প্রতিবেদন

করোনা সংকট: অনিশ্চিত পথে হাঁটছে বিশ্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনা গ্রাসে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে গোটা বিশ্ব। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। ইতোমধ্যে করোনা সংক্রমণকে মহামারি অ্যাখ্যা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
২১ মার্চ পর্যন্ত বৈশ্বিক আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার। মাত্র ৭ দিনের ব্যবধানে বিশ্বে করোনা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এক সপ্তাহে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ মানুষ। এই উল্লম্ফনে মোট আক্রান্তের সংখ্যা চলতি মাসেই হয়ত ৩ লাখ ছোঁবে।
এ সময়ের মৃত্যুচিত্রও ভয়াবহ। ১৫ মার্চেও যে মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার ছিল তা ২১ মার্চে ১১ হাজার ২৬৬ জনে পৌঁছেছে। অবশ্য এ পর্যন্ত ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলে কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়লেও সবখানের চিত্র এক নয়। বর্তমানে ইতালি, স্পেন, ইরান, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের পরিস্থিতি সবচেয়ে সংকটজনক। এসব দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। মূলত তাতেই বাড়ছে বৈশ্বিক আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।
চীনের উহান শহর করোনা ভাইরাসের উৎসস্থল হিসেবে বিবেচিত হলেও দেশটিতে ২২ মার্চ পর্যন্ত পঞ্চম দিনের মতো স্থানীয়ভাবে কোনো সংক্রমণের ঘটনা ঘটেনি। যে কয়জনের মধ্যে নতুন সংক্রমণ ঘটেছে তারা সবাই বিদেশফেরত।
বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের ১৩-১৯ মার্চের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৩ মার্চ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে করোনায় আক্রান্ত হয় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৪৮৩ জন। এরপর প্রতিদিন সংক্রমণ বেড়েছে ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার পর্যন্ত। তাতে ১৯ মার্চে এসে মোট আক্রান্ত দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৯৩৩ জন। অর্থাৎ ৭ দিনের ব্যবধানে আক্রান্ত বেড়েছে ১ লাখ। আক্রান্ত বাড়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে কয়েকটি দেশের সংক্রমিতের চিত্র। যেমন স্পেনে ১৩ মার্চ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৩২ জন। পরদিন তা বেড়ে হয় ৬ হাজার ৩৯১ জন। সর্বশেষ ১৯ মার্চ ১ দিনে ৩ হাজার ৩০৮ জন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৭৭ জন।
সংক্রমণে উল্লম্ফন হয়েছে ইতালি, ইরান, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সেও। ১৯ মার্চ সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছে ইতালিতে ৫ হাজার ৩২২ জন।
এক সপ্তাহের মৃতের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৩ মার্চ পর্যন্ত করোনায় বৈশ্বিক মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪২৯ জনে। পরদিন তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৮৩৩-এ। এরপর ১৯ মার্চে এসে তা ১০ হাজার ৩১ জনে উন্নীত হয়। বৈশ্বিক মৃতে উল্লম্ফনে মূল ভূমিকা রেখেছে ইতালির পরিস্থিতি। সেখানে ১৪ মার্চ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ২৬৬ জন। পরদিন তা দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৪১ জনে। এর ৪ দিনের মধ্যেই সে দেশে মৃত্যু বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। ১৫ মার্চ সেখানে মারা যায় ৩৬৮ জন। ১৬ মার্চ সংক্রমিত ৩৪৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। পরদিন প্রাণ হারায় আরো ৩৪৫ জন। ১৮ মার্চ ১ দিনে মারা যায় নতুন ৪৭৫ জন। সর্বশেষ ১৯ মার্চ মারা যায় আরো ৪২৭ জন। তাতে করে মৃতের সংখ্যা একক দেশ হিসেবে চীনকে ছাড়িয়ে যায় ইতালি।
দেখা যাচ্ছে গত সপ্তাহে যেসব দেশ ও অঞ্চল নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে, সেসব এলাকায় জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও করোনা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মৃত্যুপুরী ইতালিতে জনগণকে ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অবরুদ্ধ করার পরও বয়স্কপ্রধান দেশটি মহামারি রুখতে পারছে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্পেনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। পরে ইতালির পথ অনুসরণ করে স্পেনও অবরুদ্ধ করা হয়। এরপরও পরিস্থিতি অবনতি হতেই চলেছে। অবরুদ্ধ করা হয়েছে ইউরোপের আরেক দেশ ফ্রান্সকেও। দেশটিতে রেস্টুরেন্ট, বার, সিনেমাহল ও নাইটক্লাব বন্ধ করা হয়েছে। তবে চালু রাখা হয়েছে খাবার ও ওষুধের দোকান। তারপরও দেশটিতে সংক্রমিত বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে।
করোনা ঠেকাতে ইউরোপের ২৬টি দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন যুক্তরাষ্ট্র। গত ১৩ মার্চ থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। পরে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেশের তালিকায় যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দেশটিতে ঘোষণা করা হয় জরুরি অবস্থা। তবে আক্রান্তের চিত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়েছে। ভাইরাসটি ছড়িয়েছে দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই। গত ১৯ মার্চ একক দেশ হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে; ৪ হাজার ৫৩০ জন।
সম্প্রতি সংক্রমণে উল্লম্ফন হয়েছে জার্মানিতে। ১২-১৫ মার্চ পর্যন্ত দেশটিতে গড়ে ১ হাজার করে লোক সংক্রমিত হচ্ছিল। হঠাৎ করে ১৬ মার্চে সংক্রমিত হয় ১ হাজার ৪৫৯ জন; ১৭ মার্চ ২ হাজার ৪৯ জন। এরপর ১৮ মার্চে এক লাফে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা হয় ২ হাজার ৯৬০ জন। ১৯ মার্চ এ সংখ্যা হয় ২ হাজার ৯৯৩ জন। তবে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম।
করোনার প্রাদুর্ভাবের আরেক দেশ ইরানেও করোনার সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ২১ মার্চ সেখানে নতুন করে ১ হাজার ২৩৭ জন সংক্রমিত হয়েছে, মারা গেছে ১৪৯ জন। তাতে করে দেশটিতে মৃত ও সংক্রমণের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৪৩৩ জন ও ১৯ হাজার ৬৪৪ জন।
করোনা মোকাবিলায় মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান মক্কা ও মদিনায় অবস্থিত দুটি মসজিদের বাইরের চত্বরে নামাজ পড়া স্থগিত করেছে সৌদি আরব সরকার। কাবা ও মসজিদে নববির বাইরের চত্বরে নামাজ বন্ধের এই সিদ্ধান্ত ২০ মার্চ থেকেই কার্যকর হয়েছে। মসজিদ চত্বরে প্রতিদিনের নামাজের পাশাপাশি জুমার নামাজও স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের বাকি সব মসজিদে জামাতে নামাজ পড়া স্থগিত করে দেয়া হয়। এর আগে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বিদেশিদের জন্য ওমরাহ করার সুবিধা স্থগিত করে সৌদি আরব।
চীন-ইতালির পর করোনা মহামারির কেন্দ্রস্থল হতে পারে ভারত Ñ এমন তথ্য জানিয়েছে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক শীর্ষ একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ভারত হবে করোনা ভাইরাস মহামারির পরবর্তী ‘হট স্পট’ এবং দেশটিকে অতি জরুরি ভিত্তিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সুনামির জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
করোনা ঠেকাতে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কাজুড়ে কারফিউ জারি করা হয়েছে। তিনদিনে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে ৬৫ জন হওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০ মার্চ দেশটির প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে এই ঘোষণা আসে।
করোনা ভাইরাসের কারণে দুই সপ্তাহের জন্য ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
করোনা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়াজুড়ে বাসিন্দাদের বাড়িতে থাকার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম বলেছেন, এ মহামারির সময় বাসিন্দাদের শুধু প্রয়োজন হলেই বাড়ি থেকে বের হওয়া উচিত, নতুবা নয়।
এর আগে তিনি একটি আনুমানিক হিসাব দিয়ে বলেছিলেন, আগামী দুই মাসেই অঙ্গরাজ্যটির ৪ কোটি বাসিন্দার অর্ধেকেরও বেশি কভিড-১৯ সংক্রমিত হতে পারে।
করোনা ভাইরাস মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ নয় Ñ এমন সব কর্মীকে বাড়িতে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বন্ধ হচ্ছে ইইউ সীমান্ত
করোনা মোকাবিলায় ৩০ দিনের জন্য ভ্রমণকারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউর ২৬টি সদস্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডও এই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবে বলে জানা গেছে।
ইইউ দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয় Ñ এমন দেশের নাগরিকরা এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন। তারা ওই ৩০ দিন ইইউ ব্লকের দেশগুলোতে প্রবেশ করতে পারবেন না। তবে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বাস করা লোকজন, ইইউয়ের নাগরিকদের পরিবারের সদস্য ও কূটনীতিকরা, সীমান্ত ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মী এবং পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লোকজন এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবেন। যুক্তরাজ্য ও রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডকে এই পদক্ষেপের অংশ হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হবে। এর মধ্যে আয়ারল্যান্ড ইইউয়ের অংশ হলেও ইউরোপের মুক্ত সীমান্তের শেনজেন অঞ্চলভুক্ত নয়।

যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যে নতুন শঙ্কা
করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হলে যুক্তরাজ্যে লাখো মানুষ মারা যেতে পারে Ñ সমীক্ষার নিরিখে এমন এক প্রতিবেদন প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার কভিড-১৯ প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
সমীক্ষায় বলা হয়, ভাইরাসটি সবচেয়ে খারাপ মাত্রায় ছড়ালে ৫ লাখের বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। এছাড়া মারাত্মক অসুস্থ রোগীতে উপচে পড়বে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা। এই ভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে মারা যেতে পারে ২২ লাখ মানুষ।
কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বরিস জনসনের সরকার যুক্তরাজ্যের জীবনযাপনে সব সামাজিকতা নিষিদ্ধ করেছে। ৭০ বছরের বেশি বয়সী লোকজনকে আলাদা করে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। ক্যাফে, পাব, সিনেমা হলে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে যুক্তরাজ্যের অনেক অধিবাসী ইতোমধ্যে স্বেচ্ছায় আইসোলেশনে চলে গেছেন।

পাঞ্জাবে কারাবন্দিদের ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত
ছোটখাটো অপরাধ করে ধরা পড়া বন্দিদের ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের পাঞ্জাব সরকার। রাজ্যের কারামন্ত্রী সুখজিন্দর সিং রণধাওয়া জানিয়েছেন, কম পরিমাণে মাদক নিয়ে ধরা পড়া এবং ছোটখাটো অপরাধীদের জামিনে ছেড়ে দেয়া হবে। রাজ্যের জেলে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এদিকে ভারতে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সব রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় রেস্তোরাঁ সমিতি। তারা বলেছে, লাখ লাখ গ্রাহক ও কর্মীকে করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে ৩১ মার্চ পর্যন্ত রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখা উচিত। পাঁচ লাখেরও বেশি রেস্তোরাঁ মালিক এই সংগঠনটির সদস্য। এর আগে ভারতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কোনো কোনো রাজ্যে সিনেমা হল, থিয়েটারও বন্ধ হয়ে গেছে।

ইরানে কারাবন্দিদের সাধারণ ক্ষমা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি দেশটির বহু কারাবন্দিকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। দেশটিতে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর তিনি এ ঘোষণা দিয়েছেন।
ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান ইব্রাহিম রাইসির অনুরোধের প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ নেতা কারাবন্দিদের মুক্তি দেয়ার ঘোষণা দেন।

বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশ
করোনা জ্বরে যখন গোটা বিশ্ব কাঁপছে তখন গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে হানা দিয়েছে করোনা। ওই দিন ৩ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। ২২ মার্চ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ জনে। এই সময়ে মৃত্যু হয় ৩ জনের। বুঝাই যাচ্ছে, আক্রান্তের পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
এ অবস্থায় প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে ২২ মার্চ বাংলাদেশকে ‘লক ডাউন’ ও জরুরি অবস্থা জারির পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনকে এ পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনেকেবল ডিসিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রটেকশনের (এসডিসিপি) প্রতিনিধি দল।
সাঈদ খোকন এ বিষয়ে জানান, দেশে লক ডাউন অবস্থা ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। পুরোপুরি না হলে অন্তত আংশিক লকডাউন তৈরি করতে বলেছে সংস্থাটি। একইসঙ্গে জরুরি অবস্থা জারি করতেও বলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ সরকারের সর্বোচ্চ মহল অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হবে জানিয়ে সাঈদ খোকন স্বদেশ খবরকে বলেন, আমরাও দেখেছি, যেসব দেশে লক ডাউন করা হয়েছে বা জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে, সেখানে নতুন আক্রান্তের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আছে। নতুন করে সংক্রমণ কম হয়েছে। তাই আমরা তাদের জানিয়েছি, তাদের এই পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করব। কারণ সরকারপ্রধান হিসেবে তিনিই শুধু এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ পরামর্শের কারণে বলা যায় যে, একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতি শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্যই হুমকি নয়, অর্থনীতির ওপরও হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশের আয়ের প্রধান উৎস তৈরী পোশাক ও রেমিট্যান্স। বিদেশি ক্রেতারা এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ। সে হিসাবে বলা চলে, যেকোনো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যেতে পারে পোশাক কারখানাগুলো। আর তাতে এক ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।
রেমিট্যান্সেও ইতোমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যে ১৮২টি দেশ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত তার প্রায় প্রতিটিতেই বাংলাদেশিরা কর্মরত আছেন। সেসব দেশে প্রবাসীরা ঘরে বসে বেকার দিনযাপন করছেন। বেতন না পাওয়ায় তাদের পক্ষে দেশে টাকা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তা রেমিট্যান্সের প্রবাহে শিগগিরই বড় ঝাঁকুনি দেবে।
এদিকে করোনা আতঙ্কে রাজধানী ঢাকার জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। একশ্রেণির মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বেশি করে পণ্য কিনে দ্রব্যমূল্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। অনেকে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। ঢাকায় যারা আছেন, তারা নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করছেন। রাস্তায় গণপরিবহন কমে গেছে। জনসমাগম বন্ধ আছে। নিম্ন আয়ের লোকজনের আয়-রোজগার কমে গেছে। মানুষের মনে অজানা আশঙ্কা ভর করেছে। অনেকেই বলছেন, করোনার কারণে হয় বাজারে জিনিসপত্র থাকবে, মানুষের কাছে টাকা থাকবে না। না হয়, মানুষের কাছে টাকা-পয়সা থাকবে কিন্তু বাজারে জিনিসপত্র পাওয়া যাবে না। এ যেন এক অনিশ্চিত গন্তব্যে হাঁটছে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব; এর শেষ কোথায় তা এ মুহূর্তে কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।