আন্তর্জাতিক

মার্কিন নির্বাচনে এবারও রাশিয়ার হস্তক্ষেপের আশঙ্কা!

নিজস্ব প্রতিবেদক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এবারও রাশিয়ার হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করছেন ডেমোক্র্যাটরা। যুক্তরাষ্ট্রে এখন চলছে প্রাইমারি নির্বাচন। রিপাবলিকান দলের প্রার্থী বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই। ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী হবেন জো বাইডেন।
ডেমোক্র্যাটদের মনোনয়নের দৌড়ে জো বাইডেনের প্রত্যাবর্তনে সংকটে পড়েন বার্নি স্যান্ডার্স। সুপার টুয়েসডে বাইডেনকে এগিয়ে দিয়েছে, যা অনেকের কাছে বিস্ময়ের। এমনকি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে বাইডেনকে ধনকুবের মাইকেল ব্লুমবার্গের সমর্থন দেয়া স্যান্ডার্সের সংকট আরো বাড়িয়ে দেয়।
১০ মার্চের প্রাইমারিতে ১৪টি রাজ্যের মধ্যে ১০টিতেই জয় পেয়েছেন সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ১৩৫৭ ডেলিগেটের মধ্যে বাইডেন ৪৩৩ ও স্যান্ডার্স ৩৮৮ ডেলিগেট পান। সে সময় স্যান্ডার্সের সমর্থকরা বলেন, এখনো হতাশ হওয়ার মতো কিছু হয়নি, বরং স্যান্ডার্সকে সামনের নির্বাচনগুলোতেও শক্তি দেখাতে হবে। এজন্য তিনি প্রবীণ এবং আফ্রিকান-আমেরিকান ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করবেন। স্যান্ডার্সের আশা ছিল, তরুণসমাজ ও ল্যাটিন আমেরিকান ভোটাররা তাকে সমর্থন দেবেন। আফ্রিকান আমেরিকান ভোটারদের নিয়ে স্যান্ডার্স বেশি আশাবাদী হলেও টেক্সাসে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের ৬০ ভাগই পেয়েছেন বাইডেন। স্যান্ডার্স পেয়েছেন মাত্র ১৭ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর। অন্য অনেক দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রে অনেক রাজনৈতিক দল নেই। দেশটিতে প্রধানত দুইটি দলই বেশি ভোট পেয়ে থাকে Ñ ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান পার্টি।
আধুনিক উদারনীতিতে বিশ্বাস করে ডেমোক্র্যাট পার্টি, যারা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী মূল্যের শিক্ষা, সামাজিক কর্মসূচি, পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি এবং শ্রমিক ইউনিয়নে বিশ্বাস করে।
অপরদিকে রিপাবলিকান পার্টি আমেরিকান রক্ষণশীলতা প্রচার করে। যেমন সীমিত সরকারি নিয়ন্ত্রণ, কম কর হার, মুক্তবাজার পুঁজিবাদ, বন্দুকের অধিকার, নিয়ন্ত্রণমুক্ত শ্রমিক ইউনিয়ন এবং অভিবাসন ও গর্ভপাতের মতো ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করায় বিশ্বাসী এই দল।
অন্যান্য ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলো- যেমন লিবার্টারিয়ান, গ্রিন পার্টি, ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টিও কখনো কখনো প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী মনোনয়ন ঘোষণা করে।
এই মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা তাদের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য দেশজুড়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাকে বলা হয় প্রাইমারি। মার্কিন সংবিধানে এই প্রাইমারি সম্পর্কে কিছুই বলা নেই। সুতরাং পুরো ব্যাপারটি নির্ধারিত হয় দল এবং রাজ্য আইন অনুযায়ী। যেভাবে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, ঠিক সেভাবেই। তবে দল নয়, বরং রাজ্য সরকার প্রাইমারি নির্বাচনের আয়োজন করে থাকে।
রাজ্য আইনে নির্ধারিত হয় যে, এই প্রাইমারি রুদ্ধদ্বার কক্ষে হবে (অর্থাৎ যারা শুধু দলের রেজিস্টার্ড বা তালিকাভুক্ত, তারাই ভোট দিতে পারবেন) নাকি খোলা হবে (যেখানে যেকোনো ভোটার ভোট দিতে পারবেন)। একজন প্রার্থী যদি প্রাইমারিতে বিজয়ী হন, তারা তখন রাজ্যের সব প্রতিনিধি বা আংশিক প্রতিনিধিকে জয় করবেন, যা নির্ভর করে দলের আইনের ওপর। এই প্রতিনিধিরা দলের চূড়ান্ত সম্মেলনে তার পক্ষে ভোট দেবেন। এরপরে দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।
এর বাইরে হাতেগোনা কয়েকটি রাজ্যে, যেমন আইওয়ায় প্রাইমারির পরিবর্তে ককাস (রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সমিতি) রয়েছে। রাজ্যজুড়ে প্রতিটি এলাকায় ককাসের আয়োজন করে দল। যেহেতু ককাস রাজ্য সরকার আয়োজন করে না, ফলে দলগুলো তাদের নিয়ম-নীতির ব্যাপারে (যেমন কে ভোট দিতে পারবে) বেশ শিথিলভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ডেমোক্র্যাট ককাসে কোনো ব্যালটে ভোট হয় না। এখানে ভোট হয় কক্ষের ভেতর দলবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ভোট দেয়ার মাধ্যমে।
মার্কিন নির্বাচনে প্রাইমারি, ককাসের পাশাপাশি সুপার টিউসডেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুপার টিউসডে হচ্ছে সেই দিন, যেদিন বেশিরভাগ স্টেট এবং টেরিটরি তাদের প্রাইমারি নির্বাচন অথবা ককাসের আয়োজন করে থাকে। এ বছর সুপার টিউসডে ছিল ৩ মার্চ।
ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আগামী জুন মাস পর্যন্ত প্রাইমারি ও ককাস অনুষ্ঠিত হবে। বলা হয় যে, ডেমোক্র্যাট পার্টির মনোনয়নের ব্যাপারে এই সময়ের ভেতরেই আঁচ পাওয়া যাবে। কারণ প্রার্থীরা প্রতিটি প্রাইমারি বা ককাসের মাধ্যমে তার পক্ষের প্রতিনিধি সংগ্রহ করে ফেলবেন।
ডেমোক্র্যাট দলের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে ১৩ থেকে ১৬ জুলাই, যেখানে দলের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।
রিপাবলিকান জাতীয় সম্মেলন আরেকটু পরের দিকে হবে, ২৪ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত। সে সম্মেলনেই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয়া হবে।
এরপর ৪টি বিতর্কের জন্য অপেক্ষা করতে হবে যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স তাদের ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখোমুখি হবেন। প্রেসিডেন্ট বিতর্কের ব্যাপারে ১৯৮৭ সালে গঠিত একটি নিরপেক্ষ কমিশন এই বিতর্কের আয়োজন এবং পরিচালনা করবে।
৩টি প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কের প্রথমটি অনুষ্ঠিত হবে ২৯ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ানায়। বাকি দুইটি হবে সেখানেই অক্টোবরে। ভাইস প্রেসিডেন্ট বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে উটাহে ৭ অক্টোবর।
এরপরই আসবে নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ইলেকটোরাল কলেজের ভোটে। ইলেকটোরাল কলেজ হচ্ছে কর্মকর্তাদের একটি প্যানেল, যাদের ইলেকটোরস বলা হয়। প্রতি ৪ বছর পর পর এটি গঠিত হয়, যারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টকে বাছাই করেন।
এই ইলেকটোরাল কলেজের ভোট উল্টে দেয়ার মাধ্যমেই ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, রাশিয়ান হ্যাকাররা ফলাফল হ্যাক করে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে দিয়ে ট্রাম্পের জয়ে ভূমিকা রাখেন। ২০২০ সালের নির্বাচনেও এমন অভিযোগ এখন থেকেই উঠতে শুরু করেছে। ডেমোক্র্যাটদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এখনো নির্ধারণ না হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী স্যান্ডার্স ও বাইডেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিন্ন অভিযোগ আনছেন। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনেই বুঝা যাবে স্যান্ডার্স ও জো বাইডেনের এমন অভিযোগের সত্যতা কতটুকু।