ফিচার

সাধারণ চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন করোনা আক্রান্তরা

অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ : দেশে করোনা ভাইরাস রোগী শনাক্ত হওয়ার খবরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সংবাদমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম – সব জায়গায় এই মুহূর্তে প্রধান আলোচ্য বিষয় করোনা ভাইরাস।
তবে করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জনগণকে এ বিষয়ে আতঙ্কমুক্ত থাকতে বলেছেন।
সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যেকোনো জায়গায় সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে সবাইকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তথা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
ইতোমধ্যে যাদের শনাক্ত করা হয়েছে তাদের অবস্থা ভালো আছে। নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
পুরো বিশ্বে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এক লাখের বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে ৬০ হাজারেরও বেশি সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
সাধারণ চিকিৎসায় ও পদক্ষেপে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সতর্ক থাকলেও আক্রান্ত হওয়া থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।
করোনা মোকাবিলায় পরামর্শ হচ্ছে Ñ
ক্স ভিড় এড়িয়ে চলুন।
ক্স সম্ভব হলে গণপরিবহন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
ক্স করমর্দন থেকে বিরত থাকতে হবে।
ক্স হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ করা যাবে না।
ক্স সাবান দিয়ে নিয়মিত ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
ক্স সর্দি-কাশি হলে চিকিৎসকের কাছে যান।
ক্স গরম পানি খেতে হবে।
ক্স খাবার ভালোভাবে সেদ্ধ করে খাবেন।
ক্স ঘরে থাকার চেষ্টা করুন। প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়াই ভালো।
যেহেতু করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কোনো চিকিৎসা বা প্রতিষেধক নেই, তাই সতর্কতাই এ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায়।
করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয় কী তা জানার আগে চলুন জেনে নিই এর লক্ষণগুলো কী কী Ñ
ক্স সর্দি
ক্স কাশি
ক্স জ্বর
ক্স মাথা ব্যথা
ক্স গলা ব্যথা
ক্স মারাত্মক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া শিশু, বৃদ্ধ ও কম রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিস।
এখনও এ ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়ায় বিস্তার রোধই এর প্রতিরোধের উপায়। চলুন জেনে নেয়া যাক এর বিস্তার রোধে কী করবেনÑ
ক্স মাঝে মাঝে সাবান-পানি বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়া।
ক্স হাত না ধুয়ে মুখ, চোখ ও নাক স্পর্শ না করা।
ক্স হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখা।
ক্স ঠা-া বা ফ্লু আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে না মেশা।
ক্স মাংস ও ডিম খুব ভালোভাবে রান্না করা।
ক্স বন্য জীবজন্তু কিংবা গৃহপালিত পশুকে খালি হাতে স্পর্শ না করা।
ক্স মুখে মাস্ক ব্যবহার করা যেতে পারে।
এছাড়া লক্ষণ দেখা দিলে বাড়তি বিশ্রাম নিয়ে প্রচুর পানি পান করতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
বিশ্বজুড়ে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে এটি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ দেয়ার জন্য হটলাইন চালু করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট- আইইডিসিআর। নম্বরগুলো হলো ০১৯৩৭১১০০১১, ০১৯৩৭০০০০১১, ০১৯২৭৭১১৭৮৪ ও ০১৯২৭৭১১৭৮৫। এসব নম্বরে ফোন করলে জানা যাবে করোনা ভাইরাসের স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ। পাশাপাশি কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ কাউকে দেখলেও হটলাইনে কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

সাধারণ সর্দি-কাশি-জ্বরের সঙ্গে
করোনার মিল-অমিল
ঠা-া লাগা, সর্দি-কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, মাথা যন্ত্রণা- এসব উপসর্গ দেখা দিলে খুব বেশি হলে ভাইরাল ফ্লুয়ের কথাই ভাবা হতো কিছু দিন আগে পর্যন্ত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে করোনা ভাইরাস থাবা বসাল কি না, এরকম চিন্তাই মনে আসছে বেশি।
এই দুই ধরনের জ্বরের উপসর্গে এতটাই মিল যে, চিকিৎসকরাও হিমশিম খাচ্ছেন রোগ নির্ণয়ে। তাই অনেক সময় দেরি হচ্ছে অসুখ ধরা পড়তে। রোগ নির্ণয়ের সুবিধার জন্যই জেনে রাখা ভালো, এই দুই জ্বরের ধরন কেমন। মিল কোথায়, অমিলই বা কী।

সাধারণ ফ্লু ও করোনার মধ্যে মিল
ক্স দুই ধরনের ফ্লু-ই ভাইরাসবাহিত।
ক্স দুই রোগই সংক্রমণজনিত।
ক্স মানবশরীর থেকেই ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম।
ক্স সময়মতো সচেতন না হলে দুই ধরনের ফ্লু নিউমোনিয়ার দিকে বাঁক নিতে পারে।

সাধারণ ফ্লু ও করোনার মধ্যে অমিল
ক্স সাধারণ ফ্লু ও করোনা ভাইরাসজনিত অসুখ হলেও দুই অসুখের ভাইরাস সমগোত্রীয় নয়। সাধারণ ফ্লু ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের প্রকোপে হয়, আর কোভিড-১৯ হয় করোনা গ্রুপের ভাইরাসের কারণে, যা কিনা সার্স ভাইরাসের কাছাকাছি গোত্রের।
ক্স করোনা ভাইরাস ছড়ায় অনেক দ্রুত। সেই তুলনায় ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ছড়ায় অনেক ধীরে।
ক্স সাধারণ ফ্লুর বেলায় ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ২-৩ দিনের মধ্যে অসুখ দেখা দেয়। আর করোনার বেলায় ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭-১৪ দিনের মধ্যে অসুখ দেখা দেয়।
ক্স সাধারণ ফ্লুর বেলায় জ্বর ১০৩-১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যেতে পারে, তবে ওষুধ খেলে নামতেও শুরু করে। করোনার বেলায় জ্বর প্রবল হবে এবং নামতে চায় না সহজে। ওষুধও কাজ করে না।
ক্স সাধারণ ফ্লু বোঝার জন্য পরীক্ষার দরকার পড়ে না। কিন্তু করোনা আক্রান্ত কি না জানতে গেলে পলিমারেস চেন রিঅ্যাকশন বা পিসিআর পরীক্ষা করার দরকার হয়।
ক্স সাধারণ ফ্লুর জন্য প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন রয়েছে। কিন্তু করোনা রোধে তেমন কোনো ভ্যাকসিনের সন্ধান এখনও পাননি গবেষকরা।
লেখক: প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক