প্রতিবেদন

বিশ্বব্যাপী করোনা সংকটেও অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগুচ্ছে পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ: দৃশ্যমান সেতুর ৪ কিলোমিটার

নিজস্ব প্রতিবেদক : করোনা সংকটেও থেমে নেই পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ। যদিও সেতুটির নির্মাণকাজে বেশিরভাগ জনবলের অংশগ্রহণ চীনের, তবে সেতুটিতে কর্মরত কারো মধ্যে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। কর্মরত চীনা শ্রমিক, টেকনিশিয়ান ও প্রকৌশলীরা যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করছেন এবং বাইরে থেকে যারাই পদ্মাসেতুর নির্মাণ এলাকায় যাচ্ছেন, তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় ১০ মার্চ পদ্মাসেতুর ২৬তম স্প্যান বসানো হয়েছে। শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ২৮ ও ২৯ নম্বর পিলারের ওপর বসানো হয়েছে এই স্প্যান। আর এর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হলো পদ্মাসেতুর প্রায় ৪ কিলোমিটার। ২৫তম স্প্যান বসানোর ১৯ দিনের মাথায় ২৬তম স্প্যানটি বসানো হলো।
এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি পদ্মাসেতুতে বসানো হয় ২৫তম স্প্যান।
জানা গেছে, পুরো সেতুতে মোট পিলারের সংখ্যা ৪২টি। প্রতিটি পিলারে রাখা হয়েছে ৬টি পাইল। একটি থেকে আরেকটি পিলারের দূরত্ব ১৫০ মিটার। এই দূরত্বের লম্বা ইস্পাতের কাঠামো বা স্প্যান জোড়া দিয়েই পদ্মাসেতু নির্মিত হচ্ছে। ৪২টি পিলারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। স্প্যানগুলো চীন থেকে তৈরি করে আনা হয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৫০ মিটার দীর্ঘ ও ৩ হাজার ১৪০ টন ওজনের ২৬তম স্প্যানটি বসানোর জন্য ৩ হাজার ৬০০ টন ধারণক্ষমতার ‘তিয়ান-ই’ নামের ভাসমান ক্রেনে করে কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে বহন করে জাজিরা প্রান্তে ২৮ ও ২৯ নম্বর পিলারের কাছে নোঙ্গর করে রাখার পর ১০ মার্চ স্প্যানটি বসানো হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে স্প্যান বসানো হলে ২০২০ সালের জুলাই নাগাদ ৪১টি স্প্যান বসানো শেষ হবে।
জানা যায়, সেতুর মোট ৪২টি পিলারের মধ্যে বর্তমানে কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৩৮টির। সেতুতে ২ হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্ল্যাবের মধ্যে ৭৩৮টি স্ল্যাব বসানো হয়েছে। ২ হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্ল্যাবের মধ্যে ৩৪৪টি স্ল্যাব বসানো হয়েছে। পদ্মাসেতুর মোট ৪১টি স্প্যানের মধ্যে চীন থেকে মাওয়ায় এসেছে ৩৪টি স্প্যান। এর মধ্যে ২৬টি স্প্যান বসে গেছে।
এর আগে ১৪ জানুয়ারি পদ্মাসেতুর জাজিরা প্রান্তে বসানো হয় ২১তম স্প্যান, ২৩ জানুয়ারি মাওয়া প্রান্তে বসানো হয় ২২তম স্প্যান। ২ ফেব্রুয়ারি বসেছে ২৩তম স্প্যান। ১১ ফেব্রুয়ারি বসেছে ২৪তম স্প্যান। আর ২১ ফেব্রুয়ারি ২৫তম স্প্যান বসানো হয়।
প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুসারে, মূল সেতুর কাজ হয়েছে ৮৬.৫০ শতাংশ এবং নদীশাসনের কাজ হয়েছে ৭০ শতাংশ। পুরো প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ। জাজিরা অংশে ১৪টি এবং মাওয়া অংশে ১২টি স্প্যান স্থাপন করা হয়েছে এরই মধ্যে। বাকি খুঁটিগুলোর ওপর বসানো হবে ১৬টি স্প্যান। এ কাজ আগামী জুলাইয়ে শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ উন্নয়নকাজ এগিয়েছে ৮১ শতাংশ, ক্ষতিগ্রস্তদের প্লট দেয়া হয়েছে ২ হাজার ৭৯৩টি।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, পদ্মাসেতুর প্রতিটি পাইলের ভারবহন ক্ষমতা ৮ হাজার ২০০ টন। প্রতিটি পিলারের (পিয়ার) ভারবহন ক্ষমতা ৫০ হাজার টন। পৃথিবীর অন্য কোনো সেতুর পিলারে এত লোড দেয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, এসব পাইল নদীগর্ভে নিয়ে যেতে এর আগে পৃথিবীতে শক্তিশালী কোনো হ্যামার ছিল না। এজন্য ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে হ্যামার তৈরি করে আনা হয়েছে। এ পর্যন্ত এ রকম ৫টি হ্যামার ব্যবহৃত হয়েছে পদ্মায়। তবে এর মধ্যে ২টি বিকল হয়ে গেছে, কাজ চলছে বাকি ৩টি দিয়ে। জার্মান প্রযুক্তির হ্যামারগুলো নেদারল্যান্ডসের একটি কোম্পানি থেকে বিশেষ অর্ডারে আনা হয়েছে।
স্বপ্নের এই সেতুটি যেসব উপাদানে তৈরি হচ্ছে, তাতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। এই সেতু তৈরিতে যে পাথর ব্যবহৃত হচ্ছে, তার একেকটির ওজন ১ টন। পাথরগুলো ভারতের ঝাড়খ- রাজ্যের পাকুর নামক স্থান থেকে আমদানি করা হয়েছে। এসব পাথর এত ভারী ও বড় যে, ১৫ টুকরার বেশি পাথর একটি বড় ট্রাকে তোলা যায় না।
পদ্মাসেতু নির্মাণে যে ওয়ার্কশপ ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্মাণ ওয়ার্কশপ। এর আগে কোনো সেতু তৈরিতে এত বড় কর্মযজ্ঞের প্রয়োজন হয়নি। এখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে রিমোট কন্ট্রোল পদ্ধতিতে ভারী বস্তু ওঠানো-নামানো হয়। পদ্মা পাড়ে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে এই পাইল ও স্প্যান ফেব্রিকেশন ইয়ার্ড (ওয়ার্কশপ) তৈরি করা হয়েছে। যেখানে প্রস্তুত হচ্ছে সেতুর একের পর এক পাইল ও স্প্যান। এই ইয়ার্ডের আয়তন ৩০০ একর।
দেখা গেছে, ওয়ার্কশপের পেছনের অংশ দিয়ে পাত-প্লেট ঢুকছে, অন্যদিক দিয়ে পাইল বের হচ্ছে। এরপর সামনের অংশে স্প্যান ফেব্রিকেশন করা হচ্ছে। যেখানে চীন থেকে আনা স্প্যানের জায়ান্ট দেয়া হয়। এরপর ৩ রঙে পরিবর্তন করে ৩ হাজার ৬০০ টনের ক্রেনে তুলে সেতুর পিলারের ওপর স্থাপন করা হয়।

শেষ কথা
স্বপ্নের পদ্মাসেতুতে যানবাহন উঠতে আর বেশি দিন বাকি নেই। প্রায় ৮৭ শতাংশ অগ্রগতির পর এখন স্বপ্ন বাস্তবায়নের শেষ প্রান্তে। ২০২০ সাল শেষ হলেই চালু হতে পারে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নির্মাণ অবকাঠামো পদ্মা বহুমুখী সেতু। এই সেতু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলাকে যুক্ত করবে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে, যা দেশের অর্থনীতিতে আনবে ইতিবাচক পরিবর্তন।
৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে দ্বিতল সেতুটি কনক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে। সার্বিক সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।