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি রচনা করেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর প্রথম বাংলা ভাষার কবিতাটি লিখেছিলেন তিনিই। তাঁর এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবৃতি- ‘এ কথা ঠিক যে, বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর অনেকদিন চলে গিয়েছিল, দেশের ভিতরে কোথাও প্রকাশ্যে কেউ তাঁর নাম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে উচ্চারণ করতে পারছিলাম না। এ ব্যাপারে সামরিক শাসকদের কোনো বিধি-নিষেধ আরোপিত না থাকলেও তাদের আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়া অলিখিত বিধি-নিষেধ দেশের মানুষের মধ্যে একটি ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে রেখেছিল। যার ফলে ১৯৭৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কোনো কবিতা পাঠ করার সাহস দেখাতে পারিনি। ১৯৭৬ সালে আমি একুশের কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে পড়েছিলাম ‘ভয় নেই’ নামের একটি কবিতা। ‘৭৫ এর নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকা-ের পর যে ভয় চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, তার চাপ থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করাটাই ছিল ওই কবিতার উদ্দেশ্য। সেই সঙ্গে নিজেকেও ভয়ের আগ্রাসন থেকে মুক্ত করা।
১৯৭৭-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমি যে কবিতাটি পাঠ করি (আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি) সেটি আমি লিখেছিলাম বেশ কিছুদিন আগেই। দু’একটি অনুষ্ঠানে ওই কবিতাটি পাঠ করবার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু ওই সব অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা আমাকে তখন ওই কবিতা পাঠ করার অনুমতি দেননি। আমিও কোনো রাজনৈতিক দল বা তাদের কোনো সাংস্কৃতিক অঙ্গ-সংগঠনকে তাদের অজ্ঞাতসারে কবিতাটি পাঠ করে বিপদে ফেলতে চাইনি। ফলে, কবিতাটি প্রকাশ্যে পাঠ করার জন্য আমাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে কাটাতে হয়। তারপর ভাষা আন্দোলনের ভিতর দিয়ে জন্মগ্রহণ করা, জনগণের প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে একুশের ভোরের কবিতা পাঠের আসরে আমি ওই কবিতাটি পাঠ করার সিদ্ধান্ত নিই এবং অনুষ্ঠানে সমবেত সকলকে চমকে দিয়ে আমি ওই কবিতাটি পাঠ করি। কবিতা পাঠান্তে আমার বুকের মধ্যে চেপে বসা একটি পাথর অপসারিত হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী এবং পরবর্তীকালের বঙ্গ-শাসকদের প্রতি আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ যে, তারা আজ পর্যন্ত ওই কবিতা রচনা এবং পাঠের জন্য আমাকে কোনোরূপ দ- প্রদান করেননি। ওই কবিতা পাঠের পর পুলিশ আমাকে কিছুদিন নাজেহাল করেছিল বটে, কিন্তু তা আমার জন্য এমন অপ্রীতিমূলক কিছু ছিল না। শুধু জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যেই তা ছিল সীমাবদ্ধ।’
Ñ(চলবে)
লেখক: পরিচালক, জনসংযোগ
তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়