প্রতিবেদন

বিশ্বব্যাপী মহামারিতে রূপ নিয়েছে করোনা ভাইরাস

নিজস্ব প্রতিবেদক : চীন ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্তত ১৪৭ দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের ফলে সৃষ্ট কোভিড-১৯ রোগকে অবশেষে মহামারী ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এর আগে করোনা পরিস্থিতিতে গত ৩১ জানুয়ারি বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল সংস্থাটি।
১১ মার্চ জেনেভায় বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ডব্লিউএইচও প্রধান ডা. টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস। সেখানেই তিনি চলমান করোনা পরিস্থিতিকে মহামারি বলা যায় বলে জানান। কোনো রোগ বা সংক্রমণ যদি একাধিক মহাদেশে বা ব্যাপক ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে ছড়ায় তখনই একে মহামারি বলা হয়।
ডা. গেব্রিয়েসুস বলেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের এ মাত্রা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। একে মহামারি অভিহিত করার অর্থ এই নয় যে, বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর কী করা উচিত সে সম্পর্কে ডব্লিউএইচও তার পরামর্শ পরিবর্তন করেছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ প্রমাণ করেছে যে, এ ভাইরাসকে দমন ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাই এখন বাকি দেশগুলোর চ্যালেঞ্জ হলো, তারাও এটি করতে পারে কি না।
তিনি সব দেশের সরকারকে জরুরি ও আগ্রাসী পদক্ষেপের মাধ্যমে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পথ পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
এদিকে ইউরোপের ইতালি এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ইতোমধ্যে ইতালিতে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। করোনায় ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে এক দেশ থেকে আরেক দেশ, মহাদেশ থেকে মহাদেশ। ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সব দেশের নাগরিকদের ভিসা স্থগিত করেছে ভারত। আরো ৩৯ দেশের নাগরিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সৌদি আরব।
করেনা ভাইরাস প্রতিরোধে প্রতিটি দেশই নিজের সীমান্ত সুরক্ষায় জোর দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিচ্ছিন্নতা আগামী জুন পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮ জনে। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে। এই আলোচনার মধ্যে ইউরোপের ২৬ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এসব দেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকরা নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক রোগ ও অ্যালার্জি বিষয়ক জাতীয় সংস্থা জানিয়েছে, পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৪৩টিতে করোনার সংক্রমণ হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ওয়াশিংটন ডিসি ও ২৩টি অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। এবার ১৪ মার্চ পুরো দেশেই জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন।
বিশ্ব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে সব দেশের নাগরিকদের ভিসা ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত করেছে ভারত। এদিকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতা বাড়িয়েছে সৌদি আরব। নতুন করে ইউরোপের সব দেশসহ ৩৯ দেশের নাগরিকদের ভ্রমণের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটি। এর আগে ১৯ দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। এসব দেশে থাকা সৌদি নাগরিকদের দেশে ফিরতে ৭২ ঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছে। এছাড়াও সৌদি আরবের সঙ্গে জর্ডানের স্থলসীমান্ত দিয়ে যাত্রী চলাচলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটি। তবে বাণিজ্যিক ও কার্গো চলাচল অব্যাহত থাকবে। নতুন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
কুয়েত সব ধরনের বাণিজ্যক ও যাত্রীবাহী ফ্লাইট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ লেবানন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ১১ দেশের নাগরিকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর আগে চীন, ইরান, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের দেশটি ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।
ইতোমধ্যে উত্তর কোরিয়া সকল বিদেশি পর্যটকের জন্য তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। ইসরাইল ৬ দেশ ও অঞ্চলের নাগরিকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। চীনা নাগরিক ও চীন ভ্রমণকারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় ৬০টি দেশ ও অঞ্চল। অন্যদিকে, ইতালি, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের নাগরিকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বিশ্বের অনেক দেশ। চীন থেকে ফ্লাইট বাতিল করেছে এয়ার কানাডা, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, লুফথানসা, লায়ন এয়ার, এয়ার সিউল, কাতার এয়ারওয়েজ, ইজিপ্ট এয়ারসহ বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্স কোম্পানি।
ইতালির পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, কারাগারে আগুন, বন্দিদের পলায়ন, রাস্তায় পুলিশ-জনতা সংঘর্ষ, সরকারি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পালানোর জন্য রেলস্টেশন-বাস টার্মিনালে শত শত মানুষের ভিড়, জনশূন্য শপিংমল অর্থনীতিতে বিরাট মন্দার আশঙ্কায় পড়েছে ইতালি। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস যেন মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে দেশটিতে বিরাট ওলটপালট ঘটিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিজুড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এ রকম ব্যাপক ব্যাঘাত আর দেখা যায়নি।
প্রতিদিন অবস্থার অবনতি হতে থাকায় এরই মধ্যে গোটা ইতালিকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী গুইসেপ কন্তে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঘর থেকে বের না হতেও আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের পর থেকে জনসাধারণের চলাচলের ওপর কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি জনসমাগম নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে দেশটিতে আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে।
ইতালি ছাড়াও ইউরোপের স্পেনে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। সেখানে নতুন করে ৫২৭ জনসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২২ জনে। মারা গেছেন ৫৪ জন। এছাড়া বেলজিয়ামে ৩ জন এবং জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনে ১ জন করে প্রাণ হারিয়েছেন।

করোনা মহামারিতে বিশ্ব জিডিপির ০.৭% ক্ষতি হতে পারে: ডব্লিউইএফ
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের মহামারির প্রভাবে অর্থনীতির ক্ষতি আগামী এক দশক পর্যন্ত বহন করতে হতে পারে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)।
‘মহামারির প্রস্তুতি ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব’ শিরোনামে ১২ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারি আকার ধারণ করায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর প্রভাবে উৎপাদন পর্যায়ে কারখানায় শ্রমিকসংকট, সরবরাহ-ব্যবস্থায় সংকট ছাড়াও ভোগব্যয় কমাবে। ফলে বছরে বিশ্ব অর্থনীতির জিডিপি শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে, করোনার প্রভাবে তার মতো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত শতাব্দীর ১৯১৮ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত কারণে মহামারি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে জনসংখ্যা বেড়েছে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বাণিজ্যসহ বৈশ্বিক চলাচল বেড়েছে। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি রয়েছে। ফলে এবারের মহামারির প্রভাব হবে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
২০১৪ সালে ইবোলা ভাইরাসের কারণে আফ্রিকা অঞ্চলে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু এটি বিশ্বের অন্য অঞ্চলে তেমন প্রভাব ফেলেনি। গত ৩০ বছরে সার্স, মার্স এরকম অনেক সংক্রামক রোগে বিশ্বের ক্ষতির পরও বড় বিপর্যয়ে তেমন প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি বিশ্ব। ফলে অর্থনীতির ক্ষতির সঠিক হিসাব বের করাও কঠিন। এ ধরনের অবস্থা সরাসরি ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনীতির সম্ভাবনাগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

করোনা মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের ১২ বিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা ঘোষণা
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের প্রভাবে স্বাস্থ্যগত ও অর্থনীতির ক্ষতিরোধে জরুরিভাবে ১২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
গত ৪ মার্চ সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, বিশ্বব্যাংকের সদস্য দেশগুলোকে করোনা ক্ষতিরোধে সম্ভাব্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এই জরুরি সহায়তা দেয়া হবে। প্রথম ধাপে ৮ বিলিয়ন ডলার দ্রুত বিতরণ করা হবে। সদস্য দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, মহামারি প্রতিরোধ ব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসহ অর্থনীতির ক্ষতিরোধে বেসরকারি খাতের সঙ্গেও কাজ করবে বিশ্বব্যাংক।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস উল্লেখ করেন, আমরা করোনা মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর চাহিদার আলোকে দ্রুত ও নমনীয় প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে কাজ করে যাচ্ছি। জরুরি আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি নীতি সহায়তা, কারিগরি সহায়তা ছাড়াও সম্ভাব্য অন্যান্য সহায়তা করা হবে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, জরুরি এই সহায়তা ঋণ ও অনুদান আকারে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোকে দেয়া হবে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বিভিন্ন সংস্থা, আইআরবিডি, আইডিএ, আইএফসি এই তহবিল গঠন করতে সহায়তা করবে।