প্রতিবেদন

সিটি নির্বাচনে ব্যস্ত সময় পার করছে চট্টগ্রামবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনি উত্তাপ বাড়ছে। প্রচার প্রচারণায় যোগ হচ্ছে নতুন মাত্রা। ইতোমধ্যে প্রার্থীদের ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে নগরীর অলিগলি। চলছে মাইকিং, জনসংযোগ। করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক স্পর্শ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থী ও সমর্থকদের। তবে ভোটারদের মধ্যে করোনার কিছুটা আতঙ্ক আছে। তারা জনসমাগম এড়িয়ে চলছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চসিক ভোটে করোনার প্রভাব পড়তে পারে। তাই ৩০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি নিশ্চিত করাও নির্বাচন কমিশনের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে।
চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন রেজাউল করিম চৌধুরী এবং বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন ডা. শাহাদত হোসেন। তারা উভয়েই এখন ব্যস্ত আছেন প্রচার-প্রচারণায়। হেভিওয়েট এই দুই প্রার্থী ট্রাকের ওপর নির্মিত মঞ্চে দাঁড়িয়ে গণসংযোগ করছেন। করোনার কারণেই হয়ত তাদের এই সতর্কতা। দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর কেউই ভোটার-সমর্থকদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছেন না, কোলাকুলি তো দূরের কথা। এবার প্রার্থী ও ভোটারের মাঝে এই দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে করোনা। ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের সঙ্গে ভোটারের এই দূরত্ব অব্যাহত থাকলে হেভিওয়েট দুই প্রার্থীর নিশ্চিত ভোটার ও সমর্থকদেরও হয়ত মাঠে দেখা যাবে না। সেক্ষেত্রে মনে হচ্ছে, একটি নিরুত্তাপ ভোটের দিকেই এগুচ্ছে চসিক নির্বাচন।
নৌকা প্রতীকের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী নির্বাচনি প্রচারণায় গিয়ে বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসন্ন চসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদেরকে যে বার্তা দিয়েছেন, তার সারমর্ম হলো চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে মেগা প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে সকল প্রতিবন্ধকতা দূরে সরাতে হবে। চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশে যে উন্নয়ন তা আজ দৃশ্যমান। চট্টগ্রামের মানুষের স্বপ্নসাধ পূরণে নৌকায় ভোট প্রার্থনা করছি।
অপরদিকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন নির্বাচনি প্রচারণায় গিয়ে বলছেন, প্রচারণায় যে সাড়া পাচ্ছি, তাতে ধানের শীষের বিজয় সুনিশ্চিত। তবে সেই বিজয়ের জন্য ভোটের মাঠের এবং ভোটকেন্দ্রের সুষ্ঠু পরিবেশ দরকার। বিভিন্ন জায়গায় ধানের শীষের কর্মীদের বাধা দেয়া হচ্ছে, যা মোটেও কাম্য নয়। একইসঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যদি ভোটারদের যেতে দেয়া না হয় তাহলে এটি প্রহসনের নির্বাচনে পরিণত হবে।
চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছাড়াও বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্টের এম এ মতিন মোমবাতি প্রতীক, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির আবুল মনজুর আম প্রতীক, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ওয়াহেদ মুরাদ চেয়ার প্রতীক, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের জান্নাতুল ইসলাম হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন। তবে এসব প্রার্থীর প্রচারণায় ভোটারদের তেমন সাড়া দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ- বিএনপি বাদে অন্য দলের প্রার্থীরা মাইকিংয়ের মাধ্যমেই তাদের নির্বাচনি প্রচারণা সীমাবদ্ধ রেখেছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এবার বিএনপির পাশে নেই তাদের প্রধান মিত্র জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাতিল হওয়া দলটি আগামী ২৯ মার্চ অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে কোনোভাবেই জড়িত হবে না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মিত্র ১৪ দলের শরিকরা ক্ষমতাসীনদের কাছে উপেক্ষিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ। এ কারণে তারা এখনো নিষ্ক্রিয়। অবশ্য সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে প্রধান মিত্র আওয়ামী লীগের কাছে গুরুত্ব হারালেও পৃথক থাকার পরিকল্পনা নেই শরিক এই রাজনৈতিক দলগুলোর।
ঢাকায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন নিয়ে শরিকদের সঙ্গে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের আলোচনা করেননি। গত মাসের মাঝামাঝি সময় আওয়ামী লীগ চসিক নির্বাচনে তাদের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে। চট্টগ্রামের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক কোনোভাবেই তাঁদের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে এ নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনা করেননি। অনেকটা যেচেই ১৪ দলের শরিক ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা আওয়ামী লীগের বন্ধুদের কাছ থেকে নির্বাচনের খোঁজখবর নিচ্ছেন, যদিও ২০১৫ সালের চসিক নির্বাচনে ১৪ দলের স্থানীয় নেতারা আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দীনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন।
অপরদিকে জামায়াত এবার চসিক নির্বাচনে মেয়র বা কাউন্সিলর পদে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন জানানোর কথা জানায়নি। সর্বশেষ চসিক নির্বাচনে তারা বিএনপির মেয়র প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়েছিল, আর কাউন্সিলর পদে ৪১টি সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে ১০টিতে প্রার্থী দিয়েছিল। বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা করে তারা ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মধ্যে দুটিতে প্রার্থী দিয়ে একটিতে জয়ীও হয়। অধিকাংশ সময়ে তারা বিএনপিকে সমর্থন জানিয়ে তাদের পক্ষে মাঠে থেকেছে। কিন্তু এবার সমর্থনও জানাচ্ছে না, মাঠেও থাকছে না বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জামায়াতের প্রভাবশালী নেতারা।
চসিক নির্বাচনে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে এসব অসঙ্গতির পাশাপাশি ভর করেছে করোনা আতঙ্ক। অবশ্য এ আতঙ্ক উপেক্ষা করেই রাতদিন প্রচারণা চালাচ্ছেন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা। সভা-সমাবেশ ও ব্যাপক জনসমাগম না করতে নির্দেশনা থাকলেও তা ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন ওয়ার্ড ও মহল্লা ভাগ করে প্রার্থীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন। নগরীর প্রধান সড়ক ও অলিগলি ছেয়ে গেছে প্রার্থীদের পোস্টার ও ব্যানারে। ফলে পুরোদমে জমে উঠেছে নির্বাচনি প্রচারণা।
আওয়ামী লীগ প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর পক্ষে জোরেশোরে মাঠে নেমেছেন বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির ও তার সমর্থকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নাছির সমর্থকরা জোরালো ভূমিকা রাখলে রেজাউল করিমের পক্ষে সিটি মেয়র হওয়া অসম্ভব হবে না।
অপরদিকে ডা. শাহাদত হোসেনের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও আবদুল্লাহ আল নোমানসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের নেতাকর্মীরা ভোটের দিন ভোট কেন্দ্র ছেড়ে না দিলে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষেও সম্ভব চসিক মেয়রের চেয়ার দখলে নেয়া।