প্রতিবেদন

মাতারবাড়ীতে হচ্ছে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘মাতারবাড়ী পোর্ট ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) বৈদেশিক ঋণ সহায়তা প্রদান করবে ১২ হাজার ৮৯২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের তহবিল থেকে ২ হাজার ৬৭১ কোটি ১৫ লাখ এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তহবিল থেকে পাওয়া যাবে ২ হাজার ২১৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। জানুয়ারি ২০২০ হতে ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
১০ মার্চ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলনকক্ষে একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এই প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়।
জানা যায়, বড় আকারের জাহাজ ভিড়ানোর উপযোগী করে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ও ধলঘাট এলাকায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের লক্ষ্যে ‘মাতারবাড়ী পোর্ট ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এই সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে দেশের কার্গো হ্যান্ডলিং ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই বন্দর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাহিদা মেটানো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে ত্বরিত বন্দরসেবা প্রদানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের মধ্যে দিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরে ৩০০ ও ৪৬০ মিটার দৈর্ঘ্যরে দু’টি টার্মিনাল থাকবে। এর একটি হবে বহুমুখী টার্মিনাল ও অপরটি কন্টেইনার টার্মিনাল। এছাড়া বন্দরের সাথে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। একসঙ্গে ৮ হাজার কন্টেইনারবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারবে।
জানা গেছে, মাতারবাড়ী চ্যানেলে বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ড্রেজার দিয়ে খননকাজ চলছে। এই চ্যানেলের ডান পাশে নির্মিত হবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের টার্মিনাল। ২০২৬ সালে এই গভীর সমুদ্রবন্দরে জাহাজ ভিড়বে বলে আশা করছে সরকার।
বঙ্গোপসাগর উপকূলে দিগন্তজোড়া লবণ মাঠ খনন করে বানানো হচ্ছে জাহাজ চলাচলের কৃত্রিম নৌপথ বা চ্যানেল। এই নৌপথে এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম খননযন্ত্র ‘ক্যাসিওপিয়া-ফাইভ’ মাটি খুঁড়ে চলেছে। ঢেউ আর পলি জমা ঠেকাতে সাগরের দিকে নৌপথের দুই পাশে পাথর ফেলে তৈরি হচ্ছে স্রোত প্রতিরোধক পাথরের বাঁধ। সাগর থেকে এই নৌপথে ঢোকার মুখে হাতের ডানে নির্মিত হবে টার্মিনাল। নামে মাতারবাড়ী টার্মিনাল হলেও বাস্তবে এই লবণ মাঠেই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর।
কাগজে-কলমে বাংলাদেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর পায়রা আশা জাগাচ্ছে না ব্যবসায়ীদের মাঝে। ফাইলবন্দি হয়ে আছে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরও। অথচ কাগজে-কলমে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরের মূল কার্যক্রম ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে। জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা, বাংলাদেশ সরকার ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
জানা গেছে, ফাইলবন্দী থাকা সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরের ভালো বিকল্প হলো মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য অনুযায়ী এই বন্দর যথেষ্ট। মাতারবাড়ী বন্দর বাস্তবায়নে ভূ-রাজনৈতিকভাবেও সোনাদিয়ার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে না। আর চীন যেহেতু মিয়ানমারে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে যাচ্ছে, ফলে বঙ্গোপসাগরে তাদের উপস্থিতিও হাসিল করে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে যে এ রকম প্রকল্প হতে পারে, তা চিন্তার বাইরে ছিল। চ্যানেলে এখনই সাগরের নীল পানি। আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পেলে বাংলাদেশে যে বিশ্বমানের উন্নয়ন কর্মকা- হতে পারে, তার উদাহরণ মাতারবাড়ী।
অবশ্য মাতারবাড়ী বন্দরের কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার মূল কারণ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নৌপথ খনন করে আমদানি করা কয়লা খালাসের টার্মিনাল নির্মিত হচ্ছে। একই নৌপথ ব্যবহারের সুবিধা কাজে লাগিয়ে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের টার্মিনাল নির্মাণের পথও সুগম হয়েছে।
মাতারবাড়ী বন্দর নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রথম ধাপে রয়েছে ২টি টার্মিনাল নির্মাণ। সাধারণ পণ্যবাহী ও কন্টেইনার টার্মিনালে বড় জাহাজ (মাদার ভ্যাসেল) ভিড়তে পারবে, যেটি এখন বাংলাদেশের কোনো বন্দর জেটিতে ভিড়তে পারে না। প্রথম ধাপে বন্দর ও পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক নির্মাণসহ খরচ ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। প্রথম ধাপের কাজ শেষ হতে সময় লাগবে ২০২৬ সাল। দ্বিতীয় ধাপে নির্মিত হবে ৩টি কন্টেইনার টার্মিনাল। এভাবে পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে টার্মিনাল।
মাতারবাড়ী বন্দর নির্মাণের জন্য প্রকল্প অনুমোদন হওয়ায় এখন দ্রুতই পরামর্শক নিয়োগ করা হবে বলে প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আবার বন্দরের অংশে স্রোত প্রতিরোধক, নৌপথ খনন ও প্রশস্তকরণের কাজ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঠিকাদারের মাধ্যমে করানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজের সঙ্গে পরোক্ষভাবে মাতারবাড়ী বন্দরের কাজও এগিয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পায়রা, মাতারবাড়ী ও বে-টার্মিনাল নামে ৩টি আলাদা বন্দর তুলনা করে দেখা যায়, বন্দর সুবিধায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে মাতারবাড়ী। দেশে সমুদ্রপথে আমদানি বাণিজ্য সবচেয়ে বেশি হয় চীনের সঙ্গে। মাতারবাড়ী বন্দর হলে চীন থেকে সরাসরি বড় কন্টেইনার জাহাজ ভিড়ানো সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম বন্দরে এখন গড়ে প্রতিটি জাহাজে ১ হাজার ৮৭৮টি কন্টেইনার পণ্য আনা-নেয়া হয়। মাতারবাড়ীতে চট্টগ্রাম বন্দরে চলাচলকারী ৪টি জাহাজের সমান কন্টেইনার আনা-নেয়া করা যাবে এক জাহাজে। বন্দর সুবিধা অনুযায়ী ১৪-১৫ হাজার একক কন্টেইনারবাহী জাহাজ ভেড়ানো যাবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে।