প্রতিবেদন

সাড়ম্বরে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দৃপ্ত পদে এগিয়ে চলছে দেশের নারীসমাজ

সাবিনা ইয়াছমিন : ৮ মার্চ দেশজুড়ে সাড়ম্বরে পালিত হলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯০৮ সালে প্রথম নারী দিবসের সূচনালগ্নে নারীর দাবি ছিল নারীর শিক্ষা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। সেই দাবি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের স্বাধীন ভূখ-ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭৩ সালে প্রথমবারের মতো পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। গত ৪৭ বছর ধরে দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে দিবসটি। এই দীর্ঘ সময়ে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশের নারীরা সবক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছে। সকল শ্রেণি-পেশার নারীরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে সমানতালে।
উল্লেখ্য, বিগত ১১ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিভিন্ন সূচকে দেশ যেমন এগিয়েছে, তেমনই নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় এগিয়েছে নারীসমাজের অর্জন।
বাংলাদেশের নারীরা সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার। এ সত্ত্বেও চার দেয়ালের বাইরে গিয়ে প্রমিলার আবরণ থেকে বের হয়ে এসেছে এদেশের নারী। জীবনের সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে চলেছে এদেশের নারীরা। শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বে এখন আর পিছিয়ে নেই বাংলাদেশের নারীরা। বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় অনেক ভালো করছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে সমানতালে দিনরাত কাজ করে চলেছে দেশ-বিদেশে সর্বত্র।
কোন কাজ করে না নারী? সন্তান লালন-পালন থেকে শুরু করে বাইরের কর্মক্ষেত্রে Ñ সকল স্থানেই সফল নারী। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের নারীরাও এখন বিচরণ করছেন শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি, গণমাধ্যমসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। স্বাধীন হওয়ার পর গত ৪৯ বছরের অন্তত ২৮ বছর এই দেশ শাসিত হয়েছে নারীদের নেতৃত্বে। তৈরি হয়েছে একটি নারীনীতি, যা অনেক অগ্রসর চিন্তা ধারণ করে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপের ফল বলছে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের নারীরা এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে। এক দশক আগেও যেখানে দেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার ছিল খুবই কম, এখন নারী কর্মসংস্থানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। অর্থ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান মাস্টার কার্ডের ‘মাস্টার কার্ড ইনডেক্স অব উইমেন্স অ্যাডভান্সমেন্ট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সর্বশেষ সাউথ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের দুই নারী অ্যাথলেট মাবিয়া আক্তার সীমান্ত ও মাহফুজা খাতুন শিলা ভারোত্তোলন ও সাঁতারে সোনা জয় করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনেন। বাংলাদেশের জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের সদস্যরাও ধীরে ধীরে নিজেদের অর্জনের পাল্লা ভারী করছেন। এরই মধ্যে ওয়ানডে স্ট্যাটাস অর্জন শেষে বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচে অন্য পক্ষকে পরাজিত করার সামর্থ্য দেখাতে শুরু করেছেন তারা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও নারীরা অনেক দিন ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। সেনাবাহিনীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছেন দুই নারী পাইলট। তারা হলেন মেজর নাজিয়া নুসরাত হোসেন ও মেজর শাহরীনা বিনতে আনোয়ার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রথম নারী মেজর জেনারেল হয়েছেন ডা. সুসানে গীতি। দেশের প্রথম নারী ট্রেনচালক হিসেবে উম্মে সালমা সিদ্দিকা ২০১১ সালে রেলওয়েতে যোগ দেন। তার পথ ধরে বর্তমানে রেল চালনায় যোগ দিয়েছেন দেড় ডজন নারী। অটিজম বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। তিনি গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ ইনিশিয়েটিভ ইন বাংলাদেশের জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ পুরস্কার জিতেছেন।
বাংলাদেশের নারী আলোকচিত্রীদের মধ্যে অনেকেই এখন ভালো করছেন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত আলোকচিত্রী হচ্ছেন তাসলিমা আখতার। সাভারের রানা প্লাজা ধসের শিকার দুই শ্রমিকের আঁকড়ে ধরে থাকা ‘শেষ আলিঙ্গন’ নামের আলোকচিত্রের মাধ্যমে তিনি জার্মানির লিড অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার পান। বার্লিনে বর্ষসেরা নারীনেত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন নাজমা আক্তার। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্টে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন নিশাত মজুমদার। দেশের জন্য খ্যাতি ও সম্মান বয়ে আনা অন্য নারী পর্বতারোহী ওয়াসফিয়া নাজনীন। নিশাত মজুমদারের পরপরই তিনি ২০১২ সালে সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন।
অথচ নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়াকে একসময় আন্দোলন করতে হয়েছে মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার জন্য। কারণ, শিক্ষাই সব কুসংস্কার থেকে মুক্তি দিতে পারে একজন মেয়েকে। স্বাধীনতার পর খুব অল্পসংখ্যক মেয়ে সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নিয়েছে শিক্ষা। বিপ্লব ঘটতে থাকে ১৯৮৯ সাল থেকে। ১৯৮৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী ছেলেদের শতকরা ৯০ জন বিদ্যালয়ে শিক্ষারত ছিল। মেয়েদের বেলায় এ হার ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু পরের দেড় দশকে এ চিত্র পাল্টে যায়।
সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সবশেষ রিপোর্ট অনুসারে মেয়েশিশুদের প্রায় শতভাগই এখন স্কুলে যায়। শিক্ষকতায় সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে নারীদের। ১৯৯৫ সালে নারী শিক্ষকের হার ছিল ২৫ শতাংশ। ২০০২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে এই হার ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষক হবেন নারী। এই নারী শিক্ষকরা পুরুষের পাশাপাশি গড়ে তুলবেন আমাদের আগামী প্রজন্মকে।
প্রথমবারের মতো শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন একজন নারী ডা. দীপু মনি। দেশের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন তিনি।
সম্প্রতি করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় দেশের প্রধান স্বাস্থ্য পরামর্শদাতা হয়ে উঠেছেন একজন নারী। তিনি হলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।
রাষ্ট্রে নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের নীতি বাস্তবায়নে প্রশাসন দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিচারপতি, সচিব, সেনাবাহিনী, পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত ডিসি-এসপি, ইউএনও-ওসি সর্বত্র উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নারীর নিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। এসব নারী কর্মক্ষেত্রে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। ব্যবসাবাণিজ্য সরকারি-বেসরকারি সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সফলতার সাথে এগিয়ে চলেছেন নারীরা।
দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর পোশাক শিল্পে কর্মরতদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। হাজার বছর ধরে যেসব নারীকে রাখা হয়েছিল মূল অর্থনৈতিক কর্মকা-ে বাইরে, এখন তারাই হয়ে উঠেছেন বিদেশি মুদ্রা অর্জনের প্রধান শক্তি। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে এই গার্মেন্টস শ্রমিক এবং গ্রামের অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত নারীদের অবদান অসামান্য। শহর থেকে যে অর্থ গ্রামে যায় তার সিংহভাগই জোগান দেন এ নারী শ্রমিকরা।
বর্তমানে বিজিএমই-এর সভাপতিও একজন নারী Ñ ড. রুবানা হক।
চা ও চামড়া শিল্পেও কাজ করছেন নারীরা। দেশের ৭৫ শতাংশ নারী অর্থনীতিতে সক্রিয়। দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ এই হার। আর ৫০ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে বেশিমাত্রায়।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে ৫৯ শতাংশ নারী কাজ করছেন। মাঠ থেকে শুরু করে খাদ্যশস্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করার কাজও তারা করছেন।
পুরুষের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রায় ৪২ দশমিক ৫ মিলিয়ন নারী দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। কর্মক্ষেত্রে নারীর এই বিপুল পদচারণার ফলে বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত হওয়াটা প্রভাব ফেলেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষা উন্নয়নের ক্ষেত্রে।
রাজনীতির পটভূমিতে দৃপ্ত পদক্ষেপ রেখে চলেছে নারী নেতৃত্ব। স্থানীয় প্রশাসনের ইউপি থেকে শুরু করে সংসদ পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ দৃপ্ত। ইউপি, উপজেলা, জেলাসহ তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব তাদের সৃজনশীলতা দ্বারা, তাদের সঠিক বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করে চলেছে সাধারণ জনগণের নানা সমস্যার। এয়ারফোর্সে মেয়েরা যুদ্ধবিমান চালনা শুরু করে দিয়েছে। বিমানে তো মহিলা পাইলট আছেই, রেলেও নারী ড্রাইভার রয়েছে। গাড়ি চালকও রয়েছেন নারী। পুলিশ, র‌্যাব, সশস্ত্র বাহিনী ও বিজিবিসহ সামরিক-বেসামরিক সকল স্তরেই সফলতার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন নারী সদস্যরা। জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসন ছাড়াও অন্তত ২৬ জন সরাসরি নির্বাচিত নারী সদস্য রয়েছেন। সংসদ নেতা, উপনেতা, বিরোধী দলীয় নেতা এবং স্পিকারও একজন নারী। বিচার বিভাগে নারী বিচারপতি, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদেও নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন অত্যন্ত সফলতার সাথে।
এছাড়া গণমাধ্যমে বেড়েছে নারীদের পদচারণা। সাংবাদিকতার মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে অসংখ্য নারী। নারীরা পেয়েছে নারী উন্নয়ননীতি, যা নারী আন্দোলনের অনেক বড় প্রাপ্তি।

নারীরা সকল ক্ষেত্রে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ মার্চ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বলেন, সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে, যাতে তারা এগিয়ে যেতে পারে। কাজেই তারা যেখানেই যাচ্ছে তাদের দক্ষতা দেখাচ্ছেন।
‘প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার’ শীর্ষক এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য নিয়ে সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের মেয়েরা ভারত্তোলন থেকে শুরু করে এভারেস্ট পর্যন্ত বিজয় করে ফেলেছে। খেলাধুলায় আমাদের যেসব মেয়ে ভালো করছে তাদেরকে আমরা উৎসাহ দিচ্ছি এবং সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে যাচ্ছি। মেয়েরা যে পারে সেটা আজ প্রমাণিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি পদে কখনো কোনো মেয়ে পদোন্নতি পায়নি। তবে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পরই সে সময়কার রাষ্ট্রপতিকে বলেছিলাম, এখানে মহিলা বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে এবং সেই থেকেই শুরু আর এখন অনেক মহিলা বিচারপতি আছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের পুলিশ বাহিনীর যে কন্টিনজেন্ট কঙ্গোতে আছে, সেখানে তারা খুব ভালো করছে এবং শান্তিরক্ষা মিশনে মেয়েদের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর নারী অফিসারদেরকেই তারা চাচ্ছে। কারণ মেয়েরা সেখানে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য আমি সত্যিকারেই গর্বিত।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। ইউএন উইমেনের প্রতিনিধি এবং ভারপ্রাপ্ত আবাসিক সমন্বয়ক শোকো ইশিকাওয়া অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী রওশন আক্তার স্বাগত বক্তৃতা করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ‘জয়িতা পদকে’ ভূষিত সফল ৫ জন নারীর হাতে সম্মাননা তুলে দেন। পদকপ্রাপ্তরা হলেন আনোয়ারা বেগম, ডা. সুপর্ণা দে সিম্পু, মরহুম মমতাজ বেগম, অরনিকা মেহেরিন ঋতু এবং সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালোরি অ্যান টেইলর।
অনুষ্ঠানে ‘বঙ্গবন্ধু ও নারী উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রামাণ্য চিত্র পরিবেশিত হয়। পরে অনুষ্ঠিত মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, মজুরি-বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং কর্মক্ষেত্রে বৈরী পরিবেশের প্রতিবাদকালে ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সুতা কারখানার একদল শ্রমজীবী নারী মালিকপক্ষের দমন-পীড়নের শিকার হন। সেদিনের নারী আন্দোলনের স্মরণে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ও রাজনীতিবিদ ক্লারা জেটকিনের আহ্বানে বিশ্বব্যাপী ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়ে আসছে। গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির পিতার নির্দেশে ১৯৭৩ সাল থেকে বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নারীরা যত শিক্ষিত হবে, তত বেশি স্বাবলম্বী হবে। এতে সমাজ দ্রুত এগিয়ে যাবে। কারণ, সমাজের অর্ধেক অংশকে অকেজো রেখে একটি সমাজ সঠিকভাবে চলতে পারে না। সে সমাজ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে।
নারীদের নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতা জোর করে হয় না, ক্ষমতা নিজের যোগ্যতায় অর্জন করে নিতে হয়। ক্ষমতা কেউ হাতে তুলে দেয় না। সেভাবেই আমাদের বোনদের নিজেদের তৈরি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে ধর্ষণের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে সমাজকে রক্ষায় পুরুষদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান এবং এর বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে নারীদের চেয়ে ছেলেরা পিছিয়ে রয়েছে উল্লেখ করে জেন্ডার গ্যাপ সমস্যার সমাধানে এর কারণ খুঁজে বের করে ব্যবস্থা গ্রহণেও সংশ্লিষ্ট মহলকে পরামর্শ দেন।

শেষ কথা
নারী-পুরুষ সমতার দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার ওপরে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। শিক্ষায় এগিয়ে মেয়েরা। বর্তমানে প্রাথমিক স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি শতভাগ। ১৯৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছেন নারীরা।
আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে পৃথিবীতে যেসব দেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সবচেয়ে বেশি হয়েছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতির এসব প্যারামিটার অনুযায়ী সময় এখন বাংলাদেশের নারীদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বাংলাদেশে বিশ্বের রোল মডেল। নারী উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বাংলাদেশে বিশ্বের রোল মডেল হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধের লক্ষ্যে তাঁর নির্দেশনায় প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন-২০১০, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ ও যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮। আরো প্রণয়ন করা হয়েছে ভিজিডি, বিধবা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এসব কর্মসূচির আওতায় মাতৃত্বকালীন ছুটি সবেতন ৬ মাসে উন্নীত করা ছাড়াও বয়স্ক ভাতা, বিধবা-তালাকপ্রাপ্ত ও নির্যাতিত নারীদের ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের ভাতাও তিনি দেশে চালু করেছেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ধর্ষণের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন।
বাংলাদেশে নারীদের এই অগ্রযাত্রার কাহিনি এখন বৈশ্বিক গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে নারী-পুরুষ সমতার দিক দিয়ে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী ৪টি ক্ষেত্রে আবার বিশ্বের সব দেশের ওপরে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। এই ৪টি ক্ষেত্রের ৩টি হলো ছেলে ও মেয়েশিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি, মাধ্যমিকে ছেলে ও মেয়েদের সমতা এবং সরকারপ্রধান হিসেবে কত সময় ধরে একজন নারী রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গত ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় নারীশিক্ষার অগ্রগতি হয়েছে ব্যাপক। এর প্রভাব সর্বক্ষেত্রে পড়াতেই দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ঘরে যেতে পেরেছে এবং অর্থনৈতিকভাবে দেশ একটি শক্তিশালী অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।