আন্তর্জাতিক

এবার একীভূত হচ্ছে দুই আয়ারল্যান্ড!

নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্রিটেন থেকে আয়ারল্যান্ড স্বাধীন হয় ১৯২১ সালের মে মাসে। তারপর থেকে ১০০ বছরের মধ্যে বেশিরভাগ সময় দেশটি দুটি রাজনৈতিক দলের দ্বারা পালাক্রমে শাসিত হয়ে এসেছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি এই ধারাটিও ভেঙে পড়েছে। ওই দিন সাধারণ নির্বাচনে সর্বাধিক ভোট পায় সিন ফেইন। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির (আইআরএ) সঙ্গে যুক্ত এই দলটি ১৯৭০ থেকে শুরু করে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত বোমাবাজির তা-ব চালিয়েছিল। এবারের নির্বাচনে সেই সিন ফেইন তাদের বামপন্থি কর্মসূচির জোরে জয়ী হয়েছে, যার মধ্যে আছে স্বাস্থ্য ও আবাসন খাতে আরও বেশি অর্থ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি। আরও অনেক উচ্চাভিলাষী আকাক্সক্ষাও দলটি গোপন রাখেনি।
দলের ইশতেহারে বলা হয়েছে, আমাদের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো দুই আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণ এবং সেই একত্রীকরণ অর্জনের একটা উপায় হলো এই প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠান।
ব্রেক্সিটের পর থেকে সংবাদপত্রের শিরোনাম কেড়ে নিয়েছে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা। তবে এখন যুক্তরাজ্য থেকে ভিন্ন আরেক বিচ্ছিন্নতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। নির্বাচনে সিন ফেইনের সাফল্য থেকে এমন মনে করার কারণ ঘটেছে যে, এক দশকের মধ্যে একটা সংযুক্ত আয়ারল্যান্ডের সম্ভাবনা বাস্তব এবং সেই সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়ছে। সেই সম্ভাবনার তাৎপর্যটা আয়ারল্যান্ড দ্বীপটির বাইরেও বিস্তৃত।
লন্ডনের ‘দি ইকোনমিস্ট’ সাময়িকীর সম্পাদকীয়তেও বলা হয়েছে যে, বর্তমান সাধারণ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত একত্রিত আয়ারল্যান্ড একটা রিপাবলিকান ফ্যান্টাসির চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। কিন্তু সিন ফেইনের সাফল্য সেই ফ্যান্টাসির জায়গায় জোর সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এ ব্যাপারে ক্রমবর্ধমান আস্থার একটা কারণ হলো ব্রেক্সিট এবং অন্য একটা কারণ জনমিতির পরিবর্তন।
ইকোনমিস্ট মনে করে, ২০২১ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডে রোমান ক্যাথলিকদের সংখ্যা প্রথমবারের মতো প্রটেস্ট্যান্টদের ছাড়িয়ে যাবে। স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির এক মুখপাত্র বলেছেন, তার বিশ্বাস এক দশকের মধ্যে একটা একীভূত আয়ারল্যান্ড ও একটি স্বাধীন স্কটল্যান্ডের আবির্ভাব ঘটবে। কারণ, জনমিতি ও তরুণদের ভোট সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে এবং এই দুটো দেশই ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে।
তবে আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণের ব্যাপারে অনেক কিছুই করার আছে। দুটি অংশের প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা একীভূত হবে কি না, হলে কখন হবে, কিভাবে হবে এই বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের রাজনীতিকদের সংলাপ শুরু করা দরকার বলে পর্যবেক্ষকরা মন্তব্য করেছেন।
দুই দশক আগে সহিংসতা অবসানের মূল্য হিসেবে উত্তর আয়ারল্যান্ড, ব্রিটেন এবং রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড সম্মিলিতভাবে একটি একীভূত আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক পথ নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়। এখন আইরিশ ভূখ-ের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের জনগণ যদিও ওই পথ অনুসরণ করে তা হলে রাজনীতিকদেরও তা করা উচিত বলে পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আয়ারল্যান্ড উত্তর আটলান্টিকের একটি দ্বীপ, যা ৪৮৬ কিলোমিটার লম্বা ও ২৮৮ কিলোমিটার চওড়া। এর পূর্ব দিকে গ্র্রেট ব্রিটেন।
আইরিশ সমুদ্র এই দুই ভূখ-কে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ১৮০১ সাল থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত গোটা আয়ারল্যান্ড ছিল ব্রিটেনের অংশ। ১৯১৯ সালে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯২১ সালে এক চুক্তিবলে দেশটি দুটি অংশে খ-িত হয়ে একটি অংশ ‘রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড’ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং আরেকটি অংশ ‘উত্তর আয়ারল্যান্ড’ ব্রিটেনের সঙ্গে যুক্ত থেকে যায়।
অতীতে আয়ারল্যান্ড দ্বীপজুড়ে ছিল শুধু একটিই রাজ্য Ñ আয়ারল্যান্ড। ১১৯৮ সাল পর্যন্ত এই রাজ্যটি একক রাজার শাসনে ছিল, যাদের বলা হতো হাই কিং অব আয়ারল্যান্ড। কিন্তু পরবর্তীতে ছোট ছোট রাজার অধীনে ১৫৪১ সাল পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে দ্বীপটি শাসিত হয়েছে। বর্তমানে দ্বীপটির উত্তরাঞ্চল ব্রিটেনের সাথে যুক্ত।
৭০ হাজার ২৭৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটিতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের বাস। আয়তনের দিক দিয়ে এটি বিশ্বের ১১৮তম দেশ। আইরিশরা প্রধানত ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ান। দেশটিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্যাথলিক ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়।
আয়ারল্যান্ড দ্বীপের বৃহৎ শহর এবং প্রজাতন্ত্রী আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন। শহরটি আয়ারল্যান্ডের পূর্ব উপকূলের মধ্য ভাগে লিফি নদীর পাড়ে অবস্থিত। শিল্প ও সাহিত্যে ডাবলিন নগরীর রয়েছে বিশেষ সুখ্যাতি। বিশ্বসাহিত্যের বেশকিছু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব এই নগরীতে জন্ম নিয়েছিলেন এবং জীবনের সূচনাকাল অথবা সম্পূর্ণ সময় এখানে অতিবাহিত করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তিন নোবেল বিজয়ী Ñ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস, নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ ও কথা শিল্পী স্যামুয়েল বাকেট। জেমস জয়েসের লেখা কালজয়ী উপন্যাস ইউলিসিসের প্রেক্ষাপটও এই ডাবলিন শহর।
আলু আইরিশদের প্রধান খাবার। ১৮৪০ সালে এক ধরনের রোগে এই দেশের সব আলু পচে যায়, ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ওই দুর্ভিক্ষে প্রায় ১০ লাখ আইরিশ মারা যায়।
আয়ারল্যান্ড তার বিশাল বিশাল দুর্গের জন্য পরিচিত, যা অতীতে যুদ্ধের সময় এই দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে তৈরি করা হয়েছিল। এই দুর্গগুলো এখনও বিদ্যমান এবং এসব দুর্গ দেখার জন্য প্রতি বছর প্রচুর দর্শনার্থী এখানে বেড়াতে আসে।
স্বাধীন আয়ারল্যান্ড গোটা ভূখ-ের ৮৩ শতাংশ এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড ১৭ শতাংশ। পরবর্তীকালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের জাতীয়তাবাদীরা তথা প্রধানত রোমান ক্যাথলিকরা তাদের ভূখ-কে স্বাধীন আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে একীভূত করার জন্য লড়াই শুরু করে। অন্যদিকে ইউনিয়নপন্থি তথা প্রোটেস্ট্যান্টরা চায় যে, উত্তর আয়ারল্যান্ড ব্রিটেনের অংশ হিসেবেই থেকে যাক। একপর্যায়ে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মিতে (আইআরএ) সিন ফেইনের আবির্ভাব ঘটে। সেই সিন ফেইনই এবারের নির্বাচনে বিপুল সাফল্য পেয়ে ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ডের সম্ভাবনাকে নতুন রূপে উজ্জীবিত করে তুলেছে।