কলাম

চলে গেলেন লোকসাহিত্যিক ড. আশরাফ সিদ্দিকী

নিজস্ব প্রতিবেদক
লোকসাহিত্যিক, গবেষক ও কবি ড. আশরাফ সিদ্দিকী আর নেই। গত ১৯ মার্চ ভোররাতে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি… রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি অসুস্থতায় ভুগছিলেন। বার্ধক্যজনিত সমস্যাও ছিল তার।
আশরাফ সিদ্দিকীর মেয়ে তাসনিম সিদ্দিকী জানান, রাজধানীর ধানমন্ডির শাহী মসজিদে বাদ জোহর জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তার বাবার লাশ দাফন করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশি লোক জমায়েত হোক তা তারা চাননি। এ জন্য বাংলা একাডেমিতে তার মরদেহ নেয়া হয়নি।
তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা চাই বাবার জন্য সবাই বাসায় থেকে দোয়া করবেন।’
উল্লেখ্য, ১৯২৭ সালের ১ মার্চ টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন আশরাফ সিদ্দিকী। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক, লোক ঐতিহ্য গবেষক এবং শিশুসাহিত্যিক। বিংশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যকে যারা সমৃদ্ধ করেছেন তিনি তাদের অন্যতম।
ড. আশরাফ সিদ্দিকী ১৯৫০ সালে টাঙ্গাইলের কুমুদিনী কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
৬ বছর বাংলা একাডেমির দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৮৩ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালে তিনি কর্মজীবন থেকে অবসর নেন।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮৮ সালে একুশে পদকসহ ৩৬টি পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।
৪০-এর দশকের শুরুতে প্রতিশ্রুতিময় কবি হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ। ১৯৪৮ সালে দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা রচনা করে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে গণমানুষের কবি হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এর পর তিনি পাঁচ শ’র অধিক কবিতা রচনা করেছেন। বাংলার লোকঐতিহ্য নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন। ৭৫টি গ্রন্থ ও অসংখ্য প্রবন্ধ তিনি রচনা করেছেন।
‘গলির ধারের ছেলেটি’ ছোটগল্প লেখক হিসেবে তাকে প্রতিষ্ঠিত করে। এ ছোটগল্প অবলম্বন করে সুভাষ দত্তের পরিচালিত ‘ডুমুরের ফুল’ চলচ্চিত্রটি জাতীয় পুরস্কার পায়। বাংলার মৌখিক লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতিকে লিপিবদ্ধ করার জন্য ড. আশরাফ সিদ্দিকী বিশেষভাবে সমাদৃত।
ড. আশরাফ সিদ্দিকীর বইগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘লোকসাহিত্য’, ‘বেঙ্গলি ফোকলোর’, ‘আওয়ার ফোকলোর আওয়ার হেরিটেজ’, ‘ফোকলোরিক বাংলাদেশ’ এবং ‘কিংবদন্তীর বাংলা’। দক্ষিণ এশিয়ার লোকসাহিত্যে গবেষণায় এগুলো মৌলিক বই হিসেবে বিবেচিত হয়। ‘ভোম্বল দাশ: দ্য আঙ্কল অব লায়ন’ এবং ‘টুনটুনি অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ ইত্যাদি গ্রন্থের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলার লোকজ গল্পকে বিশ্বসাহিত্যের ভা-ারে পৌঁছে দেন। ১৯৫৮ সালে প্রখ্যাত ম্যাকমিলান পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত তার ‘ভোম্বল দাশ: দ্য আঙ্কল অব লায়ন’ বইটি ছিল সে বছরের যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধিক বিক্রীত শিশুদের বইয়ের তালিকায়। বইটি ১১টি ভাষায় অনূদিত হয়। তাঁর ’৭০-এর দশকে লেখা ‘রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন’ ও ‘প্যারিস সুন্দরী’ আজও তরুণ পাঠকদের কাছে জনপ্রিয়।
ড. আশরাফ সিদ্দিকী পড়াশোনা করেছেন শান্তিনিকেতন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় এমএ ও পিএইচডি করেন তিনি। রাজশাহী কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ, ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ, ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অধ্যাপনা করেছেন। কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক, ডিস্ট্রিকট গ্যাজেটিয়ারের প্রধান সম্পাদক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) প্রেসিডেন্ট, নজরুল একাডেমির আজীবন সভাপতি এবং নজরুল ইনস্টিটিউটের সভাপতির দায়িত্ব তিনি পালন করেন। ত্রিশালে কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেন ড. সিদ্দিকী।
১৯৫১ সালের ২৩ ডিসেম্বর সাঈদা সিদ্দিকীকে বিয়ে করেন ড. আশরাফ সিদ্দিকী। তাদের ৫ সন্তান সবাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এবং নিজ নিজ পেশায় সুপ্রতিষ্ঠিত।