রাজনীতি

করোনাকেন্দ্রিক আবর্তিত হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনা মহামারি বৈশ্বিক আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের সকল শ্রেণিপেশার মানুষও আতঙ্কগ্রস্ত। ইতোমধ্যে দেশের একটি উপজেলা শিবচরকে লক ডাউন করা হয়েছে। লক ডাউন করা হয়েছে জাতীয় প্রেসক্লাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পুরো দেশকেই লক ডাউন করার পরামর্শ দিয়েছে। সেই সঙ্গে পরামর্শ দিয়েছে জরুরি অবস্থা জারির।
করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশে ২২ মার্চ পর্যন্ত ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছে ২৭জন। আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। দেশে এখনো মহামারি পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলেও ইতোমধ্যে করোনার আগ্রাসনে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তৈরী পোশাকের বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা বন্ধ করে দেয়ায় গার্মেন্টস কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। গার্মেন্টস কারখানার পাশাপাশি অফিস-আদালতেও মানুষের উপস্থিতি কমে গেছে। অনেক অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। সচিবালয়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এদিকে করোনা আতঙ্কে রাজধানী ঢাকার জীবনযাত্রা অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বেশি করে পণ্য কিনে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। অনেকে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। ঢাকায় যারা আছে, তারা নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করছে। রাস্তায় গণপরিবহন কমে গেছে। জনসমাগম বন্ধ আছে। নিম্ন আয়ের লোকজনের আয়-রোজগার কমে গেছে। মানুষের মনে অজানা আশঙ্কা ভর করেছে।
এসবের পাশাপাশি সব ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতাও স্থবির হয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সব ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করে দিয়েছে। দলটি মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করেছে। সব ধরনের সভা-সমাবেশ বন্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। জনসমাগম হয়, এমন ধরনের কোনো অনুষ্ঠান করা থেকে বিরত রয়েছে।
অন্যতম বিরোধী দল বিএনপিও সব ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করে দিয়েছে। দলটি তাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য গৃহীত বিক্ষোভ সমাবেশসহ সকল ধরনের কর্মসূচি স্থগিত করেছে। ক্ষমতাসীন দলের মতো বিএনপিও জনসমাগম হয়, এমন কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে না। তবে দলটি প্রেস রিলিজের মাধ্যমে করোনা মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ করে যাচ্ছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রতিদিনই করোনা নিয়ে সরকার ব্যর্থ বলে বিবৃতি দিচ্ছেন। এই বিবৃতি আবার খ-ন করছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারা।
করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ যখন আতঙ্কগ্রস্ত, তখন এক ধরনের বাহাসের মধ্যেই আছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। জাতির এই ক্রান্তিকালে সবগুলো রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ বসে কিভাবে এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
মোট কথা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থবিরতার সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও স্থবির হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অন্য যেকোনো দুর্যোগে রাজনৈতিক দলের নেতারাই সবার আগে দুর্গত মানুষের কাছে ছুটে যান। কিন্তু করোনা এমনই এক দুর্যোগ, যাতে মানুষ মানুষের কাছে যাওয়া তো দূরের কথা, হাত মেলানোও বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি পরিবারের আক্রান্ত সদস্যদেরও অন্য সদস্যরা এড়িয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছেন। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেরাই আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পুরোপুরি বাদ দিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তারা ঘর থেকে বেরই হচ্ছেন না।
অবশ্য জনসমাগম যেখানে ভয়ের অন্যতম কারণ, সেই ভয়াবহ ভয়ের মধ্যেই পূর্বঘোষিত তারিখ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-৩ ও বাগেরহাট-৪ আসনের উপনির্বাচন সম্পন্ন করেছে ২১ মার্চ তারিখে। করোনার এই আগ্রাসনের মধ্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠান করা নিয়ে নির্বাচন কমিশন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লেও তারা পিছিয়ে যায়নি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। করোনা আতঙ্কে মাত্র ৫% মানুষই ভোটকেন্দ্রে গেছে। তবে এই ৫ শতাংশ নিয়েও সন্দেহ পোষণ করেন অনেকে।
অবশ্য এই ৩ আসনের নির্বাচনের হালচাল দেখে টনক নড়ে নির্বাচন কমিশনের। ভোটারের অভাবে এই ৩ আসনের নির্বাচনি কর্মকর্তারা যখন কেন্দ্রে বসে ঝিমুচ্ছেন, তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইসি কার্যালয়ে রীতিমতো সভা করে (যদিও করোনার এই সময়ে সভা আয়োজন না করতে সরকার থেকে বলা হয়েছে) ২৯ মার্চ আয়োজিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনের উপনির্বাচন স্থগিত করে। পাশাপাশি করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানীয় সরকার পরিষদের আরও কয়েকটি ভোটও স্থগিত করা হয়েছে।
যদিও ঢাকা-১০ আসনটি রাজধানীতে হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে এই নির্বাচনটি জমে উঠবে বলে মনে করেছিল মানুষ। কিন্তু করোনা সবকিছু ওলট-পালট করে দেয়। তারপরও ঢাকা-১০ আসনের ভোটাররা আশা করেছিল, নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত ভোট স্থগিত করে দেবে। কিন্তু ভোটাররা অবাক বিষ্ময়ে লক্ষ্য করে, করোনা নির্বাচন কমিশনকে মোটেও স্পর্শ করেনি। তারা ২১ মার্চেই ভোট গ্রহণে অনড় থাকে। নির্বাচন কমিশনের এই নির্বুদ্ধিতার জবাব ভোটাররা দেয় ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে।
সে যা-ই হোক, বলা যায়, করোনা বাংলাদেশের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ছে দেশ। এ মুহূর্তে দরকার গঠনমূলক সম্মিলিত সিদ্ধান্তের। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সে ধরনের কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তারা আগে যেমন বাহাস নিয়ে ব্যস্ত থাকতো, এখনও তাই করছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এখনও একেবারে উদাসীন বলে মনে হচ্ছে। জাতীয় এমন দুর্যোগে রাজনৈতিক নেতাদের এমন নিস্পৃহ মনোভাব বিচলিত করে তুলেছে সচেতন মানুষদের।