কলাম

সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে গৃহীত উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি

মানুষের জীবনের নিরাপত্তার প্রতি সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্টদের নির্বিকার অবহেলায় প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির জরিপে জানা যায়, চলতি বছরের ১০ মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১১৮ জন। ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৮৫৫ জন, ২০১৮ সালে ছিল ৭ হাজার ২২১ জন, ২০১৭ সালে ছিল ৭ হাজার ৩৯৭ জন, ২০১৬ সালে ছিল ৬ হাজার ৫৫ জন। এতে দেখা যায়, বিগত সময়ের তুলনায় সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা উন্নত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হলেও তা বাস্তবায়নে কঠোর উদ্যোগের অভাব পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ করে তুলছে। রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় গড়ে ওঠা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়। আর এর বাস্তবায়ন শুরু হয় সংসদে পাস হওয়ার প্রায় ১ বছর পর গত ১ নভেম্বর। কিন্তু শুরুতেই পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে এ আইনের প্রয়োগ অনেকটাই থমকে গেছে। আর এ শিথিলতার কারণে সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
অপর দিকে গত সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। তাদের মূল দায়িত্ব সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো। তবে এই টাস্কফোর্স এখন পর্যন্ত বৈঠক করেছে মাত্র একটি, আর কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে চালকরা বেপরোয়াভাবে চালাচ্ছেন যানবাহন। কখনো দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ, কখনো গাছের সঙ্গে গাড়ির ধাক্কা, সঙ্গে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ।
প্রশ্ন উঠেছে, প্রতিনিয়ত বাস-ট্রাক-নছিমন-করিমন দুর্ঘটনায় অতি সাধারণ গরিব মানুষ মারা যায় বলেই কি সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে মাথাব্যথা নেই? একেকটি মৃত্যু একাধিক পরিবারকে বিধ্বস্ত করে দেয়। শ্রমজীবী মানুষগুলোর মৃত্যুও জাতীয় ক্ষতি। প্রতিদিন এমন অপঘাত মৃত্যু জাতির মনস্তত্ত্বের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের আইন, নিয়মবিধি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে কেন মানুষ মরবে? কেন ফিটনেস ছাড়া গাড়ি চলবে? কেন লাইসেন্স ছাড়া চালক থাকবে? কেন হেলপার গাড়ি চালাবে? কেন চালক একটানা ১৫-১৬ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে ঘুমচোখে মানুষ মারবে?
এসবের নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে গৃহীত উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। সেজন্য প্রয়োজন একটি সর্বাত্মক উদ্যোগ, যে উদ্যোগ সড়কে মৃত্যুর মিছিল ঠেকাবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত দায়িত্বশীলদের বুঝতে হবে, সড়ক নিরাপদ হলে মানুষ বাঁচবে। মানুষ নিরাপদ থাকলে দেশ বাঁচবে।
আমরা আশা করছি, সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি সড়কে মৃত্যু মিছিল থামাতে সরকার এমন কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে, যার বাস্তবায়নের ফলে চালকরা শৃঙ্খলার মধ্যে আসে এবং সড়কে প্রতিষ্ঠিত হয় আইনের শাসন।